নিবন্ধ

অপারেশন জ্যাকপট – মুক্তিযুদ্ধের একটি আত্মঘাতী অপারেশন !

অপারেশন জ্যাকপট

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারদের বিরুদ্ধে যে কয়টি বড় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে তার মধ্যে অপারেশন জ্যাকপট অন্যতম । এখানে আমরা FANCIM.COM এর পাঠকদের জন্য অপারেশন জ্যাকপট এর বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরেছি ।

অপারেশন জ্যাকপট: পটভূমি

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। দক্ষিণ ফ্রান্স শহরের উপকূলীয় শহর তুঁলো বন্দরে পাকিস্তানী সাবমেরিন PNS ম্যানগ্রোতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল ৫৭ জন নাবিক যার মধ্যে ছিলো ১৩ জন বাঙ্গালী। প্রশিক্ষণ চলাকালীন তারা শুনতে পায় ২৫-শে মার্চের রাতে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক “অপারেশন সার্চলাইট” নামক অভিযানের মাধ্যমে মাতৃভূমি বাংলার বুকে আঘাত হানার সংবাদ। বর্বর গণহত্যার কথা জানতে পেরে তাঁরা আঁতকে উঠলেন। দেশমাতৃকার এমন বিপদে চুপ করে থাকাটা এদেশের সন্তানের পক্ষে অসম্ভব। প্রশিক্ষণস্থল হতে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তাঁরা। তবে দূরত্ব সম্পর্কে বলতে গেলে চোখ কপালে উঠার মতোই। ফ্রান্স হতে স্পেন, এরপর রোম। ওইখান থেকে জেনেভা হয়ে ভারত..!! শুধুমাত্র দেশের টানেই এতদুর পথ পাড়ি দিতে তাঁরা রাজি হয়ে গিয়েছিলো। দেশপ্রেমকে তাঁরা অস্ত্র বানিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলো পাক হানাদার বাহিনীর মেরুদণ্ড, গতিশীল করেছিলো দেশের যুদ্ধের পথ, রুখে দিয়েছিলো পাক হানাদারের বিদেশি সাহায্যের পথ। সেদিনের উদ্যম সাহসীরা সঞ্চার করেছিলো এক স্বপ্নের যেখানে রচিত হচ্ছিলো লাল সবুজের মাঝে একটি দেশের অস্তিত্ব যার নাম বাংলাদেশ

দামাল ছেলেগুলো ছিলো
১. গাজী মোঃ রহমতউল্লাহ। (বীর প্রতীক, পরে লেফটেন্যান্ট), চিফ রেডিও আর্টিফিসার।
২. সৈয়দ মোঃ মোশাররফ হোসেন। (ইঞ্জিনিয়ার আর্টিফিসার)
৩. আমিন উল্লাহ শেখ। (বীর বিক্রম)
৪. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। (বীর উত্তম পরে কমোডোর), রেডিও অপারেটর।
৫. মোঃ আহসানউল্লাহ। (বীর প্রতীক), ইঞ্জিনিয়ারিং মেকানিক্যাল।
৬. আবদুর রকিব মিয়া। (বীর বিক্রম এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), ইলেকট্রিক্যাল মেকানিক।
৭. জ. আবিদুর রহমান। (বীর বিক্রম), স্টুয়ার্ড।
৮. বদিউল আলম। (বীর উত্তম)

সুত্রপাত:
সময়কাল ১৯৭০-৭১। ফ্রান্স হতে সাবমেরিন “ম্যানগ্রো” কিনে নেয় পাকিস্তান। উক্ত সাবমেরিনের একজন নাবিক মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। পেশায় একজন সাবমেরিনার হলেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিলো তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি পরবর্তীতে একজন বীর উত্তম ও বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত হোন। স্বাধীনতা যুদ্ধ পূর্ববর্তী ফ্রান্সের তুঁলো বন্দরে প্রশিক্ষণরত ১৩ জন বাঙালীর মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। ৩১-শে মার্চ প্রশিক্ষণ শেষে ১ এপ্রিল তাঁদের ওই সাবমেরিন চালিয়ে পাকিস্তান যাওয়ার কথা থাকলেও ওয়াহেদ চৌধুরীর হঠাৎ পরিকল্পনায় বদলে যায় দৃশ্যপট। ২৬ শে মার্চ গণহত্যার কথা জানার পরপর তাঁরা কষতে থাকেন পরিকল্পনার ছক তবে একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে। তিনি সবাইকে পরিকল্পনার ব্যাপারে জানাতে লাগলেন পৃথকভাবে যাতে কোনভাবেই ঘটনার সাক্ষী থেকে না যায়। বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপনে চলতে থাকে কারণ পাকিস্তান সরকার এই পরিকল্পনা জানতে পারলে নিশ্চিত বিদ্রোহী হিসেবে গণ্য হবে এবং যার ফলাফল নির্ঘাত ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড।

ফ্রান্সের বন্দর হতে পলায়ন:

বাঙালী নাবিকদের পরিকল্পনা ছিলো সাবমেরিন ম্যানগ্রো সম্পূর্ণ বিস্ফোরকের সাহায্যে ভস্মীভূত করে দেয়ার পরে যদিও তা বাতিল করা হয়। যার কারণ ছিলো দুইটি। প্রথমত, বিদেশে মাটিতে পাকিস্তানী সাবমেরিন ধ্বংস করা হলে সারাবিশ্বে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে । ফলে বিদেশি সরকারগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের খারাপ ভাবতে শুরু করবে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করবেনা ।

আর দ্বিতীয়ত, এতো কম সময়ে সাবমেরিন ধ্বংসের জন্য বিপুল সংখ্যক বিস্ফোরক জোগাড় করা ও প্রহরীদের ফাকি দিয়ে তা ঘাটিতে ঢুকানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

একাধিক বৈঠকের পর স্থির করা হয় গোপনে পালাতে হবে তাঁদের। কোনো ধরণের সন্দেহের উদ্রেক যাতে না হয় সেজন্য তাঁরা একে অপরের সাথে স্বাভাবিকের মতো চলাফেরা এবং ব্যবহার বজায় রাখতো। আরো বাড়তি সতর্কতার খাতিরে অন্যদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক কাটাতে বাঙালী নাবিকদের সব মালপত্র নেভাল মেস হতে সাবমেরিনে তুলে নেয়া হয়।

তবে শেষমেশ ১৩ জনের মধ্যে ৯ জন জাহাজ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সম্মত হলেন এবং গঠন করা হল নৌ উইং বা নৌ কমান্ডো বাহিনী। বাকি চারজনও এই অভিযানে যোগ দিতে ইচ্ছুক থাকলেও তাদের পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তানে থাকায় তারা অভিযানে যোগ দেয়া হতে বিরত থাকে। তবে তারা প্রতিজ্ঞা করেছিলো পরিস্থিতি যাই হবে হোক তারা কোনদিনও বিদ্রোহী বাঙালীদের সম্পর্কিত কোনকিছুই ফাঁস করবে না।
সময় ২৭-শে মার্চ, ১৯৭১। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিকেল পাঁচটায় তাঁরা ৯ জন মিলিত হয় পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারণের জন্যে।

ওইদিকে পরিকল্পনাকারীর মধ্যে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী এবং আবদুর রকিব মিয়া জাহাজের কি-বক্স হতে লকারের চাবি নিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ এবং পাসপোর্ট সংগ্রহে নিয়ে নেন। এখানে তাঁরা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন। বাঙালী যারা ছিলো তাঁদের পাসপোর্ট আনার সময়ে বুদ্ধি করে নিয়ে আসলেন সকল প্রশিক্ষণরত নাবিকদের পাসপোর্ট কারণ শুধুমাত্র বাঙালীদের পাসপোর্ট নিয়ে আসলে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা সহজেই বিষয়টি বুঝে ফেলতো। পরেরদিন বিমানের টিকেট কেনার উদ্দেশ্য গোপন রেখে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী এবং বদিউল আলম জাহাজ হতে ছুটি নিয়ে নেন কিন্তু এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনে বিপদের সম্ভবনা অনুমান করে রেলপথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।

সময় ৩১-শে মার্চ ১৯৭১। তুঁলো বন্দর ছেড়ে পালানোর দিন। এক এক করে মুক্তিকামী বাঙালী অফিসাররা কেনাকাটা করার কথা বলে বেরিয়ে পড়েন সাবমেরিন হতে। ট্রেন ছাড়বে রাত এগারোটায়। ইতিমধ্যে সাবমেরিনে থাকা কিছু আফ্রিকান মেরিনারকে বাঙালীদের সিদ্ধান্তের কথা জানালে তাঁরাও সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন এবং একে একে ছোট ব্যাগ বন্দরের বাইরে পাঠাতে শুরু করে তাঁরা। বাঙালী নাবিকদের মারশেঁতে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেন আফ্রিকান বন্ধুরা।

ইতিমধ্যে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসলেও সঙ্গী আবদুল মান্নানের কোন দেখা নেই। চরম উদ্বেগের জন্ম নেয় অন্যান্য সঙ্গীদের মধ্যে এই ভেবে তিনি ধরা পড়লেন কিনা চিন্তা করে। বলাবাহুল্য, তিনি পথ ভুলে লন্ডনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে সময় থেমে নেই, একে একে ৮ জন সবাই বসে পড়ে ট্রেনের কামরায়। সকাল আটটায় জেনেভা শহরে প্রবেশ পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। ভিসা না থাকার দরুন তাঁদের ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। বিভিন্ন ধরণের যুক্তি উপস্থাপন করার পরেও কোনভাবেই ছাড় দিতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে পালিয়ে আসার ব্যাপারটা জানাজানি হলে পাকিস্তান দূতাবাসকে জানানো হলে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। ফলশ্রুতিতে ইমিগ্রেশন সংলগ্ন কামরায় বন্দি তাঁরা, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। বেশ সময় পার হলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে তাঁদের ফ্রান্সে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আসল পরিচয় জেনে যাওয়ার চেয়ে বরং ফ্রান্সে ফেরত যাওয়াটা অনেক নিরাপদ ভেবে তাঁরা খুশি হলেন ।

বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁরা প্যারিসে ফিরে আসেন। বারবার ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। পরক্ষণে তাঁরা লিয়ন শহরে আত্মগোপন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এদিকে পাকিস্তানী কর্মকর্তাগণ ততক্ষনে জেনে যায় বাঙালী অফিসারদের পালিয়ে যাওয়ার কথা । তবে তাঁরা যাত্রা বিলম্ব না করে তুঁলো বন্দর হতে সাবমেরিন নিয়ে রওনা দেয়। তবে সাবমেরিন স্পেনের বন্দরে পৌঁছামাত্র ফ্রান্স কর্তৃপক্ষকে পালিয়ে যাওয়া বাঙালী অফিসারদের কথা অবহিত করলে ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে খবরটা। ইউরোপের বিভিন্ন গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়ে ওঠে বাঙালী অফিসারদের খোঁজে। বাঙালী অফিসাররা ভারতীয় পর্যটক পরিচয়ে লিয়নের একটি হোটেলে উঠে তবে ভাগ্য নিতান্তই খারাপ হওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের পাসপোর্ট দেখতে চায় এবং পরে দেখাতে না পারায় হোটেল ত্যাগের নির্দেশ দেয় তাঁদের। একের পর এক হোটেলে তাঁরা আশ্রয় নিতে ব্যর্থ হলেন ভিসা এবং পাসপোর্ট প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়ে। তাঁরা বুঝতে পারলো ফ্রান্সে থাকা সম্পূর্ণ অনিরাপদ। বহুকষ্টে পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে দ্বিগুণ অর্থের বিনিময়ে এক মহিলার হোটেলে ঠাঁই হলো তাঁদের। দিনের বেলা হোটেলে অবস্থান করে রাতের বেলা দলে বিভক্ত হয়ে ফ্রান্স হতে অন্য দেশে যাওয়ার পথ খুঁজতেন তাঁরা।

ভাগ্য সহায় হলো একসময়। লিয়নের একটি টুরিস্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে গাজী মোঃ রহমতউল্লাহ জানতে পারেন এক চমকপ্রদ সংবাদ। তিনমাসের জন্য পাকিস্তানি নাগরিকগণ ভিসা বিহীন স্পেনে প্রবেশ করতে পারবে। হোটেলে ফেরার পথে একটি পর্যটক গাইড এবং ম্যাপ কিনে তিনি তাৎক্ষণিক খবরটি তাঁর দলের সাথে আলোচনা করেন।

পরেরদিন স্পেনের সীমান্তে ইমিগ্রেশনে পাকিস্তানি পাসপোর্ট দেখাতেই ঢুকার অনুমতি পেয়ে যায় তাঁরা। সেখান হতে বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় ঘটে যায় আরেক বিপত্তি। ভুলবশত তাঁরা দুই গ্রুপ উঠে পড়েন দুইটি ভিন্ন ট্রেনে। ফলস্বরুপ ভিন্ন সময়ে গিয়ে পৌঁছেন বার্সেলোনা। ঠিক দুইদিন বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরার পরে একে অপরের দেখা পান। তাঁরা বুঝতে পারেন নতুন শহরটাও তাঁদের জন্য নিরাপদ নয় কারণ গোয়েন্দা তল্লাশি এখানেও চলছে। দেরী না করে তাঁরা মাদ্রিদে ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। ওইখানে চার্জ দ্যা এফেয়ার্স মিঃ বেদির সঙ্গে দেখা করে আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করে জানতে পারেন, পলায়নরত সৈনিকেরা চাইলেই প্যারিসের ভারতীয় দূতাবাসে আশ্রয় নিতে পারতো কারণ সাবমেরিন হতে পালানোর খবর প্রচারিত হওয়ার পর ভারতের সরকার সব ভারতীয় দূতাবাসে জানিয়ে দিয়েছে পলাতকদের সন্ধান পাওয়া মাত্রই যেনো তাঁদের দিল্লী নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়।

অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে আসে দলের মাঝে। এতদিনের দৌঁড়ছুট ফুরিয়ে এলো বলে।
এরপর যাবতীয় ব্যবস্থা করে বিমানে উঠে পড়লো বাংলার দামাল ছেলেরা। ইতিমধ্যেই মাদ্রিদে একটি সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিরা তাঁদের সম্পর্কে স্বীকার করে নেয় সাংবাদিকদের কাছে আর সংবাদটি পৌঁছে যায় সারাবিশ্বে। রোমে অবতরণের সাথে সাথেই সাংবাদিকরা তাঁদের ঘিরে ধরে কারণ এক সাংবাদিকের জবাবে বিদ্রোহী নাবিক বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্যই ভারত হয়ে বাংলাদেশে যাবো। মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধ করবো।”

এদিকে পাকিস্তানী দূতাবাস তাঁদের নিজেদের নাগরিক বলে সরিয়ে ফেলার পাঁয়তারা করলে ভারতীয় দূতাবাস তৎক্ষণাৎ তা নশ্চাৎ করে দিয়ে একটি হোটেলে তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন এবং কড়া পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করে দেন এবং সুইস বিমানে ভারতের উদ্দেশ্যে চড়ে না বসা পর্যন্ত কারোও কথায় কান না দিতে সতর্ক করে দেন। তবে পাকিস্তানীদের তৎপরতা বন্ধ নেই। বিভিন্ন রকমের বাধা, হরেকরকমের অনুরোধ-প্রলোভন দেখিয়ে যাচ্ছে তাঁদের।

তবে দামাল ছেলেদের বুকের পুরোটা অংশ জুড়ে রয়েছে মাতৃভূমিকে হানাদারদের কবল হতে মুক্ত করার স্বপ্ন। সব ধরণের প্রলোভন ঠেলে তাঁরা এগিয়ে চললো এবং বিমানে উঠে পড়লো। একেকজনের মন তখন পড়ে আছে মাতৃভূমির মাটিতে। একটা সময় জেনেভা হতে সুইস বিমানটি গিয়ে পৌঁছাল বোম্বে বিমানবন্দরে। নৌ-কমান্ডোরা পা রাখলো ভারতের মাটিতে। এখান থেকেই তাঁদের প্রস্তুতি নিতে হবে দেশ স্বাধীনের।
৮ এপ্রিল ১৯৭১। বিমানযোগে বোম্বে বিমান বন্দরে অবতরণ করেন বিদ্রোহী বাঙালী অফিসাররা।

বিদেশের মাটি হতে গঠিত হওয়া এই দলটিই ছিলো পাকিস্তান সামরিক বাহিনী হতে বিচ্যুত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রথম এবং বড় আকারের একটি সামরিক দল। এই ৮ জন বাঙালীর দ্বারা গঠিত ৪০০ জনের নৌ-কমান্ডিং ফোর্স মুক্তিযুদ্ধ তথা সারাবিশ্বের জন্য একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

বোম্বে হতে নয়াদিল্লীতে পৌঁছে হোটেল রণজিতে দেখা হয় ভারতীয় নৌবাহিনীর কমান্ডার মিঃ শর্মার সঙ্গে। ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের ধরিয়ে দিতে পাকিস্তান সরকার বিরাট অঙ্কের পুরষ্কার ঘোষণা করে এবং সামরিক আইনে বিচার করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। অপরদিকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সদ্য ফেরত বাঙালীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলো। অনেক রকমের প্রশ্ন করা হলো তবে বাঙালী অফিসারদের উত্তর বলিষ্ঠ একটাই, ‘তাঁরা মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে পালিয়ে এসেছে।‘ এমন সোজাসাপ্টা উত্তরে নিশ্চিত হলো এদের দ্বারা ভারতের মাটিতে গুপ্তচরবৃত্তি বা কোন অসৎ উদ্দেশ্য এই বাংলার সন্তানদের মধ্যে থাকতে পারে না। তুষ্টচিত্তে তাঁদের থাকার অনুমতি দেয়া হয়।

এদিকে মিঃ শর্মা নৌ কমান্ডো বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য গাজী মোঃ রহমত উল্লাহকে নির্দেশ দেন। তাঁদের উৎসাহ আরো দ্বিগুণ হয় যখন প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে দিক নির্দেশনা দিতে শুরু করেন আর সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল এস এম নন্দা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা রায় চৌধুরীর সংযুক্ততা আরো গতিশীল করে তুলে তাঁদের।
ব্যাপারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং কর্নেল ওসমানী জানতেন।

সময় ১৩ মে, ১৯৭১ সাল। শপথ বাক্য পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নৌ-কমান্ডের প্রশিক্ষণ।
নৌ-কমান্ডের প্রশিক্ষণ বেশ কষ্টসাধ্য এবং ঝুঁকিতে ভরপুর। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দীর্ঘসময় ধরে সাঁতার কাঁটা (বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনে প্রায় ২০-২৫ মাইল) এবং দম ধরে রেখে পানির নিচে দীর্ঘসময় ধরে ডুব দিয়ে থাকা। এরমধ্যে আরো কষ্টসাধ্য হলো গামছার সাথে ইট প্যাঁচিয়ে শরীরের সাথে বেঁধে সাঁতার কাঁটা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, শত্রুদের ঘাঁটিতে যাতে সাঁতার কেটে মাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা প্রদান করা। ভারতীয় নৌ কমান্ডার এম এন সামন্তের অধীনে এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জি মার্টিসের সার্বিক পরিচালনায় এভাবেই প্রস্তুতি চলছিলো তাঁদের মুর্শিদাবাদের পলাশীতে ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী একটি জনশূন্য দুর্গম এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। যদিও বাঙালী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা বেশ কয়েকদিন ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। ক্যাম্পের আশেপাশে ছিলো ঘন জঙ্গল। স্বাভাবিকভাবে সাপের উপদ্রব ছিল বেশি তাই ক্যাম্পের আশেপাশে গর্ত খুঁড়ে ফেলে রাখা হতো কাঁটাযুক্ত গাছের ডালপালা। প্রশিক্ষণ ছিলো মূলত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর। যেমন: সাঁতার কাঁটার পাশাপাশি কিভাবে পানির নিচে বিস্ফোরণ করা যায় সে বিষয়ে। বলাবাহুল্য এই ব্যাপারটি ছিলো সবচেয়ে বেশি বিপদজনক কারণ একটু এদিক ওদিক হলেই মৃত্যু । কতোটা বিপদজনক তা বুঝতে বলা যায়, বিস্ফোরণ কালীন ৫০০ গজের মধ্যে অবস্থানরত যেকোনো প্রাণীর ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তাছাড়া অস্ত্র চালানো, গ্রেনেড ও বিস্ফোরক চার্জ করা সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। বাহিনীতে সদস্যের সংখ্যা ৮ হতে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় চারশো এর বেশি। এরমধ্যে বেশিরভাগ ছিলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যা এসেছিলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, মাদারীপুর, বরিশাল ও চাঁদপুর অঞ্চল হতে।

বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহৃত হতো লিমপেট মাইন, এদের উৎপাদন যুগোস্লাভিয়ায়। নৌ কমান্ডোদের জন্য আনা হলো পাঁচ কেজি ওজনের প্রায় ২০০০ লিমপেট মাইন যার বাজারমূল্য ছিলো প্রতিটি ১ হাজার ২০০ ইউ এস ডলার।

নৌ-কমান্ডোরা কোনো ধরণের অস্ত্র বহন করতো না শুধুমাত্র একটি ছোরা বা চাকু ব্যতীত। নিরাপত্তার চেয়ে বরং এই ছোরা ব্যবহৃত হতো পানির নিচে থাকা জাহাজের অংশ পরিষ্কারে যেখানে প্রচুর শ্যাওলা জমে থাকতো এবং এরপর মাইন স্থাপন করে সেফটি পিন খুলে দ্রুত সটকে পড়া লাগতো কমান্ডোদের। তবে সেফটি পিন তাঁদের সঙ্গে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হতো যা হতে প্রমাণিত হবে তাঁরা মাইন প্রতিস্থাপনে সফল হয়েছেন। জীবন ঝুঁকি প্রবল এবং সামান্য ভুলে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কমান্ডোরা এই অভিযানে বিন্দুমাত্র পিছপা হতো না।

অপারেশন জ্যাকপট : মূল অভিযান

সময় ১৪ আগস্ট, ১৯৭১ সাল। দিনটি ছিলো পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার পরে ১৪ আগস্টকে আক্রমণের দিন হিসেবে নির্ধারণ করার পিছেও ছিলো একটা অন্যতম উদ্দেশ্য। এদিনে পাকিস্তানীরা ব্যস্ত থাকবে তাদের জাতীয় দিবসের উদযাপনে যার কারণে তাদের নৌ ঘাঁটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হয়ে উঠবে অনেকটা শিথিল।

তবে যুদ্ধ চলমান থাকায় ঐ দিনে গেরিলা হামলার আশঙ্কায় নেয়া হলো বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যার কারণে সম্ভাব্য দিন বদলিয়ে ঠিক করা হলো পরেরদিন হামলা চালানো হবে।

১৬০ জন নৌ কমান্ডোকে আগে হতেই ভাগ করে ফেলা হয়েছিলো ছয়টি দলে যাদের মধ্যে ৬০ জন সদস্যের প্রথম দল চট্টগ্রাম বন্দর, দ্বিতীয় দল ১৮ জন সদস্য নিয়ে চাঁদপুর বন্দর, তৃতীয় দল ২০ জন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ বন্দর, চতুর্থ দল ৪৮ জন নিয়ে খুলনার মংলা বন্দর, পঞ্চম দল ৮ জন নিয়ে দাউদকান্দি ফেরিঘাট এবং সর্বশেষ দল ১২ জন নিয়ে হিরণ পয়েন্ট আক্রমণের দায়িত্বে ন্যস্ত হয়। প্রত্যেক দলের নেতাদের অপারেশন জ্যাকপটের খুঁটিনাটি বিষয়াদি এবং টেকনিক্যাল বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে বিমানযোগে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লীতে এবং ১লা আগস্ট আবার পলাশীতে ফিরিয়ে আনা হয়। অপারেশনের সময় তাঁদের দেয়া হয় একটি করে ট্রানজিস্টার যার মাধ্যমে দুইটি গানের মাধ্যমে দলনেতারা জানতে পারবে কিভাবে অভিযান চালাতে হবে বা কখন অভিযান বন্ধ রাখতে হবে। নিয়ম হলো গান বাজানো হলে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং বাজানো না হলে অভিযান হতে বিরত থাকা লাগবে।

দুইটি গানের মধ্যে ছিলো একটি পঙ্কজ মল্লিকের, “ আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান, তার বদলে আমি চাইনি কোন দান।“ এবং দ্বিতীয়টি ছিলো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি, ওরে তোরা সব উলুধ্বনি কর।”
প্রথম গানটি বাজানো হলে বুঝা লাগবে ২৪ হতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন শেষ করার সব প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দ্বিতীয়টি হলো ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আঘাত হানতে হবে আর কোন কারণে গান বাজানো না হলে বিরত থাকা লাগবে এবং অপেক্ষা করতে হবে গান না বাজানো পর্যন্ত।
সময় তখন ১৫ আগস্ট, ১৯৭১ সাল।

নদী ও সমুদ্রবন্দরে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত নৌ কমান্ডোরা।
এই অপারেশনের নামকরণ করা হয় “অপারেশন জ্যাকপট” যা ছিলো বিশ্বের বুকে অন্যতম দুঃসাহসিক অভিযান।
ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিংয়ের উপর ন্যস্ত ছিলো অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনার ও বাস্তবায়নের সবধরনের দায়িত্ব। প্রত্যেক কমান্ডো দল নিজ নিজ লক্ষ্যের জন্যে বেরিয়ে পড়তে লাগলো দ্রুত। স্বাধীনতা যুদ্ধাঞ্চলকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয় যার মধ্যে ১০ নম্বর সেক্টর ছিলো নৌ-কমান্ডোর অধীনে। এই সেক্টরের কোন নির্দিষ্ট কমান্ডার ছিলো না বিধায় অপারেশনের সময় যে অঞ্চলে অভিযান চালানো হবে ওই সেক্টরের কমান্ডারের অধীনে অভিযান পরিচালিত হবে।

চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর অপারেশন

চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে। হরিনা ক্যাম্প থেকে আগত ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়। সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম বন্দরের অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান শুরু হওয়ায় কিছু কিছু জায়গায় অভিযান সপন্ন হয় ১৬ আগস্টে। কমান্ডোরা জাহাজে মাইন স্থাপন করে ফেরত আসেন। কিছু মাইন নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে চট্টগ্রাম বন্দর এবং প্রায় ১০ হাজার টন সরঞ্জামসহ ‘এম ভি হরমুজ’ এবং ১০,৩১৮ টন সরঞ্জামসহ ‘এম ভি আল-আববাস’ নামের দুইটি পাকিস্তানি জাহাজসহ বেশ কয়েকটি বার্জ ও জাহাজ ধ্বংস হয়। অভিযান শেষে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী সহযোদ্ধাদের নিয়ে ফিরে আসেন ভারতে।

মংলা সমুদ্র বন্দর অপারেশন

১৩ ই আগস্ট, ১৯৭১ সাল। দল প্রধান আমিনুর রহমান খসরুর নেতৃত্বে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো এবং ২০০ জন বাংলাদেশী সি এন্ড সি বিশেষ কমান্ডো দল নিয়ে গভীর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে দলটি মংলা বন্দরে যখন পৌঁছায় তখন সময় সন্ধ্যে ৬টা প্রায়।

১৫ ই আগস্ট একশনে যাওয়ার নির্দেশনা পেয়ে ঠিক রাত বারোটায় মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তাঁরা। এখানে কিছুটা গন্ডগোল বাঁধে পথনির্দেশক আফজালের ভুলের কারণে। যার কারনে অভিযানে পৌঁছাতে রাত দুটোর বদলে চারটা বেজে যায়। ওইদিকে অন্যান্য স্থানে অপারেশন শেষ। মংলার এই অপারেশনটি ছিলো সরাসরি সুইসাইড বা নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সামিল। তবুও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দল প্রধান আমিনুর রহমান খসরুর নেতৃত্বে ২০০ জন সি আন্ড সি বিশেষ কমান্ডো দল, হেভি মেশিন গান, মেশিনগান, এনরগা সহকারে পুরো দলকে ৩ জনের ছোট ছোট দল এবং ৬৬টি উপদলে ভাগ করে দেন আর নৌ-কমান্ডোদের ছাউনি দিতে (পিছ হতে কভার করা) মংলা বাঁধের পিছনে অবস্থান নেন। পিছে কভার হিসেবে থাকার জন্যে হাটুপানিতে মেশিন গান হাতে নেমে পড়েন সাব কমান্ডার রাজা ও খিজির। মংলা অপারেশন কমান্ডার আমিনুর রহমান খসরু এবং তাঁর সঙ্গে আরোও ২ জন নৌ- কমান্ডো এই অপারেশনে মংলা বন্দর এর অতিরিক্ত বাধা পার হয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে সোমালীয় জাহাজ এস,এস,লাইটং-এ মাইন লাগান যার মধ্যে ছিলো ৭ হাজার টনের অস্ত্রসম্ভার এবং সেই সাথে এস.এস. লাইটং-কে ধ্বংস করেন। এই অপারেশনে নিখোঁজ হন যারা হয়তো স্রোতের টানে ভেসে গেছেন অথবা মারা গিয়েছেন অপারেশন চলাকালীন সময়ে। সর্বোপরী এই অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩০ হাজার টন গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম ডুবিয়ে দেয়া হয় সম্পূর্ণভাবে।

চাঁদপুর নদী বন্দর অপারেশন

এটিও ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাত বা ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে হয়েছিল। এ অপারেশনে ১৮ জন নৌ-কমান্ডো অংশ নেন। এ গ্রুপের ১৮ জনকে তিনজন করে মোট ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়। এই অভিযানে মাইন বিস্ফোরণে ২টি স্টিমার, গমবাহী একটি জাহাজ সহ ছোট বড় আরো অনেকগুলো নৌযান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশন

এটিও ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাত বা ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে হয়েছিল। এ অপারেশনে মোট ৪টি জাহাজ ও বেশ কয়েকটি নৌযান নৌ কমান্ডোরা ধংস করেন। শহরের মাঝে এ অপারেশনে কমান্ডোরা বিশেষ সাহসকতার পরিচয় দান করেন। এ অপারেশনে মোট ২০ জন কমান্ডো অংশ নেন।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ

১৫ আগস্টের ঐ অপারেশনগুলোতেই প্রায় ২৬টি জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং আরো অনেক নৌযান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আগস্ট মাসের এসব অপারেশন ছাড়াও আগস্ট-নভেম্বর মাসব্যাপী আরো অনেকগুলো নৌ-কমান্ডো অপারেশন পরিচালনা করা হয়। এসব অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হলঃ

  • প্রায় সর্বমোট ৫০৮০০ টন জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিমজ্জিত।
  • ৬৬০৪০ টন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত।
  • এবং বেশ কিছু সংখ্যক পাকিস্তানি নৌযান বাংলাদেশী নৌ-কমান্ডোদের হস্তগত।

অপারেশন জ্যাকপট মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সফল অভিযান । এর ফলে বাংলাদেশের বিজয় আরো তরান্বিত হয়েছিল ।

সামরিক বিষয় নিয়ে আমাদের ওয়েবসাইটে একটি বিভাগ আছে, যেখানে শুধু সামরিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক নিবন্ধ আছে ।
সামরিক বিষয়ের উপর আরো বিভিন্ন তথ্যবহুল নিবন্ধ পড়তে আমাদের সাইটের সামরিক বিষয় বিভাগটিতে প্রবেশ করুন ।

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।