নিবন্ধ

ইরাবতী ডলফিন

ইরাবতী ডলফিন

ইরাবতী ডলফিন (Orcaella brevirostris) হচ্ছে মহাসাগরীয় ডলফিনের একটি ইউরিহ্যালাইন  অর্থাৎ লবণ সহ্য করতে পারে এমন প্রজাতি। সমুদ্র তীর এবং বঙ্গোপসাগরের সাথে বিভিন্ন নদীর সংযোগস্থলে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখা যায়।

বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের তফসিল-১ অণুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

যদিও একে কখনো কখনো নদীর ডলফিন বলা হয়, তবে এটি নদীর ডলফিন নয়, ইরাবতী ডলফিন মহাসাগরের ডলফিন। সমুদ্র উপকূলের কাছাঁকাছি, নদীর সাথে সংযোগস্থলে স্বাদু ও নোনা পানির মিশ্রণ আছে এমন এলাকায় এরা বাস করে। স্বাদু পানির নদীতে এদের ছোট ছোট সংখ্যায় দেখা যায়, উদাহরণস্বরূপ গঙ্গা নদী এবং মেকং নদী আর ইরাবতী নদী (যা থেকে এর নাম হয়েছে ইরাবতী ডলফিন)। এদের বিস্তৃতি বঙ্গোপসাগর থেকে নিউ গিনি এমনকি ফিলিপাইন পর্যন্ত, যদিও এরা তীর থেকে বেশি দূরে যায় না।

বর্নিও দ্বীপ, মালয়েশিয়ার সাবাহ-এর সান্দাকান থেকে ব্রুনেই এবং সারাওয়াক পর্যন্ত এদের দেখা পাওয়া যায়।

এদের বর্তমান সংখ্যা জানার জন্য ব্যাপক ভিত্তিতে কোন পরিসংখ্যান করা হয়নি। তবে বর্তমানে পৃথিবীতে এদের সংখ্যা আনুমানিক ৭০০০ এর অধিক যার ৯০ শতাংশই বাংলাদেশে বসবাস করে। বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরের জনসংখ্যাকে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৮ টি দেশে ইরাবতী ডলফিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ।

পেশাদার জেলেদের মাছ ধরতে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে ইরাবতী ডলফিন মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। ভারতীয় জেলেরা “লাহাই ক্বায়( lahai kway)” নামক একটি কাঠ নির্মিত চাবি তাদের নৌকার একটি ধারে আঘাত করে ইরাবতী ডলফিনদেরকে জেলেদের জালের দিকে মাছ তাড়িয়ে নিয়ে আসার সংকেত দেয়। মায়ানমারে আয়েয়াওয়াদী নদীর উপরিভাগে জেলেরা একটি বিশেষ শব্দ করে ইরাবতী ডলফিনদের ডাক দেয় এবং ডলফিনগুলো জেলেদের গোলাকৃতি জালে মাছ তাড়িয়ে পাঠায়। জেলেদের জালে যে অপ্রয়োজনীয় মাছ ধরা পরে সেগুলো ইরাবতী ডলফিনদের কাজের পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয়।

ইরাবতী ডলফিন এর ঝুঁকি:

অন্যান্য ডলফিনের তুলনায় ইরাবতী ডলফিনের সাথে মানুষের সংঘর্ষের সম্ভাবনা বেশি কারণ অন্য ডলফিনগুলো মহাসাগরের আরও গভীরে থাকে অথচ ইরাবতী উপকূলীয় এলাকায় থাকে । গিলনেট নামক একটি লম্বালম্বি বিস্তৃত বিশাল জালে আটকে মারা যাওয়াই এই ডলফিনের প্রধান ঝুঁকি। বেশিরভাগ ডলফিন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে গিলনেট এবং টানাজালে এবং ফিলিপাইনে জলাশয়ের তলদেশে রাখা কাঁকড়া ধরার জালের কারণে। মায়ানমারে বৈদ্যুতিক জাল, স্বর্ণ উত্তোলন এবং বাঁধ নির্মাণও ভয়ংকর এবং বেড়ে চলা ঝুঁকি। যদিও অধিকাংশ জেলে ডলফিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল তবে জেলেদের পক্ষে তাদের প্রথাগত জীবিকা অর্জনের পদ্ধতি ত্যাগ করা কষ্টসাধ্য।

এশিয়ার বেশকিছু দেশে ইরাবতী ডলফিনকে ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাবলিক অ্যাকুয়ারিয়ামে প্রদর্শন করা হয়। এদের অভিনব উপস্থিতি এবং অসাধারণ আচরণ, পানি ছিটানো, ডুব দেয়া এবং লেজ ঝাপটানোর দৃশ্য ডলফিনারিয়ামের অণুষ্ঠানে এদের জনপ্রিয় করে তোলে। ডলফিনদের এই বাণিজ্যিকিকরণের চিন্তা-ভাবনা ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত কারণ ব্যয়বহুল মেরিন অ্যাকুয়ারিয়ামের পরিবর্তে বিশুদ্ধ পানির ট্যাঙ্কেই এই ডলফিন বেঁচে থাকতে পারে। এই ডলফিনের আশেপাশের অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়েছে, ডলফিন প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে। ২০০২ সালে, এশিয়ার কমপক্ষে নয়টি দেশে ৮০টি ডলফিনারিয়াম ছিল।

একসময় ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে ব্লাস্ট ফিশিং অর্থাৎ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাছ ধরার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রায়ই ডলফিনের মৃত্যু হত। অতীতে, এদের সরাসরি ঝুঁকি ছিল তেল সংগ্রহের জন্য এদের মেরে ফেলা।

আইইউসিএন এই প্রজাতির সাতটি অঞ্চলের জনসংখ্যার পাঁচটিকে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার প্রাথমিক কারণ মাছের জালে আটকে মারা যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, মালাম্পায়ায় ১৯৮৬ সালে যখন প্রথম এদের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় তখন এদের সংখ্যা ছিল ৭৭, কিন্তু মানব সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে এদের ২০০৭ সালে এদের সংখ্যা দাড়ায় ৪৭ এ। বর্নিওর মাহাকাম নদীতে ৭৩% ডলফিনের মৃত্যুর কারণ গিলনেটে ফেঁসে মারা যাওয়া। এলাকাটিতে ব্যাপকভাবে মাছ ধরা ও নৌকা চলাচলের কারণে এমনটি হয়েছে।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সরকার এদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে ।

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।