নিবন্ধ

আল্লাহর গজব নাজিল হওয়ার কিছু ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা

আল্লাহর গজব নাজিল হওয়ার কিছু ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা

পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন পাপী ব্যক্তি বা জাতির ওপর ভয়ংকর গজব অবতীর্ন হয়। যুগে যুগে বহু ব্যাক্তি ও জাতির উপর আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। কখনো ছোট ছোট শাস্তি দিয়ে ভয় দেখানো হয়ছে বা শাস্তি দেয়া হয়েছে। সুযোগ দেয়া হয়েছে ভালো পথে ফিরে আসার আবার কখনো কখনো গজব এতটাই ভয়াবহ ছিলো যে সম্পূর্ন নিশ্চিন্হ হয়ে গেছে সমগ্র জাতি। এখানে আমরা আপনাদের জন্য আল্লাহর গজব দ্বারা ধংস বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এমন কয়েকটি ব্যক্তি ও জাতির ঘটনা তুলে ধরবো।

হযরত নুহ আ. এর সময়কার আল্লাহর গজব –

আল্লাহর নবী হযরত নুহ আ. এর সময়কার মহাপ্লাবনের ঘটনা আমরা অনেকেই জানি। পৃথীবিতে আল্লাহ যতবার গজব নাজিল করেছেন তার মধ্যে অন্যতম ও ভয়ংকরতম গজব হচ্ছে হযরত নুহ আ. এর সময়কালের মহাপ্লাবন। যা সমগ্র পৃথীবির ইতিহাস পাল্টিয়ে দিয়েছিলো।

আল্লাহ তাআলা হযরত নুহ আ. কে পৃথীবিতে ৯৫০ বছরের হায়াত দান করেছিলেন। তিনি তার ৯৫০ বছরের দীর্ঘ জীবনে মানুষের কাছে আল্লাহর বানী প্রচার করেছেন, মানুষকে সত্য পথে আসার আহবান জানিয়েছেন। তার সময়কালে মানুষ মূর্তি পূজা, অগ্নিপুজা সহ বিভিন্ন দেব দেবীর পুজায় মগ্ন হয়ে ছিলো। অন্যায় অবিচারে ছেয়ে গিয়েছিলো পৃথীবি। বার বার বুঝানোর পরও অল্প কিছু মানুষ ছাড়া কেউ তার কথায় কান দেয়নি। এমনকি অনেকেই তাকে ব্যাঙ্গ করেতো এবং তার উপর নির্যাতন করতো। তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কথা শুনতে চাইতোনা। তিনি আল্লাহর বানী প্রচার করতে গেলে লোকেরা বলতো “নুহ তুমি চুপ করো। তুমি যদি চুপ না করো তাহলে পাথর মেরে তোমার মগজ বের করে দিবো।”

বহু চেষ্টার পরও অল্প কিছু মানুষ ছাড়া যখন সবাই হযরত নুহ আ. কে প্রত্যাখান করলো তখন আল্লাহ মহাপ্লাবনের গজব নাজিল করার কথা জানিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলা হযরত নুহ আ. কে একটি নৌকা তৈরি করতে বললেন। যেই নৌকায় শুধু বিশ্বাসিরা স্থান পাবে। বাকি সবাই ডুবে মরবে।

নুহ আ. আল্লাহর প্রতি যারা ইমান এনেছিলো তাদেরকে এবং প্লাবন থেকে বাচতে পারবেনা এমন সকল জীব-জন্তু ও পশুপাখি জোড়ায় জোড়ায় তার নৌকায় তুলে নিলেন। নির্ধারিত সময়ে শুরু হলো প্লাবন। প্রচন্ড ঝড় ও বর্ষনের পাশাপাশি মাটির নীচ থেকেও উঠতে লাগলো পানি । প্রচন্ড গতিতে বাড়তে লাগলো পানি। সবাই বাচার জন্য ছোটাছুটি শুরো করলো। কিন্তু ততক্ষনে যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। প্লাবন এতটাই তীব্র আকার ধারন করলো যে উচু গাছপালা তো দুরে থাক, বিশাল বিশাল পাহাড়, পর্বত সবকিছু পানির এত গভীরে তলিয়ে গেল যে সেগুলোর কোন অস্তিত্বই খুজে পাওয়া গেলনা। সবাই পানির নীচে ডুবে মরলো। এমনকি হযরত নুহ আ. এর নিজের সন্তানও ইমান না আনায় ডুবে মরলো। বেচে রইলো শুধু হযরত নুহ আ. এর নৌকায় থাকা বিশ্বাসিরা। নৌকাটি এই প্লাবনের মাঝে ভাসতে লাগলো। একটানা ৪০ দিন পর্যন্ত মহাপ্লাবন চললো। তারপর আল্লাহ প্লাবন থামিয়ে দিলেন। নুহ আ. এর নৌকা ভাসতে ভাসতে একটি পাহাড়ের উপর এসে থামলো। মহাপ্লাবন থেমে যাওয়ার পর সবাই তার নৌকা থেকে নেমে এলেন। ধংস হয়ে যাওয়া পৃথীবিকে তারা আবার নতুন করে সাজিয়ে তুললেন। পৃথীবিতে পুনরায় শুরু হলো মানব জাতির বিচরন।

উক্ত ঘটনার পর বেশ কিছু বছর মূর্তিপূজা, দেব দেবীর উপাসনা বন্ধ ছিলো। তখন মানুষ শুধুই আল্লাহর ইবাদত করতো কিন্তু পরে ধীরে ধীরে আবারও মানুষ ভূল পথে হাটতে শুরু করে।

হযরত হুদ আ. এর জাতির উপর আল্লাহর গজব –

আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগের কথা।
আল্লাহ তাআলা হযরত হুদ আ. কে প্রেরন করেন আদ জাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে। হযরত হুদ আ. ছিলেন হযরত নুহ আ. এর একজন বংশধর। তার জাতির নাম ছিলো “আদ”।

এই আদ জাতির লোকেরা ছিলো অনেক লম্বা, স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী। তাদের উচ্চতা ছিলো ১৮ ফুটের মতো! দৈহিক শক্তির কারনে তারা নিজেদের সবচাইতে সেরা মনে করতো এবং অহংকার করে বেড়াতো। এছাড়া বহু অন্যায় কাজেও তারা লিপ্ত হয়ে পরেছিলো। যা মন চায় তাই তারা করতো। তারা ভাবতো তাদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই। এমনকি হযরত নুহ আ. এর মহাপ্লাবনের পরে মূর্তিপূজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। পৃথীবি যখন নতুন করে যাত্র শুরু করছিলো তারপর এরাই আবার প্রথম পৃথীবিতে পুনরায় মূর্তিপূজা শুরু করেছিলো।

আল্লাহর নবী হযরত হুদ আ. বারবার বুঝানোর পরও তারা অন্যায় চালিয়ে গিয়েছে। ফলে তাদের উপর নেমে আসে আল্লাহর গজব । প্রাথমিকভাবে একটানা ৩ বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যায়। তাপমাত্রা বেড়ে যায় প্রচুর। ফলে তাদের ক্ষেত খামার, উদ্যান, গাছপালা সব কিছু শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়, মরুভূমিতে পরিনত হয় তাদের সমগ্র অন্চল। নিজেদের করুন অবস্থায় তারা দিশেহারা হয়ে পরে কিন্তু তবুও তারা পাপাচার ও মূর্তিপূজা বন্ধ করেনি। অবশেষে তাদের পরিনতি যখন একদম ধংসের দিকে ধাবিত হয় তখন তারা আল্লাহর কাছে বৃষ্টি চেয়ে সাহায্য কামনা করে। এরপর আকাশে লাল, সাদা এবং কালো- এই তিন রংয়ের মেঘ দেখা দেয়।

আকাশ থেকে গায়েবিভাবে আওয়াজ আসে যে, তোমরা কোন ধরনের মেঘ পছন্দ করো? তখন লোকেরা বলতে থাকে যে আমরা কালো মেঘ চাই। এটি আমাদের বৃষ্টি দিবে। কিন্তু কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো ভয়ংকর ঝড়। এরপর আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। শুরু হয় মূষূলধারে বৃষ্টি ও প্রচন্ড ঝড়।

একটানা ৭ রাত ৮ দিন পর্যন্ত চলে ভয়াবহ সেই ঝড়। সবাই মারা পরে এই ঝড়ে। চারিদিক থেকে উরে আসা ধুলাবালিতে চাপা পরে যায় আদ জাতির সাজানো গোছানো শহরটি। হারিয়ে যায় পৃথীবিবাসীর সামনে থেকে।

এরপর আদ জাতির কথা শুধু গল্পে বা মানুষের মুখে শোনা যেত কিন্তু তাদের আর কোন অস্তিত্ব ছিলোনা। কেউ আর তাদের সন্ধান পায়নি। ধীরে ধীরে সবাই ভুলে যায় এক সময়কার প্রতাপশালী আদ জাতির কথা। এরপর কেটে যায় শত শত বছর। হঠাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৬শ বছর পর কোরআন শরীফের “সুরা হুদ”এ আল্লাহ তাআলা আদ জাতির সম্পর্কে মানুষকে জানালেন। মানুষ জানতে পারলো হারিয়ে যাওয়া আদ জাতির কথা। প্রত্নতাত্বিক ও ইতিহাসবিদেরা আদ জাতিকে নিয়ে গবেষনা শুরু করলেন, তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করে খুজতে লাগলেন হারিয়ে যাওয়া এই জাতিটিকে। শত শত বছরের প্রচেষ্টা শেষে কুরআন শরিফের কথা সত্য প্রমান করে অবশেষে ১৯৯২ সালে প্রত্নতাত্বিকেরা ওমানের দোফার প্রদেশের মরুভূমিতে প্রায় ৪০ ফুট মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা আদ জাতির শহরটির ধংসাবশেষ খুজে পান।

ওমানের রাজধানী মাস্টক থেকে ৯০০ কিলোমিটার দুরে হারিয়ে যাওয়া এই শহরটির অবস্থান। বর্তমানে খনন করে আদ জাতির শহরটিকে মাটির নীচ থেকে বের করা হয়েছে। প্রতিবছর বহু পর্যটক হারিয়ে যাওয়া এই শহরটিকে দেখতে সেখানে ভ্রমন করেন।

বাদশাহ আবরাহা ও তার বাহীনির উপর আল্লাহর গজব –

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর দুনিয়াতে আগমনের কিছুদিন আগের ঘটনা। ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা কাবা ঘর ধংসের জন্য মক্কায় অভিযান পরিচালনা করে। সেখানেই তার উপর আল্লাহর গজব নাজিল হয় এবং আল্লাহ তার ঘরকে তিনি নিজেই রক্ষা করেন।

মক্কার পবিত্র কাবা ঘরের ভাব গাম্ভীর্য ও জনপ্রিয়তার জন্য দুর দুরান্ত থেকে বহু মানুষ কাবা ঘর জিয়ারত করতে আসতো। যা আংগুল ফুলে কলাগাছ হওয়া প্বার্শবর্তী দেশ ইমেয়েনের বাদশাহ আবরাহা মোটেই সহ্য করতে পারতোনা (আংগুল ফুলে কলাগাছ বললাম কারন সে একজন সামান্য ক্রীতদাস থেকে বাদশাহ হয়েছিলো)। সম্পূর্ন বিনা কারনে, শুধুমাত্র কাবাঘরের প্রতি মানুষের আকর্ষন ও জনপ্রিয়তায় সে ইর্ষাকাতর হয়ে পরেছিলো। (উল্লেখ্য, মক্কার মানুষ তখনও কাবা ঘরে জিয়ারত করতো এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করতো তবে তাদের বিশ্বাস পূর্নাঙ্গ ছিলোনা। তারা আল্লাহকে বড় প্রভূ মনে করতো এবং আল্লাহর পাশাপাশি আরো অনেককে ছোট প্রভূ বা অংশীদার মনে করতো যা ছিলো শিরক! তারা কাবা ঘরে ৩৬০টি বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি রেখে সেগুলোর পূজা করতো)।

সে কাবা ঘরের নামে বিভিন্ন দূর্নাম ও কুৎসা রটনা করতো কিন্তু তবুও মানুষ কাবা ঘর জিয়ারত বাদ না দেয়ায় সে অনেক টাকা খরচ করে খুব সুন্দর করে একটা আকর্ষনীয় গির্জা/উপাসনালয় তৈরি করলো এবং মানুষকে সেটিতে ভ্রমনের জন্য আহবান জানালো যেন মানুষ কাবা ঘরে না গিয়ে তার বানানো উপাসনালয়ে যায়। তবে মানুষ সেটিতে খুব একটা আকর্ষিত হলোনা। এরই মাঝে মক্কার কয়েক যুবক তার উপাসনালয়তে গিয়ে সেটিতে মলত্যাগ করলো বা সেটি নোংরা করে আসলো। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে আবরাহা মক্কায় আক্রমন করে কাবাঘর ধংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

সে ৬০ হাজার সৈন ও বেশ কিছু বিশালাকার হাতি নিয়ে মক্কার অভিমূখে রওনা হলো । পথে কাবা ঘরের অনুসারী বেশ কিছু ছোট ছোট গোত্র বাধা দিলেও তার বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াইতে টিকতে পারলোনা। অবশেষে সে মক্কার নিকটবর্তী এলাকায় এসে থামলো। সেখানে তার বাহিনী রাখালদের পশু লুট করলো। যার ভিতর নবিজীর দাদা আবদুল মোতালিবের ২০০টি উটও ছিলো। আবরাহা ঘোষনা করলো যে লুট করা পশু ফেরত নিতে চাইলে বা তার সাথে কথা বলতে চাইলে মক্কাবাসী যেন তাদের সর্দারকে তার সাথে আলোচনা করতে পাঠায়।

তখন মক্কার কোরাইশদের সর্দার ছিলেন নবীজির দাদা আবদুল মোতালিব। তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। আবরাহা তাকে বললেন যে আমি আপনাদের কাবাঘর ধংস করতে এসেছি। আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন।

আবদুল মোতালিব বললেন যে, “আমাকে আমার উটগুলো ফেরত দিয়ে দিন, তাহলেই আমি খুশি।” তার এই কথা শুনে আবরাহা বললো, আপনাকে খুব উচু দরের লোক মনে করেছিলাম। আপনি মক্কার সর্দার, অথচ আপনি আপনার জাতির বা বাপ দাদার ধর্মের কেন্দ্রস্থলের কথা চিন্তা না করে শুধু নিজের উটের কথা চিন্তা করছেন? আপানার প্রতি আমার সম্মান আর রইলোনা।

তখন আবদুল মোতালিব বললেন, “আমি আমার উটের মালিক, আর কাবাঘরের মালিক আল্লাহ। যার ঘর তিনিই রক্ষা করবেন, আমি শুধু আমার উট ফেরত পেলেই খুশি”। তখন আবরাহা বললো, ঠিক আছে আমি আপনার উটগুলো ফেরত দিয়ে দিচ্ছি তবে আমার হাত থেকে আপনাদের আল্লাহ তার ঘর রক্ষা করতে পারবে না।

আবদুল মোতালিব বললেন এটা আপনার আর আল্লাহর ব্যাপার। এই বলে তিনি তার উট নিয়ে চলে গেলেন।

ফিরে গিয়ে তিনি সবাইকে গ্রাম ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে বললেন যেন আবরাহার বাহিনী আক্রমন করলে গ্রামের কেউ মারা না যায়। গ্রাম ছেড়ে পালানোর আগে তিনি এবং আরো কিছু শীর্ষ স্থানিয় ব্যাক্তি শেষবারের মতো কাবা ঘর জিয়ারত করতে গেলেন। কাবা ঘরের দরজায় বসে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন কারন আবরাহার শক্তিশালী বাহিনীকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। এই কঠিন পরিস্থিতিতে তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, “আল্লাহ তোমার ঘরকে তুমিই রক্ষা করো, এর মর্যাদা তুমিই রক্ষা করো।” তখন কাবায় আরো ৩৬০টি দেব দেবীর পুজা করা হতো কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতিতে তারা অন্য সবকিছুর কথা ভুলে গিয়ে বারবার শুধু আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করতে লাগলো।

রাতে মক্কার বাইরে যাত্রা বিরতির পর পরদিন আবরাহা তার বাহিনি নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হলো। মক্কার কাছে আসতেই তার বিশাল হাতিগুলো আর সামনে এগোতে চাইলোনা। তার নিজের হাতিটি মাটিতে বসে পড়লো। অনেক ঠেলেও সেটিকে মক্কার দিকে হাটানো গেলোনা। অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলে হাতিটি দৌড়ানো শুরু করতো অথচ মক্কার দিকে ঘুরালেই সেটি মাটিতে বসে পড়তে লাগলো! আবরাহা রাগে হাতিটিকে মারতে শুরু করলেন। এমন সময় আকাশে ঝাকে ঝাকে উড়ে এলো আবাবিল পাখি। ছেয়ে গেলো পুরো আকাশ। পাখিগুলোর মুখে ও পায়ে ছিলো ছোট ছোট পাথরের কনা। সেগুলো তারা আবরাহার বাহিনীর উপর ফেলতে লাগলো। পাথরের আঘাতে আবরাহা ও তার বাহিনীর শরীরের মাংস খসে খসে পড়তে লাগলো আর শুরু হলো চুলকানি। চুলকাতে চুলকাতে তারা শরীরের মাংস উঠিয়ে ফেললো। আবরাহার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। গুরুতর আহত আবরাহাকে তার কয়েকজন লোক উদ্ধার করে দেশে ফিরে গেলো। সেখানে কয়েকদিন পর আবরাহা মারা যায়।

আল্লাহর ঘর ধংস করতে চেয়ে আবরাহা নিজেই ধংস হয়ে গেলো। এত বিশাল বাহিনি নিয়ে কাবঘর ধংস করতে গিয়ে কোন মানুষের বাধা ছাড়াই আবরাহার ৬০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনি এত কাছে গিয়েও পরাজিত হয়ে এলো।

মাদিয়ান জাতির উপর আল্লাহর গজব –

আল্লাহর নবী হযরত শোয়াইব আ. এর জাতির নাম ছিলো মাদিয়ান জাতি। লুত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম ছিলো মাদিয়ান । সেখানেই মাদিয়ান জাতি বসতি গড়েছিলো। হযরত মুসা আ. এর শশুড় মাদিয়ান ইবনে ইবরাহিম আ. এই শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন বলে জানা যায়। পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর মোআনের অদূরে এখনো শহরটির অস্তিত্ব বিদ্যমান।

মদিয়ান জাতির উপর আল্লাহর গজব অবতীর্ন হয়েছিলো মূলত অর্থনৈতিক অনাচারের জন্য। মাদিয়ান জাতির পরিনতি থেকে বুঝা যায় আল্লাহর বিধান শুধু নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের ভিতর সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক সততাও আল্লাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ন।

মাদিয়ান জাতির প্রধান অপকর্ম ছিলো ওজনে কম দেয়া, পন্যে ভেজাল দেয়া ইত্যাদি। তাদেরকে আল্লাহ প্রচুর সমৃদ্ধি দান করার পরও তারা সৎ পথে ব্যবসা করতোনা। মানুষকে ঠকাতো। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হেদায়াতের পথে ডাকার জন্য হযরত শোয়াইব আ. কে ঐ জাতির মাঝে প্রেয়ন করেন।

মদিয়ান জাতি সম্পর্কে কোরআন শরীফে বলা হয়েছে, “মাদিয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শোয়াইবকে আমি পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর ওজন ও পরিমাপে কম দিয়ো না। আমি তো দেখছি তোমরা সমৃদ্ধিশালী (এর পরও তোমরা ওজনে কম দিলে), আমি তোমাদের জন্য এক সর্বগ্রাসী দিনের আজাবের আশঙ্কা করছি।’’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৪)।

তবে হযরত শোয়াইব আ. বারবার বুঝানোর পরও এবং সাবধান করার পরও এরা তাদের অন্যায় কাজ চলিয়ে যেতে থাকে। ফলে একসময় আল্লাহ তাদের উপর গজব নাজিল করেন। তাদের সমগ্র অঞ্চল জুরে নেমে আসে প্রচন্ড তাপদাহ। তাপমাত্রা প্রচুর বেড়ে যায়। প্রচন্ড গরমে টিকতে না পেরে এরা বসতি ছেড়ে জংগলে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই মারা যায়। সমৃদ্ধশালী একটি জাতি অল্প সময়ের ভিতরেই বিলুপ্ত হয়ে যায়!

আল্লাহর গজব কেন আসে?

পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন পাপী ব্যক্তি বা জাতির ওপর ভয়ংকর গজব অবতীর্ন হয়। যুগে যুগে বহু ব্যাক্তি ও জাতির উপর আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। কখনো ছোট ছোট শাস্তি দিয়ে ভয় দেখানো হয়ছে বা শাস্তি দেয়া হয়েছে। সুযোগ দেয়া হয়েছে ভালো পথে ফিরে আসার আবার কখনো কখনো গজব এতটাই ভয়াবহ ছিলো যে সম্পূর্ন নিশ্চিন্হ হয়ে গেছে সমগ্র জাতি।

কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন’। (সূরা : শূরা, আয়াত : ৩০)

আরও ধর্ম সম্পর্কিত নিবন্ধ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

উপরের ঘটনাগুলি দেখলেই বোঝা যায় যে, কোন ব্যাক্তি বা জাতি যখন সীমা লংঘন করেছে তখন তাদের উপর আল্লাহর গজব অবতীর্ন হয়েছে। আল্লাহ সীমা লংঘন কারীদের পছন্দ করেননা। বর্তমানেও সারা পৃথীবিতে সীমা লংঘনকারী মানুষের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন ছোট খাটো শাস্তির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সতর্ক করে থাকেন। আমরা যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ি জীবন পরিচালনা করি তবেই আমরা আল্লাহর গজব থেকে বেচে থাকতে পারবো। লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সবার কাছে তুলে ধরার অনুরোধ রইলো । সবার জন্য শুভ কামনা রইলো। আল্লাহ হাফেজ..

ট্যাগ গুলো

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।