নিবন্ধ

ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতে মসজিদকে ব্যবহার !

ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিতে মসজিদকে ব্যবহার
আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মান্ধ নয়, ধর্মপ্রাণ, ধার্মিক, সংস্কৃতিমনা। বহু যুগ ধরে এদেশে সব ধর্ম, সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেছে । তাই এদেশে উগ্রতার সংস্কৃতি কখনোই মানুষ মেনে নিবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে সুন্দর স্বপ্ন দেখতে, ভালো কিছু চিন্তা করতে সবার ভালো লাগে । কিন্তু তারা বোঝেন না যে, সময় অনেক পাল্টেছে। যেখানে সারা দিনরাত মানুষকে উগ্রতা শেখানো হচ্ছে, সেখানে কিভাবে মানুষ ভদ্র শিশুর মতোন জীবন যাপন করবে একথা ভাবা বোকামি । একসময় পরিস্থিতি ভালো ছিলো বলে যে সবসময়ই ভালো থাকবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই । আজ থেকে বিশ বছর আগে যা ছিল না তা এখন পুরোদমে চলছে। বর্তমানে পৃথীবির অন্তত ১০০টি ফ্রন্টে একসাথে যুদ্ধ চলছে, যার প্রায় সবগুলোরই পেছনে আছে ধর্ম ও ধান্ধাবাজির রাজনীতিকে ব্যবহার করে আধিপত্যবাদ। সামান্য অনুসন্ধান করলেই সবাই বুঝতে পারবেন । আমাদের এখানে বিগত বেশ কয়েক দশক থেকে মানুষের ধর্মানুভূতিকে বার বার হাইজ্যাক করে হিংস্রতার চর্চা করা হচ্ছে।
মসজিদে তো প্রতিদিন ৫ বার নামাজের জন্য ডাকা হয় । কিন্তু নামাজের জন্য ডাকা হলে কয়জন দৌড়িয়ে নামাজ পড়তে ছুটে যায় ? নামাজের জন্য ডাকলে আমাদের মনে কোন প্রভাব পড়েনা । কিন্তু মসজিদে যদি ঘোষনা দেয়া হয়, “পাশের গ্রামের হিন্দু পাড়ায় কোরআন শরীফ পুড়িয়েছে”, তখন যারা জুম্মার নামাজও পড়তে যায়না তারাও জিহাদ করতে দৌড়িয়ে যাবে আর তান্ডব চালাবে !!!
অথচ ঘটনাটি একটি গুজব হতে পারে !
কারন ঘটনাটি সবাই শুনেছে, কিন্তু কোন প্রমান পায়নি ।
মসজিদের মাইকে নামাজের আহ্বান শুনে কতজন মুসল্লী মসজিদে উপস্থিত হন? কিন্তু আমাদের দেশে যখনই মসজিদের এই মাইক ব্যবহার করে ধর্ম অবমাননার ভুয়া ঘোষণা দেওয়া হয় তখনই হাজার হাজার কথিত “ধর্মপ্রাণ, শান্তিপ্রিয়, ধার্মিক” তওহীদী জনতা ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোটা, রাম দা, কিরিচ নিয়ে হজির হয়ে যায়। তারপর যা করে তাকে পাশবিকতা বলব না, কারণ এদের বন্যতা, হিংস্রতা দেখে যে কোনো পশুও লজ্জিত হবে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে আল্লাহর নির্দেশে যখন ডাকা হয় তখন সেটা গুরুত্ব দেয়া হয়না অথচ অজানা অচেনা মানুষের কথা যাচাই না করেই “জিহাদ” করতে ঝাপিয়ে পড়ি আমরা !
আমি রাজনীতিবিদ ও সুশীলদের বলছি, আপনারা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন না। ধর্মের অনুভূতি যখন নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর হাতে জমা রেখেছেন তখন মনে রাখবেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র কোনো সিরিয়াল কিলারের হাতে বন্ধক রেখেছেন। তারা এই অস্ত্র যখন যেভাবে খুশি ব্যবহার করবে । তাতে আপনার কিছুই করার থাকবে না। তাদের মাথায় ও বিভিন্ন স্থানে হাত বুলিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। কারন তারা সব সময় আপনাদের কথা মেনে চলবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই । বাচাঁর একটাই উপায়, মানুষকে ধর্মের প্রকৃত রূপটি শিক্ষা দিন। মানুষের ধর্ম যে মনুষ্যত্ব তা শিক্ষা দিন, সমাজে শান্তি রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস করাটাও যে এবাদত এটা সবাইকে জানিয়ে দিন। মানুষের ক্ষতি হয় এমন যেকোন কাজই গোনাহের কাজ আর কল্যাণ হয় এমন সব কাজই সওয়াবের কাজ।
তাদেরকে বলুন, যার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত তার নামাজ রোজা কবুল হয় না। তাকে বলুন, ধর্মব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে তোমাদেরকে ঈমানকে ব্যবহার করছে। ঈমান তোমার সম্পদ, তাকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাও- মানবতার অসম্মান করার জন্য লাগিও না, দেশ ধ্বংসের জন্য লাগিও না। তাদেরকে এটাও জানিয়ে দিন যে, মসজিদ নির্মাণ যেমন সওয়াবের কাজ তেমনি মানুষ চলাচলের জন্য রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট নির্মাণ করাও সওয়াবের কাজ । এটাও একটা এবাদত। মুসলিম জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে এজন্য যে তারা ন্যায় কাজের আদেশ দিবে ও অন্যায় কাজে বাধা দিবে। তাদেরকে শেখাতে হবে, গুজবে কান দেওয়া, হুজুগে মাতাল হওয়া, কোনো সংবাদ সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই কারো বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অত্যাচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। এটা কোনো মো’মেনের কাজ না।কেউ অন্যায় কিছু লিখলে বা বললে তার প্রতিবিধান করার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে, সাংগঠনিক পর্যায়ে একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তি তর্ক দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করা যায় কিন্তু আইন হাতে তুলে নিয়ে তা কার্যকর করতে হলে অবশ্যই আগে কর্তৃপক্ষের আসনে তোমাকে বসতে হবে । এই কথাগুলো বলার দায়িত্ব ছিল যাদের তারা বলবেন না, কারণ তাদের কায়েমী স্বার্থ নষ্ট হবে। এই কথাগুলো তাই সবাইকে বলতে হবে। শতকণ্ঠে বলতে হবে। কেউ যদি বলে তোমার দাড়ি কোথায়? লেবাস কোথায় ? তাকে বলুন, চিন্তা করবেন না। আজ রাখি নি, কাল রাখতেও তো পারি। আগে আসুন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই, ঐক্যবদ্ধ হওয়া ফরজ। আগে ফরজ কাজটি করি। ধর্মের নামে অনাচার আর অধর্ম চালু রাখলে আল্লাহ তালার এবং ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা হয়। আগে একে প্রতিহত করি।

 

কলামিস্ট: রিয়াদুল হাসান এর লেখা অবলম্বনে ।

ট্যাগ গুলো
error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।