নিবন্ধ

প্রকৃত মুমিন বান্দা দুনিয়াবিমুখ হতে পারে না

মনের আশা পুরনের দোয়া , নামাজ ,

বর্তমানে পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাড়িয়েছে যে, অবস্থা দেখে প্রতিয়মান হয়- আল্লাহ এবং নবী-রাসুলগন যা করতে বলেছেন বা করেছেন তা ইসলাম নয় বরং মসজিদ, মাদ্রাসা বা ওয়াজ মাহফিলের হজু্ররা যা শিখাচ্ছেন বা করতে বলছেন সেটাই ইসলাম!
আর সাধারন জনগনের তো “অল টাইম দৌড়ের উপর” অবস্থা! কোন কিছু ভাবার বা বিশ্লেষন করার সময়ই তাদের নেই!
আর এই সু্যোগে বিকৃতি ও ভূল শিক্ষা ছড়িয়েছে অনেকদূর। মানুষের মস্তিস্কে ভূল শিক্ষাগুলোই শক্তভাবে বসে গেছে। ফলে এখন কেউ সঠিক কথা বললে তাকেই উল্টো ভূল মনে হয়।

আমরা বর্তমানের বিকৃত ইসলামের আলেম সাহেবদের কাছে শুনেছি যে দুনিয়া খুবই খারাপ জায়গা। তাই দুনিয়ার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে আখেরাতের অভিমুখী হতে হবে, চোখ কান বুজে এ দুনিয়ার জীবনকে কোনোমতে পার করে দিতে পারলেই মুক্তি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘দুনিয়া’ শব্দটি আল্লাহ ও তাঁর রসুল এ অর্থে ব্যবহার করেননি। বর্তমানে দীন বলতে বোঝানো হচ্ছে ইসলামের ব্যক্তিগত কিছু উপাসনাকে যেমন সালাহ (নামাজ), সওম (রোজা), হজ্জ, যিকির-আজগার ইত্যাদিকে আর দুনিয়া বলতে বোঝানো হচ্ছে এই উপাসনাগুলির বাইরে যাবতীয় কাজকে যেমন ব্যবসায়, চাষাবাদ, চাকরি, পড়াশুনা, সামাজিক ও দেশের উন্নয়নমূলক কাজ ইত্যাদি। বস্তুত ইসলামের অন্যান্য বিষয়গুলির মতই ‘দুনিয়া’ শব্দটিও আজ বিপরীত অর্থে ব্যবহার করা হয়। ইসলাম এসেছে সমস্ত দুনিয়াময় শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করতে এবং তাও সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে। যেখানে দুনিয়াতেই একটি জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সেখানে সেই দুনিয়াকেই ত্যাগ বা তার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়া কী করে অর্থবহ?

আল্লাহ কোর’আনে মো’মেনদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি তাদের পৃথিবীর জমিন ও ক্ষমতা দান করবেন, যেমন তিনি পূর্ববর্তী মো’মেনদেরও দান করেছিলেন (সুরা নূর-৫৫)। প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া বলতে বোঝানো হচ্ছে- আল্লাহ ও তাঁর রসুল এই জাতির, উম্মাহর জন্য যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথে এই পৃথিবীতে যা কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাই দুনিয়া। আল্লাহ দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করতে বলেন নি, তা বললে তিনি কখনই আমাদের বলতেন না এই দোয়া করতে যে- আমাদের পালনকারী! আমাদের এই দুনিয়াকে সুন্দর করে দাও এবং আখেরাতকেও সুন্দর করে দাও (সুরা আল-বাকারা-২০১)।

প্রকৃত মো’মেনের কাছে দুনিয়া শব্দের অর্থ ও আকীদা হলো এই যে, সে এই পার্থিব জীবনকে যতটুকু সম্ভব সুন্দর করতে চেষ্টা করবে। এই পৃথিবীতে সে যত কাজ করবে তা যত সম্ভব সুন্দর করে, নিখুঁত করে করতে চেষ্টা করবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, যার যে পেশা, বৃত্তি, দায়িত্ব সেগুলোতে সে তার পক্ষে যতদূর সম্ভব সুষ্ঠুভাবে সুন্দরভাবে করতে চেষ্টা করবে। এটা দুনিয়া নয় – দীনদারী। বরং কেউ যদি তার পেশায়, দায়িত্বে গাফলতি করে, তার কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না করে তবে সেটাই হবে দুনিয়াদারী, গোনাহ।

রসুলাল্লাহ বলেছেন- যখন এই দুনিয়ার কাজ করবে তখন এমনভাবে করবে যেন তুমি অমর, চিরঞ্জীব, আর যখন দীনের কাজ করবে তখন এমনভাবে করবে যেন তুমি পরের দিন মারা যাবে। যতক্ষণ একটা মানুষ অন্যকে না ঠকিয়ে, মিথ্যা না বলে সততার সাথে তার পেশা করে যাবে, উপার্জন করবে ততক্ষণ সে এবাদত করছে, দীনের কাজ করছে। আর যে মুহূর্তে সে কোন কাজে মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নেবে সেই মুহূর্তে সে দুনিয়ায় পতিত হবে।

একদিন ফজরের নামাযের পর মহানবী (সা.) মসজিদে বসা ছিলেন, এমন সময় দেখা গেল এক যুবক রাস্তা দিয়ে হন্ হন্ করে বাজারের দিকে যাচ্ছে। একজন সাহাবা (রা:) বললেন- যুবকটা দুনিয়ার কাজে যাচ্ছে, কত না ভাল হত যদি সে এখানে এসে বসতো। এ কথা শুনে রসুলাল্লাহ (সা.) প্রতিবাদ করে বললেন- যদি সে তার পরিবার পোষণের জন্য হালাল উপার্জনের জন্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাজারের দিকে যেয়ে থাকে তবে তার প্রতি পদক্ষেপে সওয়াব লেখা হচ্ছে।

লক্ষ্য করুন মহানবী (সা.) হালাল উপার্জন উল্লেখ করলেন। যদি সে ঐ ব্যবসা-বাণিজ্য বা যে কোন পেশায় মিথ্যার আশ্রয় নেয় তবে আর তা এবাদত রইল না, দুনিয়া হয়ে গেল। ঐ হালাল উপার্জন দিয়ে ভালভাবে থাকায়, ভালভাবে খাওয়া-পরায় ইসলামে বাধা নেই, কোন নিষেধ নেই। কিন্তু ঐ উপার্জন ঐ সম্পদ যদি তাকে আল্লাহর রাস্তায় কোন কাজ থেকে বিরত করে, দীনের কাজে ব্যয় করা থেকে বিরত করে তখন তা দুনিয়া। শুধু সম্পদ নয়, এই পৃথিবীর যা কিছু আল্লাহর রাস্তায় বাধা হবে তাই দুনিয়া। সেটা সম্পদ হোক, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন হোক, যাই হোক। ঐ দুনিয়াকে আল্লাহ রসুল (সা.) ত্যাগ করতে বলেছেন। শুধু যে ভালভাবে থাকা, ভাল খাওয়া-পরা তাই নয়, সাজ-সজ্জা, আড়ম্বর, জাঁক-জমক পর্যন্ত আল্লাহ মুসলিমদের নিষিদ্ধ করেন নাই। যিন্ত শব্দের অর্থ হল সাজ-সজ্জা, জাঁক-জমক, আড়ম্বর ইত্যাদি। আল্লাহ তার রসুলকে বলছেন- বলো, আল্লাহ তার উপাসকদের (মানব জাতি) জন্য যে সাজ-সজ্জা, জাঁক-জমক দান করেছেন, এবং যে হালাল ও পবিত্র সম্পদ (জীবিকা) দান করছেন, তা কে নিষিদ্ধ করল? (আরও) বলো- ঐগুলি (সাজ-সজ্জা, জাঁক-জমক, আড়ম্বর ইত্যাদি) এই পৃথিবীর জীবনের জন্য (সবার জন্য) এবং কেয়ামতের দিনে শুধু মো’মেনদের জন্য (সুরা আল-আ’রাফ-৩২)। আবার ঐ যিনাত সম্বন্ধেই অন্য সুরায় বলছেন- জেনে রাখ, এই পৃথিবীর জীবন আমোদণ্ডপ্রমোদ, জাঁক-জমক, দম্ভ ও সম্পদ, সন্তান বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কি (সুরা আল-হাদীদণ্ড২০)? আপাতদৃষ্টিতে দু’রকমের কথা মনে হয়। কিন্তু আসলে দু’রকমের নয়। আল্লাহ বৈরাগ্য নিষিদ্ধ করেছেন তাই পার্থিবভাবে উন্নত জীবন-যাপন, এমন কি আড়ম্বর, জাঁকজমকও নিষিদ্ধ করেননি। কিন্তু জেনে রাখতে হবে এবং সর্বদা মনে রাখতে হবে যে আসলে এগুলি মূল্যহীন, আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর রসুলের দীনের কাজে ওগুলি বিনা দ্বিধায় কোরবানী করতে হবে। প্রয়োজনের সময় যদি ওগুলি ত্যাগ, কোরবানী না করা যায় তবেই তা দুনিয়া হয়ে গেল।
আপাতদৃষ্টিতে এমনি পরস্পর বিরোধী কথা বলেছেন রসুলাল্লাহ (সা.)। বলেছেন- ‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই’, ইসলামের বৈরাগ্য-সন্ন্যাস হচ্ছে জেহাদ ও হজ্ব (হাদিস)। মুসলিম যখন জেহাদে যায় তখন অবশ্যই তার ঘর-বাড়ি, সম্পদ, স্ত্রী-পুত্র, পরিজন, সংসার ছেড়ে যায় অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করে। শুধু এই একমাত্র সন্ন্যাসই ইসলাম অনুমতি দেয়, শুধু অনুমতি নয় উৎসাহিত করে। অন্য যে সন্ন্যাসটি হাদীসে পাচ্ছি অর্থাৎ হজ্ব, ওটা এক সময়ে সন্ন্যাসই ছিল, কারণ তখনকার দিনে দূরদেশ থেকে হজ্বে গেলে বাড়ী ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না। বর্তমানে হজ্ব আর সে রকম পূর্ণভাবে সন্ন্যাসের পর্যায়ে পড়ে না। মুসলিম যখন জেহাদে যায় তখন সে আর ফিরে আসার আশা করে না, কারণ তার সামনে তখন লক্ষ্য হয় এই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার, সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান শাহাদাত। বিশ্বনবী (সা.) নিজ হাতে যে জাতি সৃষ্টি করেছিলেন, নিজে যাদের শিক্ষা-ট্রেনিং দিয়েছিলেন সেই সম্পূর্ণ জাতিটিই ঐ দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সন্ন্যাসীর জাতি হয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য ধর্মের ও বর্তমানের সুফিদের সন্ন্যাসের সঙ্গে ঐ উম্মাহর সন্ন্যাসের তফাৎ হল এই যে- এরা নিজেদের ব্যক্তিগত আত্মার উন্নতির জন্য বৈরাগ্য-সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, আর এই উম্মাহর সন্ন্যাসীরা সমস্ত মানব জাতির কল্যাণ ও শান্তির জন্য সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এরা সন্ন্যাস গ্রহণ করে তসবিহ, বদনা, জপমালা, কম-লু হাতে সংসার ত্যাগ করেন বা হুজরায় ঢুকেন আর উম্মতে মোহাম্মদী মানবতা ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করেন। আল্লাহ-রসুল (সা.) সন্ন্যাসকে নিষিদ্ধ করে দিলেন, অথচ দুটো ফরদ কাজ জেহাদ ও হজ্বকে সন্ন্যাস আখ্যা দিলেন। ঘোর পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে, তাই নয় কি? যিনিই এই দীনের মর্মবাণী বুঝবেন তার কাছেই আর বিরোধী মনে হবে না, তার কাছে সম্পুরক। আজ ‘মুসলিম’ জাতির কাছে ‘দুনিয়া’ শব্দের অর্থ আর অন্যান্য বিকৃত ধর্মগুলির সংসার শব্দের অর্থ একই অর্থ।

প্রকৃত মুসলিমের আকীদায় দুনিয়া হল শুধু তাই যা তাকে সমস্ত পৃথিবীতে এই দীন প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়- সেটা যাই হোক, সম্পদই হোক, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনই হোক, এমন কি নিজের প্রাণের মায়াই হোক। ঐ বাধা না হলে পৃথিবীর সব কিছু সে ভোগ করবে। আরও একভাবে প্রচলিত সন্ন্যাস ও ইসলামের সন্ন্যাসে প্রকট তফাৎ রয়েছে। প্রচলিত বৈরাগ্য স্বার্থপর; নিজের আত্মার উন্নতির জন্য। কাজেই সংসারের ঝামেলা ত্যাগ করলেও নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে রাজী নয়, কারণ প্রাণ গেলে তো আর উন্নতির প্রশ্ন থাকে না। আর ইসলামের বৈরাগ্য-সন্ন্যাস অন্যের জন্য, সমস্ত মানব জাতির জন্য, আল্লাহর জন্য এবং শুধু সংসার নয় নিজের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করে। কাজেই ঐ দুনিয়া ত্যাগ নিষিদ্ধ, পরকালে যার কোন পুরস্কার নেই, আর ইসলামের বৈরাগ্য ফরদ এবং পরকালে এমন পুরস্কার ও সম্মান রয়েছে যে তার কাছাকাছিও অন্য পুরস্কার নেই, অন্য সম্মান নেই।

ট্যাগ গুলো

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।