নিবন্ধ

ডাইনোসরের পরিচয়

ডাইনোসরের পরিচয়

ডাইনোসরের পরিচয় –

ডাইনোসর বলতে আমরা একটি বিলুপ্ত, সাধারণত বৃহদাকার মেরুদণ্ডী প্রাণীগোষ্ঠীকে বোঝায়। এরা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের প্রাগৈতিহাসিক অধিবাসী এবং বৈজ্ঞানিকদের অনুমান এই প্রভাবশালী প্রাণীরা প্রায় ১৬ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। প্রথম ডাইনোসরের বিবর্তন হয়েছিল আনুমানিক ২৩ কোটি বছর পূর্বে। ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর পূর্বে একটি বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডাইনোসরদের প্রভাবকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। তাদের একটি শ্রেণীই কেবল বর্তমান যুগ পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে বলে ধারণা করা হয়: শ্রেণীবিন্যাসবিদরা ধারণা করেন আধুনিক পাখিরা থেরোপড ডাইনোসরদের সরাসরি বংশধর জীবাশ্ম দ্বারা প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে জুরাসিক যুগে সংঘটিত এই বিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায় ।

শ্রেণীবিন্যাসগত, অঙ্গসংস্থানগত ও পরিবেশগত দিক থেকে ডাইনোসর কথাটিকে বিভিন্ন প্রকারের কতকগুলি প্রাণীর একটি সাধারণ নাম হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে পুরাজীববিদরা উড়তে অক্ষম ডাইনোসরদের ৫০০ এরও বেশি গণ ও ১০০০ এরও বেশি প্রজাতিকে শনাক্ত করেছেন। সব কয়টি মহাদেশেই ডাইনোসরদের জীবন্ত ও প্রস্তরীভূত নানা প্রজাতির দেখা পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে শাকাহারী ও মাংসাশী- উভয় প্রকার উদাহরণই রয়েছে। যদিও উৎপত্তিগতভাবে ডাইনোসরেরা দ্বিপদ, কিন্তু অবলুপ্ত অনেক চতুষ্পদ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, এবং কোনো কোনো প্রজাতি গমনের সময় প্রয়োজনমত দুই পা অথবা চার পা ব্যবহার করতে পারত। সমস্ত বিভাগের ডাইনোসরদের মধ্যেই শিং, হাড় ও চামড়ার পাত প্রভৃতি প্রদর্শনমূলক অঙ্গসংস্থানের নিদর্শন রয়েছে, এবং কোনো কোনো অবলুপ্ত প্রজাতির কঙ্কালে হাড়ের বর্ম ও কাঁটার মত গঠন লক্ষ্য করা যায়। বিভাগ নির্বিশেষে ডাইনোসরদের অন্যতম সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল ডিম পাড়া ও বাসা বানানোর অভ্যাস। ওড়ার খাতিরে কিছু শারীরবৃত্তীয় বাধ্যবাধকতার জন্য আধুনিক পাখিরা আকারে ছোট হলেও প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরদের অনেকেই ছিল বিশালদেহী। বৃহত্তম সরোপড ডাইনোসরেরা ৫৮ মিটার (১৯০ ফুট) পর্যন্ত দীর্ঘ এবং ৯.২৫ মিটার (৩০ ফুট ৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত উঁচু হত । তবুও উড়তে অক্ষম ডাইনোসর মাত্রই বিশালাকার হবে- এই ধারণাটা ভুল। আবিষ্কৃত জীবাশ্মের বেশির ভাগই বড় মাপের ডাইনোসর- এ’কথা ঠিক। কিন্তু এর কারণ হল জীবাশ্মের আকার বড় হলে তা প্রকৃতির প্রতিকূলতা সহ্য করে প্রস্তরীভবন পর্যন্ত সহজে টিকে থাকতে পারে। আসলে অনেক ডাইনোসরই ছিল খুদে; যেমন, জিজিয়ানিকাস (Xixianykus) নামক ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার (প্রায় ২০ ইঞ্চি)।

যদিও ‘ডাইনোসর’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ ভয়ানক গিরগিটি, কিন্তু ডাইনোসরেরা প্রকৃতপক্ষে গিরগিটি বা টিকটিকি নয়। বরং তারা সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তর্গত একটা আলাদা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যাদের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ অনেকাংশে বর্তমান সরীসৃপদের থেকে পৃথক; যেমন, তারা ছিল উষ্ণশোণিত এবং দ্বিপদ গমনে সক্ষম। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অর্থাৎ পাখিদের ডাইনোসর বলে চিহ্নিত করার আগে পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকরা ডাইনোসরদের অলস এবং অনুষ্ণশোণিত বলে মনে করতেন। ১৯৭০ এর দশক এবং তৎপরবর্তী অধিকাংশ গবেষণা থেকে অবশ্য জানা গেছে যে সমস্ত ডাইনোসর ছিল উচ্চ বিপাক হার যুক্ত, অতিমাত্রায় সক্রিয় প্রাণী এবং তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগের জন্য বিভিন্নভাবে অভিযোজিত হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ডাইনোসরের প্রথম জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। এরপর থেকে পর্বতগাত্র বা শিলায় আটকা পড়ে থাকা ডাইনোসরের কঙ্কাল পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ডাইনোসরেরা বর্তমান বিশ্ব সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। প্রধানত কোনো কোনো অবলুপ্ত ডাইনোসর প্রজাতির বিশাল আয়তন এবং তাদের সম্ভাব্য হিংস্র স্বভাবের দরুন তারা শিশু ও বয়স্ক সবার কাছেই বিশেষ আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সর্বাধিক বিক্রিত বই এবং জুরাসিক পার্ক ইত্যাদি প্রচুর কাটতি পাওয়া চলচ্চিত্রে ডাইনোসর প্রসঙ্গ এসেছে এবং এ সংক্রান্ত নতুন যে কোনো আবিষ্কার গণমাধ্যমে বিশেষভাবে সম্প্রচার করা হচ্ছে।

১৮৪২ খ্রীষ্টাব্দে পুরাজীববিদ স্যার রিচার্ড ওয়েন, ডাইনোসরিয়া ট্যাক্সনটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করেন। তৎকালীন ইংল্যান্ড এবং অবশিষ্ট পৃথিবীর নানা অঞ্চল থেকে সরিয়ান (Saurian) গোষ্ঠীর সরীসৃপদের যে “বিশিষ্ট শাখা অথবা উপবিভাগের” সদস্যদের অবশেষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল, তাদের নির্দিষ্ট করতেই এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। গ্রিক ভাষার δεινός (দেইনস, অর্থাৎ “ভয়ংকর”, “পরাক্রান্ত” অথবা “আশঙ্কা উদ্রেককারী ও মহান”) এবং σαῦρος (সাউরোস, অর্থাৎ “টিকটিকি” অথবা “সরীসৃপ”)- এই দু’টি শব্দ জুড়ে ডাইনোসর কথাটি তৈরী হয়েছে। যদিও নামটা ডাইনোসরদের দাঁত, নখ ও অন্যান্য ভয়াবহ বৈশিষ্ট্যের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, কিন্তু ওয়েন এই নামকরণ করেছিলেন প্রধানত প্রাণীগুলোর আয়তনের কথা মাথায় রেখে ।

জাতিজনি শ্রেণীবিন্যাসের অধীনে সাধারণত ট্রাইসেরাটপস, নিঅর্নিথিস (আধুনিক পাখি), এদের সাম্প্রতিকতম সাধারণ পূর্বপুরুষ(সা.সা.পূ./Most Recent Common Ancestor/MRCA) ও তাদের সমস্ত বংশধরকে ডাইনোসর বলা হয় । অন্য একটি মত অনুযায়ী মেগালোসরাস এবং ইগুয়ানোডন এর সা.সা.পূ. থেকে ডাইনোসরদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত, কারণ রিচার্ড ওয়েন যখন ডাইনোসরিয়া-র শনাক্তকরণ করেছিলেন তখন এই দু’টি ছিল তাঁর দ্বারা নির্দিষ্ট তিনটি গণের অন্যতম। দু’টি পদ্ধতিই একই জীবসমষ্টিকে ডাইনোসর হিসেবে চিহ্নিত করে: ডাইনোসরিয়া= অর্নিথিস্কিয়া+সরিস্কিয়া; যাদের অন্তর্গত হল থেরোপড (প্রধানত দ্বিপদ মাংসাশী এবং পাখি), অ্যাঙ্কিলোসর (বর্মযুক্ত শাকাহারী চতুষ্পদ), স্টেগোসর (পাতযুক্ত শাকাহারী চতুষ্পদ), সেরাটপ্‌সিয়া (শিং ও শিরস্ত্রাণযুক্ত শাকাহারী চতুষ্পদ), অর্নিথোপড (হাঁসের মত চঞ্চুবিশিষ্ট শাকাহারী দ্বিপদ বা চতুষ্পদ) এবং সরোপডোমর্ফ (প্রধানত লম্বা গলা ও লেজযুক্ত বৃহৎ শাকাহারী চতুষ্পদ)।

বর্তমানে পাখিদেরকে থেরোপড ডাইনোসরদের একমাত্র জীবিত বংশধররূপে গণ্য করা হয়। গতানুগতিক শ্রেণীবিন্যাসবিদ্যায় পাখিদের ডাইনোসর থেকে বিবর্তিত একটা আলাদা শ্রেণী বলে মনে করা হত। অবশ্য ডাইনোসর নিয়ে আগ্রহী সাম্প্রতিক জীববৈজ্ঞানিকদের অধিকাংশই গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তে জাতিজনি নামকরণের পক্ষ সমর্থন করেন। এই পদ্ধতি অনুযায়ী কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ বিভাগের সমস্ত উত্তরপুরুষ ঐ বিভাগের সদস্য হিসেবে গণ্য হয়। পাখিরা তাই ডাইনোসর,আর সেই সূত্রেই ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত নয়, জীবিত। পাখিদের ম্যানির‍্যাপ্টোরা অধঃবিভাগের অন্তর্গত মনে করা হয়; ম্যানির‍্যাপ্টোরা বর্গটি সিলুরোসরাসদের অন্তর্গত; সিলুরোসরাসরা এক প্রকার থেরোপড, থেরোপডরা এক প্রকার সরিস্কিয়ান এবং সরিস্কিয়ানরা এক প্রকার ডাইনোসর । কিন্তু সাধারণের বক্তব্য ধর্তব্যের মধ্যে আনলে ডাইনোসরের মধ্যে পাখিদেরকে বাদ দিতে হয়। স্পষ্টতার খাতিরে এই নিবন্ধে, “ডাইনোসর” শব্দটি বলতে “উড়তে অক্ষম ডাইনোসর”-দের বোঝানো হবে এবং “পাখি” শব্দটি “উড়তে সক্ষম ডাইনোসর”-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। উড়তে সক্ষম ডাইনোসর বলতে আর্কিওপ্টেরিক্স পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত এবং আধুনিক পাখিদের সবাইকেই বোঝানো হবে। গুরুত্ব দিয়ে কোন বিষয় উল্লেখ করতে হলে “উড়তে অক্ষম ডাইনোসর” শব্দটিই ব্যবহৃত হবে।

ডাইনোসরের সাধারণ বর্ণনা:

উপরে প্রদত্ত একটি সংজ্ঞা ব্যবহার করে বলা যায়, দেহের সম্পূর্ণ ভার বহনক্ষম উপাঙ্গ যুক্ত আর্কোসরেরা হল ডাইনোসর । ডাইনোসর নামটি জনপ্রিয় ধারণায় অন্যান্য কিছু প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপকে বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিমেট্রোডন নামক পেলিকোসর, পাখাবিশিষ্ট টেরোসর, জলচর প্লেসিওসর এবং মোসাসর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোনটিই ডাইনোসর ছিল না এবং এদের কারোরই প্রকৃত ডাইনোসরদের মত সম্পূর্ণ দেহভার বহনকারী উপাঙ্গ ছিল না । ডাইনোসরেরা ছিল মেসোজোয়িক মহাযুগের, বিশেষত জুরাসিক ও ক্রিটেশিয়াস কালপর্বের প্রধান স্থলচর মেরুদণ্ডী। অন্যান্য ধরণের প্রাণীদের প্রভাব আয়তন ও বাস্তুতন্ত্রগত ধাপের নিরিখে ছিল খুব সীমিত। যেমন, সমসাময়িক স্তন্যপায়ীরা প্রায় কখনোই আয়তনে আধুনিক বিড়ালের থেকে বড় হত না; তাদের বেশির ভাগই ছিল ইঁদুর জাতীয় ক্ষুদ্র পতঙ্গভুক জীব ।

ডাইনোসরেরা বরাবরই বিচিত্র এবং বহু-বিভাজিত একটি প্রাণীগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০০৬ খ্রীষ্টাব্দের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী উড়তে অক্ষম ডাইনোসরদের ৫০০ এরও বেশি গণ এখনও অবধি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা গেছে, এবং আন্দাজ করা হয় যে সারা পৃথিবীতে সঞ্চিত মোট ডাইনোসর জীবাশ্মের মধ্যে প্রায় ১৮৫০ টির কাছাকাছি সংখ্যক আলাদা আলাদা গণ রয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ আজও আবিষ্কার করা যায়নি । এতদপেক্ষা কিঞ্চিৎ পুরোনো একটি গবেষণায় ডাইনোসরদের গণের সংখ্যা ৩৪০০ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেকগুলিই সম্ভবত জীবাশ্মে পরিণত হতে পারে নি । ২০০৮ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৪৭ টি ভিন্ন ভিন্ন ডাইনোসর প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে । এদের মধ্যে কেউ কেউ শাকাহারী এবং কেউ কেউ মাংসাশী। ডাইনোসরদের বিভিন্ন প্রকার খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে গাছের বীজ,মাছ, পতঙ্গ ইত্যাদি নানা উপাদানের সমাবেশ ছিল; এমনকি সর্বভুক ডাইনোসরের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। যদিও ডাইনোসরেরা (এবং সেইসূত্রে পাখিরা) উৎপত্তিগতভাবে দ্বিপদ, কোনো কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রজাতি চতুষ্পদও ছিল। এছাড়া অ্যামোসরাস এবং ইগুয়ানোডনের মত কিছু প্রজাতি ইচ্ছামত গমনের সময় চার পা বা দুই পা ব্যবহার করতে পারত। জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে জানা যায়, আদি জুরাসিক যুগেই ডাইনোসরেরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল । আধুনিক পাখিদের আবাসস্থল বহুবৈচিত্র্যপূর্ণ; তারা স্থল ও সামুদ্রিক- উভয় পরিবেশেই স্বচ্ছন্দ থাকতে পারে। এছাড়া মাইকোর‍্যাপ্টর এর মত কিছু কিছু উড়তে অক্ষম ডাইনোসরের বাতাসে ভর করে সাময়িকভাবে ভাসমান থাকার ক্ষমতা এবং স্পিনোসরিড দের আংশিক জলচর স্বভাবের পক্ষেও প্রমাণ আছে ।

ডাইনোসরের শারীরস্থানিক বৈশিষ্ট্য :

যদিও সাম্প্রতিক গবেষণাসমূহের পর ডাইনোসরদের শারীরস্থানিক বৈশিষ্ট্যের কোনো সর্বজনসম্মত তালিকা প্রকাশ করা দুরূহ হয়ে উঠেছে, তবুও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত অধিকাংশ ডাইনোসর হয় আদিম আর্কোসরীয় কঙ্কালের কিছু গঠনগত বৈশিষ্ট্য দেখায়, নয়তো ঐ সমস্ত বৈশিষ্ট্যযুক্ত কোনো পূর্বপুরুষ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে বলে বোঝা যায়। বিবর্তনের ধারায় অপেক্ষাকৃত পরের দিকে আসা কিছু প্রজাতির দেহে এই বৈশিষ্ট্যগুলি বেশি মাত্রায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি ডাইনোসরিয়ার সাধারণ চরিত্রগত বলে মনে করা হয়; প্রাচীনতম ডাইনোসরেরা এ’গুলি তাদের বংশধরদের দেহে সঞ্চারিত করে গেছে। এই ধরণের বৈশিষ্ট্য-সমষ্টিগুলি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীবিন্যাসগত বিভাগের সাম্প্রতিকতম সাধারণ পূর্বপুরুষের দেহে উৎপন্ন হয় এবং এগুলিকে ঐ নির্দিষ্ট বিভাগের সাইন্যাপোমর্ফি (synapomorphies) বলে ।
আর্কোসরদের আন্তঃসম্পর্ক সম্বন্ধে এস নেসবিট এর পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা নিম্নলিখিত বারোটি সাইন্যাপোমর্ফি নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করেছে। কোনো কোনোটা আগে থেকেই জানা ছিল ।

মাথার খুলির ছাদের পিছন দিকের দু’টি প্রধান গহ্বরের (সুপ্রাটেম্পোরাল ফেনেস্ত্রা/Supra-temporal Fenestra) সামনে একটি করে অবতল খাঁজ বা ফসা থাকে।ঘাড়ের প্রথম দু’টি কশেরুকা অ্যাটলাস এবং অ্যাক্সিস-এর সামনের দিকে এপিপোফাইসিস নামক উপবৃদ্ধি দেখা যায়।ডেল্টো-পেক্টোরাল পেশিসমূহের সংযোগস্থল অগ্রপদের প্রথম হাড় প্রগণ্ডাস্থির ৩০% বা তার বেশি দৈর্ঘ্যে অবস্থিত।অগ্রপদের রেডিয়াস হাড়ের দৈর্ঘ্য হিউমেরাস বা প্রগণ্ডাস্থির ৮০% এর কম।উরুর হাড়ের পিছন দিকে কডোফিমোরালিস পেশির সংযোগস্থলে অবস্থিত উপবৃদ্ধিটি (চতুর্থ ট্রোক্যান্টার) অতি স্পষ্ট এবং কানা-উঁচু চামচের আকৃতিবিশিষ্ট (ছবি দেখুন)।চতুর্থ ট্রোক্যান্টার আকারে অসমান; এর এক দিকের কানা অন্য দিক অপেক্ষা বেশি উঁচু থাকে। গোড়ালির অস্থিসমূহের সাথে পায়ের অনুজঙ্ঘাস্থি হাড়ের প্রথম সংযোগস্থলটি ঐ হাড়গুলির ৩০% এর কম স্থান অধিকার করে থাকে।খুলির পিছন দিকে অবস্থিত বহিঃঅক্সিপিটাল হাড় দু’টি মস্তিষ্ক-গহ্বরের মেঝের মাঝ বরাবর পরস্পরের সাথে মিলিত হয় না।শ্রোণীচক্রের ইস্কিয়াম হাড়টির ভিতর দিকে অবস্থিত একটি বৃহৎ অবতল খাঁজ ইলিয়াম ও পিউবিস হাড়ের থেকে এটিকে পৃথক রাখে।জঙ্ঘাস্থি বা টিবিয়ার সামনে উপর দিকে পেশির সংযোগের জন্য যে উপবৃদ্ধি (নেমিয়াল ক্রেস্ট) থাকে, সেটি বাইরের দিকে বাঁকানো হয়।জঙ্ঘাস্থির নীচের অংশে পিছন দিকে একটি উল্লম্ব পাতের আকারের উপবৃদ্ধি থাকে।অনুজঙ্ঘাস্থি বা ফিবুলার যে তলটি ক্যালকেনিয়াস হাড় অর্থাৎ গোড়ালি অঞ্চলের প্রথম হাড়ের সাথে যুক্ত থাকে, সেটি অবতল।

নেসবিট আরও কতকগুলি সম্ভাব্য সাইন্যাপোমর্ফি খুঁজে পেয়েছিলেন, এবং পূর্বে উল্লিখিত কতকগুলি সাইন্যাপোমর্ফি তাঁর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলেন। তাঁর তালিকার কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য সিলেসরিডদের মধ্যেও দেখা যায়, যাদেরকে তিনি ডাইনোসরদের জ্ঞাতি হিসেবে পুনঃচিহ্নিত করেন। ডাইনোসর ও সিলেসরিডদের সাধারণ সাইন্যাপোমর্ফির মধ্যে ছিল সম্মুখবর্তী বৃহৎ ট্রোক্যান্টার, দ্বিতীয় ও চতুর্থ মেটাটার্সাল অস্থির অসমান দৈর্ঘ্য, ইস্কিয়াম এবং পিউবিসের সীমিত সংযোগস্থল, টিবিয়ায় নেমিয়াল ক্রেস্টের উপস্থিতি, ট্যালাস হাড়ে একটি ঊর্দ্ধমুখী উপবৃদ্ধি এবং আরও অনেক ।
ডাইনোসরেরা অধিকাংশ আধুনিক স্তন্যপায়ীর মতো খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারত, কারণ তাদের শ্রোণীচক্র গঠনগতভাবে অন্যান্য স্থলচর সরীসৃপদের (যারা হামাগুড়ি দিয়ে চলে) থেকে আলাদা ছিল এর কারণ হিসেবে শ্রোণীচক্রের একটি আনুভূমিক উপবৃদ্ধি এবং ঊর্বস্থি বা ফিমারের অভ্যন্তরমুখী মস্তকের বিবর্তনকে দায়ী করা যায় । সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা প্রথম ডাইনোসরদের শ্বাসকার্যের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধে দিয়েছিল, যার ফলে তাদের পরিশ্রম করার ক্ষমতা সাধারণ ‘ছেতরে থাকা’ পা-ওয়ালা সরীসৃপদের চেয়ে অনেকটা বৃদ্ধি পায় । ছেতরে থাকা পায়ের উপর যে অতিরিক্ত চাপ পড়ে সেটা এড়াতে পারার ফলে সোজা হয়ে থাকা পা সম্ভবত দেহের বিশাল আয়তনেরও অনুকূল হয়েছিল । রাউইসুচিয়া সমেত কোনো কোনো অ-ডাইনোসর আর্কোসরও সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আয়ত্ত করেছিল, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয়েছিল শ্রোণীচক্রের ঋজু-স্তম্ভাকার গঠনের ফলে, যেখানে ঊর্বস্থির গোলাকার মস্তক শ্রোণীর গর্তের মধ্যে সংযুক্ত থাকার পরিবর্তে শ্রোণীচক্রের উপরের হাড়টি প্রলম্বিত হয়ে ঊর্বস্থি দু’টিকে খাড়া রাখত ।

পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক অবলুপ্তি ঘটনায় পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৯৫% ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কমবেশি ২ কোটি বছর পর মধ্য থেকে অন্ত্য ট্রায়াসিকে ডাইনোসরেরা তাদের আর্কোসর পূর্বপুরুষদের থেকে পৃথক হয়ে যায়। তেজস্ক্রিয়মিতিক তারিখ গণনার মাধ্যমে ২৩ কোটি ১৪ লক্ষ বছর আগেকার পাথরের স্তরে প্রাথমিক ডাইনোসর গণ ইওর‍্যাপ্টরের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। পুরাজীববিদরা ধারণা করেন ইওর‍্যাপ্টর সমস্ত ডাইনোসরের সাধারণ পূর্বপুরুষের নিকট জ্ঞাতি । এই ধারণা সত্যি হলে বলা যেতে পারে যে প্রথম ডাইনোসরেরা ছিল আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিপদ মাংসাশী প্রাণী । আর্জেন্টিনার মধ্য ট্রায়াসিক পাথরের স্তর থেকে মারাসুকাস এবং ল্যাগারপেটন নামক আদিম, ডাইনোসর-সদৃশ অর্নিথোডিরানদের আবিষ্কার এই ধারণার ভিত্তি দৃঢ় করে, কারণ এরাও ছিল ছোট, দ্বিপদ এবং মাংসভুক। নিয়াসাসরাসের জীবাশ্ম ইঙ্গিত করে ডাইনোসরেরা হয়তো ২৪ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগেই বিবর্তিত হয়েছিল, যদিও জীবাশ্মটির খুব অল্প অংশ উদ্ধার করা গেছে বলে এরা সত্যিই ডাইনোসর ছিল নাকি ডাইনোসরদের কোনো নিকটাত্মীয় সরীসৃপ ছিল তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না ।

ডাইনোসরদের আবির্ভাবের সময় উল্লেখযোগ্য স্থলচর জীবগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল নানা জাতের আর্কোসরোমর্ফ এবং থেরাপসিড সরীসৃপ, যথা এইটোসর, কাইনোডন্ট, অর্নিথোসুকিডি, রাউইসুকিয়া এবং রিঙ্কোসর। পর পর দু’টো অবলুপ্তি ঘটনায় এই গোষ্ঠীগুলোর বেশিরভাগই লুপ্ত হয়ে যায়। প্রথমত ২১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে প্রোটোরোসর সমেত বহু প্রজাতির আর্কোসরোমর্ফের বিলুপ্তি ঘটে। এর পর ট্রায়াসিক-জুরাসিক অবলুপ্তি ঘটনায় (২০ কোটি বছর আগে) এইটোসর, অর্নিথোসুকিডি, ফাইটোসর প্রভৃতি আর্কোসর এবং রাউইসুকিয়ানরা অবলুপ্ত হয়। রিঙ্কোসর এবং ডিকাইনোডন্টরা অন্ত্য ট্রায়াসিকের শেষভাগ অবধি টিকে ছিল এবং এদের অবলুপ্তির সঠিক সময় সম্বন্ধে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই সমস্ত অবলুপ্তি ঘটনার ফলে ডাঙার প্রাণী হিসেবে অবশিষ্ট রইল ক্রোকোডাইলোমর্ফ, ডাইনোসর, স্তন্যপায়ী, টেরোসর এবং কচ্ছপেরা । ডাইনোসরেদের প্রথম গোষ্ঠীগুলো ট্রায়াসিকের কার্নিয়ান ও নরিয়ানপর্যায়ে নানা শাখায় ভাগ হয়ে গিয়ে ক্রমশ অবলুপ্ত প্রজাতিগুলোর জায়গা দখল করে ।

 

বিবর্তন ও পুরাজীব ভূগোল :

ট্রায়াসিক যুগের পর থেকে ডাইনোসরদের বিবর্তন স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও মহাদেশসমূহের প্রকৃতি ও অবস্থান পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে হয়েছিল। অন্ত্য ট্রায়াসিক ও আদি জুরাসিকে সমস্ত মহাদেশ একত্রে প্যাঞ্জিয়া নামক একটা অখণ্ড অতিমহাদেশ গঠন করে ছিল, আর পৃথিবীব্যাপী ডাইনোসরেরা প্রধানত সিলোফাইসিড জাতীয় মাংসাশী এবং আদি সরোপডোমর্ফ জাতীয় শাকাহারী এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল । ডাইনোসরদের সম্ভাব্য খাদ্য কনিফারপ্রধান ব্যক্তবীজী উদ্ভিদগোষ্ঠী অন্ত্য ট্রায়াসিকে নানা প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যায়। প্রাথমিক সরোপডোমর্ফদের চোয়াল তথা মুখবিবরের গঠন তাদের খাবার থেঁতলে হজমের উপযোগী করে তোলার উপযুক্ত ছিল না। তাই ধারণা করা হয় তারা খাদ্যনালীর পরবর্তী কোনো অংশে এই কাজগুলো সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেছিল । ডাইনোসরদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্যহীনতা মধ্য থেকে অন্ত্য জুরাসিক পর্যন্ত বজায় ছিল এবং এই গোটা সময় জুড়ে ভূখণ্ডের যে কোনো অঞ্চলে মাংসাশী বলতে ছিল সেরাটোসরিয়া, স্পিনোসরিড ও কার্নোসররা আর শাকাহারীদের মধ্যে ছিল স্টেগোসর জাতীয় অর্নিথিস্কিয়ান ও বৃহদায়তন সরোপডরা। উত্তর আমেরিকার মরিসন প্রস্তরক্ষেত্র এবং তাঞ্জানিয়ার তেন্দাগুরু থেকে এই জীববন্টনের প্রমাণ মেলে। চীনের ডাইনোসররা একটু আলাদা ছিল; সিনর‍্যাপ্টর প্রভৃতি থেরোপড এবং মামেঞ্চিয়াসরাস ইত্যাদি বিশেষ প্রকার সরোপডরা এখানকার বাসিন্দা ছিল । অ্যাঙ্কিলোসর এবং অর্নিথোপডরা সংখ্যায় বাড়ছিল, কিন্তু প্রোসরোপডরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পাইন তথা কনিফার এবং ফার্ন ছিল প্রধান উদ্ভিদ। আগেকার প্রোসরোপডদের মত সরোপডরাও গিলে ফেলা ছাড়া মুখের মধ্যে খাবারের কোনো রকম পাচন-সহায়ক কাজ করত না, কিন্তু অর্নিথিস্কিয়ানরা এই ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল; খাবার অনেকক্ষণ ধরে মুখের মধ্যে নিয়ে চিবানোর সুবিধার জন্য তাদের মধ্যে কারো কারো মুখে গাল সদৃশ অঙ্গেরও আবির্ভাব ঘটেছিল, আর চিবানোর কাজ আরও নিখুঁত করার জন্য দেখা দিয়েছিল নমনীয় চোয়াল । জুরাসিক যুগে বিবর্তনের আর একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ম্যানির‍্যাপ্টোরা জাতীয় সিলুরোসরিডদের থেকে প্রথম পাখিদের আবির্ভাব ।

আদি ক্রিটেশিয়াস নাগাদ প্যাঞ্জিয়া অতিমহাদেশ ভেঙে গিয়ে তার বিভিন্ন টুকরোগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বাসস্থানের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ডাইনোসরেরা নানা শাখায় ভাগ হয়ে যায়। এই সময়ে অ্যাঙ্কিলোসর, ইগুয়ানোডন্টিয়া এবং ব্র্যাকিওসরিডরা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে বিচরণ করত। পরবর্তীকালে এদের জায়গা নেয় স্পিনোসরিড ও কার্কারোডন্টোসরিড জাতীয় থেরোপড এবং রেবাচিসরিড ও টাইটানোসর জাতীয় সরোপড; শেষোক্ত সরোপডদের জীবাশ্ম দক্ষিণ আমেরিকাতেও পাওয়া গেছে  এশিয়ায় ড্রোমিওসরিড, ট্রুডন্টিড ও ওভির‍্যাপ্টরোসরিয়ারা ছিল প্রধান থেরোপড এবং শাকাহারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যাঙ্কিলোসর ও সিটাকোসরাস প্রভৃতি প্রাথমিক সেরাটোপ্‌সিয়ান। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রাধান্য ছিল প্রাথমিক অ্যাঙ্কিলোসর, হিপসিলোফোডন্টিড এবং ইগুয়ানোডন্টিয়াদের । ধারণা করা হয় আদি ক্রিটেশিয়াসের শেষভাগে স্টেগোসরিয়া জাতীয় ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। আদি ক্রিটেশিয়াসের আরও একটা প্রধান ঘটনা হল সপুষ্পক উদ্ভিদের বিবর্তন, যারা অন্ত্য ক্রিটেশিয়াসে খুব তাড়াতাড়ি নানা প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যায়। এর সাথে তাল মিলিয়ে শাকাহারী ডাইনোসরেরা গাছপালা চিবিয়ে হজম করার আলাদা আলাদা কায়দা রপ্ত করছিল। সেরাটোপ্‌সিয়ানরা একটার উপর একটা দাঁত একসাথে জুড়ে গিয়ে তৈরি যৌগিক দাঁতের মাধ্যমে খাবার টুকরো করতে পারত আর ইগুয়ানোডন্টরা তাদের অন্য রকম যৌগিক দাঁত ব্যবহার করত খাবার থেঁতো করার কাজে; এই শেষোক্ত পদ্ধতির চূড়ান্ত উন্নতি দেখা যায় হ্যাড্রোসরিডদের জীবাশ্মে । নাইজারসরাস এর মত কোনো কোনো সরোপডেরও যৌগিক দাঁত ছিল ।

সামগ্রিকভাবে বলা যায় অন্ত্য ক্রিটেশিয়াসে তিনটি স্বতন্ত্র পরিবেশে ডাইনোসরদের বাস ছিল। উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায় প্রধান থেরোপড বলতে ছিল টির‍্যানোসরিড এবং অন্যান্য ম্যানির‍্যাপ্টোরান প্রজাতি আর শাকাহারী বলতে ছিল প্রধানত নানা প্রকার অর্নিথিস্কিয়ান যথা হ্যাড্রোসরিড, সেরাটোপ্‌সিয়ান, অ্যাঙ্কিলোসর এবং প্যাকেসেফালোসরিয়ানরা। ভেঙে যাওয়া গন্ডোয়ানা থেকে সৃষ্ট দক্ষিণের মহাদেশগুলোয় অ্যাবেলিসরিডরা ছিল প্রধান থেরোপড আর টাইটানোসর জাতীয় সরোপডরা ছিল প্রধান শাকাহারী। তৃতীয়ত ইউরোপে ড্রোমিওসরিডরা ছিল প্রধান থেরোপড, আর র‍্যাবোডন্টিড জাতীয় ইগুয়ানোডন, নোডোসরিড জাতীয় অ্যাঙ্কিলোসর এবং টাইটানোসরীয় সরোপডদের প্রাধান্য ছিল । সপুষ্পক উদ্ভিদদের অনেক প্রজাতির আবির্ভাব হয়েছিল, এদেরই অন্যতম শাখা হিসেবে ঘাসের বিবর্তন হয় ক্রিটেশিয়াসের একেবারে অন্তিম লগ্নে। উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া জুড়ে সেরাটোপ্‌সিয়ান ও হ্যাড্রোসরিডদের অজস্র প্রজাতির বিবর্তন হচ্ছিল। এমনকি থেরোপডেরা পর্যন্ত থেরিজিনোসর ও অর্নিথোমিমোসরিয়া প্রভৃতি শাকাহারী বা সর্বভুক প্রজাতির জন্ম দেয় ।

৬.৬ কোটি বছর আগে সংঘটিত ক্রিটেশিয়াস-প্যালিওজিন বিলুপ্তি ঘটনায় নিঅর্নিথিন পাখি ছাড়া সমস্ত ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়। সরীসৃপদের মধ্যে অন্য কোনো কোনো ডায়াপসিড বিভাগ যেমন কুমির, সেবেকোসুকিয়া, কচ্ছপ, গিরগিটি, সাপ, স্ফেনোডন্ট এবং করিস্টোডেরারা ঐ ঘটনার পরেও টিকে থাকতে সমর্থ হয়েছিল ।

আধুনিক দৌড়বাজ পাখি, হাঁস-মুরগি এবং নানা প্রকার জলের পাখিরা প্যালিওজিন যুগে দ্রুত বিভাজিত হয়ে পরিবেশে ডাইনোসরদের ছেড়ে যাওয়া স্থান দখল করে নেয়। এদের কয়েকটি প্রথম শাখা হল গেছো এনান্টিঅর্নিথিন, জলের হেস্পারর্নিথিন, এবং বিরাট আয়তনের গ্যাস্টর্নিস, মিহিরুং ও “ভয়াল পাখি” প্রভৃতি উড়তে অক্ষম স্থলচর পাখি। অবশ্য স্তন্যপায়ীরাও খুব তাড়াতাড়ি বিভাজিত হচ্ছিল আর তারাই ক্রমশ শুকনো ডাঙায় পাখিদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে ।

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।