নিবন্ধ

নানকিং গনহত্যা : ভদ্র জাপানিদের ভয়ংকর রুপ!

নানকিং গনহত্যার সময় এভাবেই বেয়নেটে গেথে এক শিশুকে হত্যা করে তার লাশ সবাইকে দেখাচ্ছে এক জাপানি সৈন্য!
নানকিং গনহত্যার সময় এভাবেই বেয়নেটে গেথে এক শিশুকে হত্যা করে তার লাশ সবাইকে দেখাচ্ছে এক জাপানি সৈন্য!

পৃথীবির ইতিহাসে যতগুলো ভয়ংকর গনহত্যা সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে নানকিং গনহত্যা অন্যতম। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপানি বাহিনী চীনের তখনকার রাজধানী নানকিং শহরে অভিযান চালিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত করে সেটিই ইতিহাসে নানকিং গনহত্যা নামে পরিচিত।

বর্তমানে জাপানি জাতিকে আমরা যতটা ভদ্র, সভ্য ও নিরিহ মানুষ হিসেবে দেখি একসময় এই জাপানিরাই ছিলো ঠিক তার বিপরীত। শক্তি প্রদর্শন, অহংকার ও হিংস্রতায় তারা ছিলো সামনের সারিতে।

নানকিং গনহত্যার প্রাথমিক বর্ননা-

১৯৩৭ সালে মার্কো পোলো সেতু নিয়ে চীন জাপানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। জাপানি বাহিনী চীনে আক্রমন চালিয়ে বসে। প্রচন্ড লাড়াইয়ের পর জাপানি সৈন্যরা চীনের গুরুত্বপূর্ন শহর সাংহাই দখল করে নেয়। এরপর জাপানি বাহিনী আরো বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। তারা চীনের তৎকালীন রাজধানী নানকিং দখলের জন্য অগ্রসর হয় এবং শহরটি অবরোধ করে ফেলে। জাপানি বাহিনীর সামনে টিকতে না পেরে একসময় চীনা বাহিনী তাদের রাজধানী থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার জাপানি সৈন্য চীনের রাজধানী নানকিং শহরটি দখল করে নেয়।

এরপরই জাপানি বাহিনী শুরু করে অকল্পনীয় বর্বরতা। পথে তারা বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়, লুটপাট চালায় এবং যাকে ইচ্ছা তাকেই হত্যা করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সহ সবাইকে গনহারে হত্যা করা শুরু করে। মাত্র এক মাস থেকে সোয়া এক মাসের ভিতরে জাপানি বাহিনী প্রায় ৩ লাখ মানুষকে হত্যা করে এবং ধর্ষন করে অন্তত ২০ হাজার নারীকে (অনেকটাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গনহত্যার মতো)।

জাপানি সৈন্যরা ভয়ংকর, নিষ্ঠুর ও বিভৎস পদ্ধতিতে চীনের নাগরিকদের হত্যা করতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা গুলি করে হত্যা করার বদলে বেশি কষ্ট দিয়ে মারার জন্য বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে, তরবারি দিয়ে কুপিয়ে বা জবাই করে মানুষজনকে হত্যা করতে থাকে। এমন বেশ কিছু ঘটনা জানা যায় যেখানে জাপানি সৈন্যরা মাত্র দুই বছরের শিশুকেও বোয়েনেট দিয়ে খুচিয়ে বা মাথা কেটে হত্যা করে।

নানকিং গনহত্যার সময় এভাবেই বেয়নেটে গেথে এক শিশুকে হত্যা করে তার লাশ সবাইকে দেখাচ্ছে এক জাপানি সৈন্য!
নানকিং গনহত্যার সময় এভাবেই বেয়নেটে গেথে এক শিশুকে হত্যা করে তার লাশ সবাইকে দেখাচ্ছে এক জাপানি সৈন্য!

এমনকি জাপানি সৈন্যরা তখন কে কত বেশি মানুষ মারতে পারে এমন প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। একবার দুইজন জাপানি সৈন্য ১ টি তরবারি দিয়ে কে আগে ১০০ মানুষ মাথা কেটে মারতে পারে এমন বাজিও ধরেছিলো! নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এদের একজন ১০৬ এবং অন্যজন ১০৫ ব্যাক্তিকে হত্যা করে!
বিষয়টি তখন জাপানের পত্রিকাতেও প্রচার হয়।

নানকিং গনহত্যার সময় জাপানি সৈন্যরা একজন চীনা নাগরিককে শরীর থেকে মস্তক দিখন্ডিত করে হত্যা করার আগ মূহর্তের ছবি

নানকিং গনহত্যার দায়ভার কাদের?

মূলত জাপানের সম্রাট হিরোহিত ও যুবরাজ আসাকার ছত্রছায়ায় এই হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়। কিন্তু এই গনহত্যার সাথে জড়িত কারোই তেমন কোন বিচার করা সম্ভব হয়নি। ২য় বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পনের আগেই জাপান এই গনহত্যা সম্পর্কিত বেশিরভাগ দলিলপত্র ও প্রমান ধংস করে ফেলে। এছাড়া ২য় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসর্মপন চুক্তির শর্ত অনুযায়ি জাপানের রাজ পরিবার ও শীর্ষ ব্যাক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান ও কোন শাস্তি না দেয়ার ওয়াদা করা হয়। ফলে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই গনহত্যার সাথে জড়িত মূল রাঘব-বোয়ালদের কোন শাস্তি হয়নি।

নানকিং গনহত্যার কারন কি?

ঠিক কি কারনে জাপানি বাহিনি নানকিংয়ে এমন হিংস্র গনহত্যা চালিয়েছে তা সঠিক ভাবে বোঝা যায়না। পৃথিবীব বহু দেশেই যুদ্ধ হয় তবে সাধারনত যেসব কারনে গনহত্যা সংগঠিত হয় তেমন কোন কারন নানকিংয়ের বেলায় দেখা যায়না। ধারনা করা হয় আত্ব-অহমিকায় বিভোর অহংকারি জাপান তাদের রাগ ও ক্ষোভের বহি:প্রকাশ দেখাতেই এমন নির্মমতায় মেতে উঠেছিলো। জাপানিরা নিজেদেরকে সেরা মনে করতো আর চীন, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিন কোরিয়া সহ অন্যদের নীচু শ্রেনির মনে করতো। সাংহাই দখলের সময় তারা যতটা সহজে দখল করতে পারবে বলে ভেবেছিলো ততটা সহজে দখল করতে না পারায় এবং নিজেদের অনেক লোক ক্ষয় হওয়ায় তাদের সেই অহংকারে কিছুটা আঘাত লাগে। ফলে পরবর্রীতে তারা আরো হিংস্র হয়ে ওঠে বলে ধারনা করা হয়।

আপনি চাইলে আমাদের এই লেখাটিও পড়ে দেখতে পারেন: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি – ৩০ লাখ নিহত নাকি ৩ লাখ নিহত, কোনটি সত্য?

পৃথীবির ইতিহাসে যে কয়টি গনহত্যা সংঘঠিত হয়েছে তার মধ্যে নানকিং গনহত্যা অন্যতম। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানিরা দেশ ও জাতি গঠনে মন দেয়। ফলে এখন তারা একটি খুবই ভদ্র ও সভ্য জাতিতে পরিনত হলেও একসময় তারা কতটা হিংস্র ছিলো সেটি বোঝা যায় এই ঘটনার দিকে তাকালে।

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।