নিবন্ধ

ওয়ালটন গ্রুপ এর সফলতা- সামান্য থেকে সেরা হওয়ার গল্প

ওয়ালটন এর লোগো

ওয়ালটন নামটা চেনেননা বাংলাদেশে এমন লোক খুজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে এখন ওয়ালটনের নাম। এটি এখন দেশের অন্যতম সেরা একটি ব্রান্ড। দেশের অর্থনীতিতে তাদের বিরাট প্রভাব। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ করদাতাদের মধ্যে ওয়ালটন অন্যতম। তবে শুরুটা ছিলো ভিন্ন রকম। এত সম্পদ, এত ক্ষমতা, এত প্রভাবের লেশমাত্র ছিলোনা এক সময়। চেষ্টা আর যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তারা নীচতলা থেকে সবচেয়ে উপরের তলায় উঠে এসেছে। কিভাবে শুরু হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান, কার হাত ধরে তার পথচলা, কিভাবে গড়ে তোলা হলো এই বিশাল সাম্রাজ্য- ইত্যাদি বিষয় নিয়ে FANCIM.COM এর পাঠকদের জন্য আমাদের আজকের এই লেখা। এখানে আমরা আপনাদের জন্য ওয়ালটনগ্রুপ সম্পর্কে সংক্ষেপে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরবো। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

ওয়ালটন সম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্য:

ওয়ালটন একটি বাংলাদেশী কোম্পানি। এর প্রধান অফিস ঢাকায় অবস্থিত এবং এর প্রধান কারখানা গাজীপুরে অবস্থিত। তবে আরো বেশকিছু জায়গায় তাদের ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। সব মিলিয়ে তাদের কারখানার আয়তন ৫০হাজার বর্গমিটারেরও বেশি! সারা দেশজুরে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকশ শোরুম রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ হাজারেরও অধিক কর্মি বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন! তাদের প্রধান ব্যবসা হলো মটর্স, হোম এপ্লায়েন্স এবং ইলেকট্রনিক্স পন্য।
ড্রিম পার্ক ইন্টারন্যাশনাল, ডিজিটেক এবং মার্সেল হলো ওয়ালটনের ৩টি অংগপ্রতিষ্ঠান।

ওয়েবসাইট- www.waltonbd.com

ওয়ালটন শুরুর ইতিহাস:

ওয়ালটন কোম্পানি ২০০৬ সালের পর থেকে সারা দেশে পরিচিতি লাভ করলেও এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো আরো বহু আগে। ১৯৭৭ সালে R.B গ্রুপ নামে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। মূলত এর প্রতিষ্ঠাতা এস এম নজরুল ইসলাম এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন। তখন তিনি তার বড় ছেলে নুরুল ইসলাম রেজভির নাম অনুসারে এর নাম দিয়েছিলেন R.B গ্রুপ (রেজভী এন্ড ব্রাদার্স গ্রুপ)। পরবর্তীতে সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ওয়ালটন গ্রুপে রুপান্তরিত করা হয়। তার মৃত্যুর পর বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যরা এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে। তবে সরাসরি ওয়ালটনের পথচলা শুরু হয় ২০০২ সাল থেকে।

এস এম নজরুল ইসলাম:

ওয়ালটন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এস এম নজরুল ইসলাম রেজভী। তিনি ১৯২৪ সালের ৭মে টাংগাইল জেলায় জন্মগ্রহন করেন। বাবার হাত ধরে তিনি ব্যবসায়িক জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তিতে তিনি সারের ব্যবসা, ঠিকাদারি ব্যবসা এবং টিনের ব্যবসা করেছেন।

তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন জীবনে বড় কিছু করার। তবে অসৎ পথ এড়িয়ে চলতেন। তার ব্যবসার গ্রাহকদের সবসময় খুশি রাখতে চেষ্টা করতেন। চেষ্টা করতেন টাকা সন্চয় করার। খোজ রাখতেন ব্যবসা বানিজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।

ব্যাক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবিলাসী, কর্মঠ, বুদ্ধিমান, সৎ ও ধার্মিক মানুষ। বড় মাপের ব্যবসায়ি হয়ে ওঠার আগে থেকেই তিনি বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কাজে সহায়তা করতেন। পরবর্তীতি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের দুইটি শীর্ষস্থানিয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান- ওয়ালটন গ্রুপ, মার্সেল গ্রুপ।

২০১৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর তারিখে তিনি মৃত্যুবরন করেন।

ওয়ালটন এর এগিয়ে চলা:

আগেই বলেছি ওয়ালটনের প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন একজন যোগ্য ব্যবসায়ি। সবসময় চাইতেন জীবনে বড় কিছু করতে। বড় কিছুর জন্য চাই বড় পুঁজি। আর জানতেন যে হুট করে চাইলেই বড় কিছু করে ফেলা সম্ভব নয়। তাই ব্যবসায়িক জীবনের শুরু থেকেই টাকা সন্চয় করতেন এবং সুযোগ পেলে নতুন নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন। এভাবেই চলতে লাগলো।

একসময় খেয়াল করলেন দেশে মটর সাইকেল, টিভি, ফ্রিজ সহ বিভিন্ন ইলেকটনিক্স পন্যের আকাশছোয়া চাহিদা রয়েছে কিন্তু পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বহু কষ্ট করে আয় করা বৈদেশিক মুদ্রাগুলো এর পেছনে খরচ হয়ে যায়। দেখলেন এই খাতে ব্যবসার একটা বিরাট সুযোগ দেশে ফাঁকা পরে আছে। এই ব্যবসায় সফল হতে পারলে নিজের এবং দেশের লাভ হবে। তখন থেকেই পরিকল্পনা করতে লাগলেন। দেখলেন এই ধরনের উচ্চ প্রযুক্তির পন্য তৈরি করা সহজ কথা নয়। কিভাবে এসব তৈরি করতে হয়, উৎপাদন পক্রিয়া কি হবে, কাচাঁমাল কিভাবে সংগ্রহ করা হবে, বিপনন কৌশল কি হবে, কর্মিদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা কিভাবে করা হবে, কিভাবে মান নিয়ন্ত্রন করা হবে, কিভাবে বড় বড় কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে, কিভাবে সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিবেন, বাজেট তৈরি করা, এমন হাজারো বিষয় খোজ খবর নিলেন, জানলেন, বুঝলেন। দেশে বিদেশে বিভিন্ন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ চালিয়ে গেলেন, খুটিনাটি সকল তথ্য জোগার করলেন।

কারখানা স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জমি খোজা শুরু করলেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি খুজলেন। সবদিক বিবেচনা করে একসময় গাজীপুরের চন্দ্রায় কারখানা তৈরির জন্য জমি খুজে পেলেন।

সেখানে শুরু হলো কারখানা তৈরির কাজ। একে একে সেখানে দুইটি কারখানা তৈরি করা হলো। একটি ওয়ালটন হাই টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আর অপরটি ওয়ালটন মাইক্রো টেক কর্পোরেশন।

ওয়ালটন হাই টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এর কারখানায় তৈরি করা হয় মটর সাইকেল, ফ্রিজ, এসির মতো উচ্চ প্রযুক্তির পন্য। প্রতিটি পন্য তৈরির জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা শাখা। আর ওয়ালটন মাইক্রো টেক কর্পোরেশনে তৈরি করা হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ি বাতি, পাখা, ব্লেন্ডার, রাইস কুকার ঘড়ি সহ বিভিন্ন পন্য।

পন্যগুলো যেন ঠিকমতো তৈরি করা হয় এবং গ্রাহকরা সেগুলো ব্যবহার করে যেন সন্তুষ্ট হয় সেজন্য মান নিয়ন্ত্রন করতে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। পন্যের মান যাচাই করার জন্য তারা নিয়োগ করেছে বহুসংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মি। তাদের কাজ হলো কোন পন্যে সমস্যা হলে সেটি বাছাই করা এবং সঠিকভাবে তৈরি করা।

সারাদেশে বিভিন্ন শোরুম এবং ডিলারদের মাধ্যমে তারা তাদের পন্য প্রদর্শন ও বিক্রি করে থাকে। প্রতিমাসে ওয়ালটন কয়েক লক্ষ ফ্রিজ, টিভি ও মোটর সাইকেল বিক্রি করে থাকে।

শুরুতে বিদেশ থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনলেও ২০১৮ সাল থেকে তারা দেশেই নিজস্ব কারখানায় বিভিন্ন বাটন ফিচার ফোন, টাচস্ক্রীন এন্ড্রয়েড ফোন তৈরি করছে এবং এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ল্যাপটপও তৈরি করছে।

দেশের পাশাপাশি ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ আফ্রিকা মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তাদের পন্য রপ্তানি করছে।

ওয়ালটন পন্য :

ওয়ালটন পন্য

ওয়ালটন গ্রুপ তাদের তৈরি বিভিন্ন পন্য সাধারনত ওয়ালটন নামেই বিক্রি করে থাকে। তাদের রয়েছে হরেক রকমের পন্য। এখানে আমরা আপনাদের জন্য তাদের প্রধান কিছু পন্য তুলে ধরছি-

  • মোটর সাইকেল
  • রেফ্রিজারেটর
  • ফ্রিজ
  • টিভি
  • এসি
  • মোবাইল
  • ল্যাপটপ
  • জেনারেটর
  • মাইক্রোওয়েব ওভেন
  • স্টিমওয়েব ওভেন
  • ওয়াটার পাম্প
  • লাইট
  • পাখা
  • ইস্ত্রি
  • ঘড়ি
  • ব্লেন্ডার
  • হেয়ার ড্রাইয়ার
  • ডিভিডি প্লেয়ার
  • ব্যাটারী
  • রাইস কুকার ইত্যাদি।

ব্যবসায় সম্পর্কিত বিভিন্ন নিবন্ধ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরিশেষে বলতে চাই, সবাই আগে থেকে তৈরি করা পথে হেটে গন্তব্যে পৌছায় । তবে কেউ কেউ আছে যারা গন্তব্যে পৌছানোর জন্য নিজেরাই পথ তৈরি করে নেয়। ওয়ালটন গ্রুপ তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক জগতে তারা একটি বিস্ময়। হাজারো উদ্যোক্তার অনুপ্রেয়নার উৎস। বাংলাদেশে সম্পূর্ন নতুন ধরনের একটি ব্যবসায় নেমে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে টেক্কা দিয়ে তারা আজ বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে, জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনেও।

শত শত কোটি টাকার মালিক অনেকেই আছে, বড় বড় ব্যবসায়িও অনেক আছে কিন্তু বাংলাদেশে ওয়ালটন যে সেক্টরগুলোতে ব্যবসা করছে সেই সেক্টরগুলোতে ব্যবসা করার সাহস কেউ দেখায়নি। এসব সেক্টরে সম্পূর্ন বাজারটাই ছিলো বড় বড় বিদেশি কোম্পানির দখলে। ওয়ালটন গ্রুপ ঐসব বিদেশি কোম্পানিগুলোর তুলনায় সম্পূর্ন অনভিজ্ঞ হয়েও এবং কম পুজি নিয়েও আত্ববিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও যোগ্যতার বলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এ যেন ঠিক- “এলাম, দেখলাম, জয় করলাম” এর মতই। আমি তাদের ধারাবাহিক সাফল্য কামনা করছি। এগিয়ে যাক ওয়ালটন গ্রুপ ।

ট্যাগ গুলো
error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।