নিবন্ধ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতী যোদ্ধারা :

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতী যোদ্ধারা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতী যোদ্ধারা –

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিছু ভিন দেশী মুক্তি যোদ্ধাদের আমারা কখনো ঠিক ভাবে মূল্যায়ন করিনি । সে রকম এক দল যোদ্ধা হল তিব্বতী যোদ্ধা । যারা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মার-প্যাচে ভারতীয় কমান্ডে বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে যুদ্ধ করে। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধে অনেক বিসর্জনের ভেতর দিয়ে সেসব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অদ্যাবধি অকথিতই রয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবার মতন বিজয়দীপ্ত গৌরবের পাশাপাশি এই বেদনাদায়ক উদাসীনতা চিরকালের জন্য এক বিরাট অকৃতঘ্নতার নিদর্শন হয়ে থাকবে বৈকি! যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসএফএফ। কিন্তু তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাস আজ পর্যন্ত আড়ালে পড়ে আছে। বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের স্বাধীন দেশ পেয়েছে। কিন্তু ওই তিব্বতিরা আজও ভারতে ‘আশ্রিত’। যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ভারত এবং বাংলাদেশেও কোনো স্বীকৃতি মিলেনি এ দেশহীন মানুষদের।

চলুন দেখি কারা এরা ?

ইন্দো-চীন যুদ্ধের পর এবং ১৯৬২ সালের শেষের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘রিসার্চ এন্ড এ্যানালাইসিস উইং’ (RAW)-এর জোর প্রচেষ্টা ও লবীর কারণে তৎকালীন নেহেরু সরকারের নির্দেশে গঠনকরা হয় এলিট কমান্ডো ইউনিট যার প্রাথমিক গোড়াপত্তন হয়েছিল তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা’র সাথে সে দেশে পালিয়ে আসা যোদ্ধাদেরকে নিয়ে। চুসি গ্যাংদ্রাগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে খামপাসদের রিক্রুটের ভেতর দিয়ে এই নয়া ইউনিটের জন্ম। নেতারা ওই উন্নয়নমুখি প্রস্তাবে খুব দ্রুতই সাড়া দেন এবং সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং পরবর্তীতে ইউনিটের কার্যক্রম ও সাজ-সরঞ্জাম দেখে এও আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে তিব্বতের স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্থাৎ নিজের কাজেই লাগানো যাবে। এ ব্যাপারে ‘ইন্ডিয়ান এক্সটারনাল ইন্টেলিজেন্ট সার্ভিস’, ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA)’, এবং ‘চুসিগ্যাংদ্রাগ’-এর মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।তিব্বতের তিনজন টপ লিডারের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ও ভারতে প্রবাসী দু’জন যথাক্রমে জেনারেল গনপো তাশি ও জাগো নামগিয়াল দর্জি যারা আগে থেকেই ভারতে মুসতাং ভিত্তিক একটি গেরিলা বাহিনীর সদস্য সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, এরাই পরে চুসি গ্যাংদ্রাগ-এর পক্ষে বাহিনীর সর্বময় দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৫,০০০ সদস্য বিশিষ্ট এই পাহাড়ী গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় দেরাদুন-এ। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও ‘র’-এর সরাসরি অপারেশনাল কমান্ডের অধীনে গঠিত হয় এই ‘স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স'(SFF), চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি মোকাবেলার কাজে এটি প্রথম সমবেত গোপন ইন্টেলিজেন্স ও কমান্ডো হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন CIA-এর প্যারামিলিটারি অফিসাররা এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)-এর নিজস্ব স্পেশাল অপারেশন্স ইউনিট – স্পেশাল সার্ভিস ব্যুরো (SSB)। দু’বছরের প্রশিক্ষণ শেষে এই SFF বাহিনীকে পরিপুর্ণ প্রশিক্ষিত এয়ারবোর্ণ বাহিনী হিসেবে নিবেদিত মাউন্টেইন ও জাঙ্গল ওয়ারফেয়ার ইউনিট হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। SFF-এর আরো বেশি সুখ্যাতি ছড়ায় যখন এর প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব পড়ে “এস্টাবিলিশমেন্ট ২২” এর ওপর, কেননা এর ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন মেজর জেনারেল সুজান সিং, ব্রিটিশ আর্মির লিজেন্ডারি ফিগার মিলিটারি ক্রস প্রাপ্ত, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে ২২তম মাউন্টেইন রেজিমেন্ট’র কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন, আরো ছিলেন আফ্রিকায় লং রেঞ্জ ডিজার্ট স্কোয়াড্রনেরও সেনাপতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর প্রথম যে বিদেশী বাহিনীটি এতে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নিতে কাজ শুরু করে, সেটি হচ্ছে এসএফএফ। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে নয়, ভারতের সহযোগিতায় তাদের পাশাপাশি যুদ্ধ করেছে তিব্বতি গেরিলারা। গেরিলাদের এক জ্যেষ্ঠ নেতা দাপোন রাতুক নগোয়ান সম্প্রতি তার স্মৃতিকথাপ্রকাশ করেছেন। সেখানে নিজেদের লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে উঠে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর্বও।আর সব যুদ্ধে যেমন হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিব্বতিদের শত্রু-মিত্রের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গিয়েছিল সব। কথা ছিল চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসএফএফ’কে সাহায্য করবে ভারতীয় সরকার। কিন্তু কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে চীন-ভারত যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় মাতৃভূমির দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়া হয়নি তিব্বতিদের। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের ‘র’ বা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকাল উইয়েংর পরামর্শ অনুযায়ী তিব্বতিদের এক বিশেষ অভিযানে নামানোর উদ্যোগ নেয় দেশটির সরকার। রাতুক নগোয়ানের পদবি তখন তিব্বতি ভাষায় ‘দাপোন’, ইংরেজিতে ব্রিগেডিয়ার। ভারতের প্রস্তাবের পর ব্রিগেডিয়ার রাতুকের ভাষায়, তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের দিল্লিস্থ সদর-দফতর থেকে গেরিলাদের বলা হয় ‘এ যুদ্ধে যাবার কোনো বিকল্প নেই’। স্মৃতিকথা প্রকাশে ব্রিগেডিয়ার রাতুক এনগোয়ান এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, ‘‘যদিও গেরিলা যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ছিল আমাদের, কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় আমাদের প্রথম প্রধান শত্রু হলো মিজোরা। তিব্বতিদের যেমন ভারত প্রশিক্ষণ দিয়েছে, মিজো যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে পাকিস্তান।’’প্রসঙ্গত, ভারত শাসিত সাতবোন অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী গেরিলাদের তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান ভূখণ্ডে বিশেষত পার্বত্য এলাকায় আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা দিত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। মিজো যোদ্ধারা তখন স্বাধীন মিজোরাম দেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লিপ্ত।

ভারতীয় সম্পৃক্ততার চিহ্ন ঢাকতে তারা ব্যবহার করে বুলগেরিয়ান একে ফর্টিসেভেন এসল্ট রাইফেল। আর ছুরি। সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে পরে অবশ্য চারটি এমআই ফোর হেলিকপ্টার বরাদ্দ পায় তারা। দুর্গম জঙ্গল আর পাহাড়ে একের পর এক পাকিস্তানী চৌকি দখলে আনে তিব্বতীরা বুনো হুঙ্কারে। ক্লাসিক গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর চোখে ধুলো দিয়ে তার পেছনে গিয়ে আক্রমণ করতো এসএফএফ। তবে শুরুটা তাদের শোকাহত ছিল। কমান্ডার দীপন ধন্দুপ যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হন শত্রুর গুলিতে। কাপ্তাই বাঁধ ধ্বংস, পার্বত্য চট্টগ্রামকে মিজোদের তৎপরতা থেকে মুক্ত এবং চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অনুকুল পরিবেশ তৈরির সেই মিশন সফলভাবেই সারে এসএফএফ। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানীরা যখন আত্মসমর্পণ করছে তখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলো তিব্বতী এই পাহাড়ি যোদ্ধারা। এর আগে দোহাজারী ব্রিজ ধ্বংস ও দখল করে বার্মায় পাকিস্তানীদের পালানোর পথ বন্ধ করে দেয় তারা। শত্রুমুক্ত চট্টগ্রামে প্রটোকল ভেঙ্গেই কুচকাওয়াজ করে এসএফএফ। এরপর তাদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা বন্দী করে ১ হাজার মিজো সেনা।ব্রিগেডিয়ার রাতুকের বিবরণ থেকে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী মিজোরামের দেমাগিরি ঘাঁটিতে মোতায়েন হবার পর পাকিস্তানের বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়- তিব্বতি কমান্ডোরা প্রথম ও প্রধান লড়াইটা করেছে মিজো গেরিলাদের বিরুদ্ধেই। চীনের শাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভূমি তিব্বতের অধিকার আদায়ের লড়াই করার জন্যই ভারতের সহযোগিতা নিয়েছিলেন রাতুক আর সহকর্মীরা। কিন্তু ভারতের হয়ে তাদের এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথমেই লড়তে হলো, যে মিজো যোদ্ধারাও লড়ছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তিব্বতি গেরিলাদের বিজয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। একাত্তরের নভেম্বর মাসে মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে ঢুকে তিব্বতি বাহিনী পাকিস্তানি ঘাঁটিগুলো জয় করতে শুরু করে। পার্বত্যাঞ্চলে প্রচুর সম্মুখ যুদ্ধ হয়। প্রধানত বিভিন্ন সেতু ধ্বংস করার কাজ করে তিব্বতি বাহিনী। কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র এবং কাপ্তাই বাঁধে আক্রমণ করে।যুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৭ নম্বর ব্রিগেড ও দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়ন পার্বত্য পথ ধরে বার্মায় পিছু হটতে চাইলে তিব্বতি বাহিনী সাফল্যের সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ করে। যুদ্ধে এসএফএফ’র মোট ৫৬ জন সদস্য শহীদ হয়। বিগ্রেডিয়ার রাতুকের সম্প্রতি প্রকাশিত স্মৃতিকথা ছাড়াও এ যোদ্ধাদের কর্মকাণ্ডের আংশিক বিবরণী পাওয়া যায় বাহিনীটির আনুষ্ঠানিক কমান্ডার জেনারেল এসএস উবান-এর ‘দি ফ্যান্টমস অফ চিটাগং: ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ’ নামের বইতেও।যুদ্ধ শেষে ৫৮৪ জন্য যোদ্ধাকে নগদ অর্থ উপহার দেয় ভারত সরকার। কোনো সম্মাননা মেলেনি। আইনগতভাবে প্রকাশ্যে ভারতে আশ্রিত তিব্বতিদের কোনো ‘রাজনৈতিক’ বা ‘সামরিক’ কর্মকাণ্ডে জড়ানো নিষেধ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ‘ঝামেলা’ এড়াতে ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিব্বতি এ বাহিনীর পরিচয় দিতো ‘মুক্তি বাহিনী’ হিসেবেই। ‘মুক্তি বাহিনী’র ছদ্মাবরণেই আজো ঢেকে আছে তিব্বতি বীরদের সাফল্য ও সম্মান।

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।