নিবন্ধ

সফল মানুষের ব্যর্থতার গল্প

ব্যর্থতার গল্প , দৈড় প্রতিযোগিতা , এগিয়ে থাকা , সফলতা , সফলতার গল্প,

ব্যর্থতার গল্প পরিনত হতে পারে সফলতার গল্পে, যদি সফলতা না পাওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়া না হয় । কাজ শুরু করার সাথে সাথেই কি সফলতা চলে আসে ? নিশ্চয় না। কাকতালীয় ভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা দ্রুত ধরা দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফলতাকে ধরতে হলে পিছু পিছু অনেক দুর যেতে হয় । জীবন যেমন পুষ্পশয্যা নয় তেমনি সফলতাও রাতারাতি ধরা দেয় না। সফলতাকে অর্জন করে নিতে হয়। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজের সঙ্গে লেগে থাকতে হয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে যারা সফল হয়েছেন তাদের সফলতার পেছনে রয়েছে ভাঙ্গা গড়ার বিরাট ইতিহাস। পৃথিবীর সফল ব্যক্তিদের আমরা সবাই চিনি কিন্তু আমরা কি জানি তাদের সফলতার পেছনের গল্পগুলো ? আজকে যারা সফল মানুষ, তাদের অনেকেই একসময় ছিলেন চরম ব্যর্থ ! কেমন ছিল তাদের শুরুটা ? এমন অনেক সফল ব্যক্তি আছেন, যাদের শুরুটাই ব্যর্থতা দিয়ে। তবে তারা ব্যর্থতাকে টপকিয়ে সফলতাকে জয় করেছেন। তাই তাদেরকে স্থান দেয়া হয়েছে ইতিহাসের পাতায় ।

আসুন জেনে নেই এমন কিছু সফল ব্যক্তির সফলতা ও ব্যর্থতার গল্প যারা ব্যর্থতাকে টপকিয়ে সফলতাকে জয় করেছেন।

আকিও মরিতা –

আকিও মরিতা

এই নামটি অনেকের কাছে অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে সনি কোম্পানির নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। আকিও মরিতা এই সনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। এই কোম্পানির প্রথম পণ্য ছিলো রাইস কুকার, যাতে ভাত রান্না করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল, সহজেই পুড়ে যেত। বর্তমানে এই কোম্পানির নামের উপরেই কোটি কোটি পন্য বিক্রি হয়ে যায় তবে তাদের প্রথম পন্যটি সব মিলিয়ে একশ পিসও বিক্রী হয়নি। ফলে বেশ লোকসানে পড়তে হয় তাকে । কিন্তু এতে মরিতা যে ভেঙে পড়েননি। আর সে কারণেই আজ তার কোম্পানি বিশ্বসেরা কোম্পানির একটি।

সইচিরো হোন্ডা –

সইচিরো হোন্ডা

ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে যারা সফলতার গল্প রচনা করছেন তাদের মধ্যে জাপান র উদ্যোক্তা সইচিরো হোন্ডা অন্যতম | জাপানি বিখ্যাত ব্যবসায়ি সইচিরো হোন্ডা। বিশ্বখ্যাত কোম্পানি হোন্ডার জনক তিনি। ছোটবেলা থেকেই কলকব্জা আর যন্ত্রপাতি নিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন তিনি । মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান তিনি । রাজধানী শহর টোকিওতে চলে আসেন কাজের সন্ধানে । সেখানে একটি গ্যারেজে গাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা এবং মালিকের সন্তানদের দেখে রাখাই ছিলো তার কাজ । ইচ্ছে ছিলো বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা মটোতে ইন্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করবেন । সেই মোতাবেক টয়োটা মটোর কর্পোরেশনে প্রকৌশলী পদের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সাক্ষাৎকারের পর সাধের চাকরিটি তার কপালে জোটেনি। তাই বলে তিনি বসে থাকেননি, নিজ ঘরে বসেই বানাতে শুরু করেন স্কুটার। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের উৎসাহ, প্রেরণা ও আর্থিক সাহায্যের জোরে নিজের স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেন। চেষ্টার ত্রুটি না করে রাতের পর রাত নিরলস পরিশ্রম করে যান এবং ১৯৪৬ সালে তৈরি করেন মোটরচালিত সাইকেল এবং ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “হোন্ডা মোটর কোম্পানি”। একসময় সফলতাও তাকে বরণ করে নেয়। তার প্রতিষ্ঠানের পন্য ধীরে ধীরে ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে । একসময় মটর সাইকেলের সমার্থক শব্দ হয়ে দাড়ায় হোন্ডা ! বর্তমানে পৃথিবির সবচেয়ে জনপ্রিয় মোটর সাইকেলের ব্রান্ড গুলোর মধ্যে হোন্ডা অন্যতম ।

স্টিফেন কিং –

এই জনপ্রিয় মার্কিন লেখকের ক্যারিয়ারের সূচনাই হয়েছিলো এমন একটি লেখার মাধ্যমে যা বিভিন্ন প্রকাশনী কর্তৃক ৩০ বার প্রত্যাখাত হয়েছিলো। একসময় দু:খ ও হতাশা থেকে তার লেখা অনেক সাধনার পান্ডুলিপিটি ফেলে দিয়েছিলেন ডাস্টবিনে। প্রত্যেক সফল মানুষের পিছে যে একজন নারীর সফল অবদান থাকে তা প্রমান করেছিলেন লেখকের স্ত্রী। তিনি ডাস্টবিন থেকে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার লেখক কে প্রেরনা দেন সেই পাণ্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ করার যা থেকে জন্ম নেয় বেস্ট সেলার উপন্যাস ‘ক্যারি’ যা থেকে পরবর্তীতে চলচিত্র নির্মাণ করা হয়। স্টিফেন কিং এর উপন্যাস এর কপি ৩৫০ মিলিয়ন এর অধিক বিক্রি হয় ও তার মধ্যে অনেকগুলো থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র নির্মাণ করা হয় যার মধ্যে রয়েছে দ্যা গ্রীন মাইল, ইট প্রভৃতি । এখন ইতিহাসের সেরা লেখকদের মধ্যে স্টিফেন কিং অন্যতম । ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

বিল গেটস –

পড়াশোনার পাঠ শেষ করতে পারেননি বিল গেটস। ছিটকে পড়েন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শুরু করলেন ব্যবসা। তবে সফল হতে পারেননি প্রথম ব্যবসা “ট্রাফ-ও-ডাটা” তে। তাতে ভেঙে পড়েননি তিনি। নতুন স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন নতুন প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। এবার ব্যর্থ হননি তিনি। তার পরের ইতিহাস সবার জানা । পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা ধনী হয়ে ওঠেন তিনি। একটানা তের বছর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ছিলেন বিল গেটস । অকল্পনীয় পরিমান সম্পদের মালিক হয়েও কোন অহংকার নেই তার মাঝে । পৃথিবির সবচেয়ে বেশি পরিমান অর্থ দানকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম ।

টমাস আলভা এডিসন –

টমাস আলভা এডিসন

ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে যারা সফলতার গল্প রচনা করছেন তাদের মধ্যে টমাস আলভা এডিসন অন্যতম | ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্র ছিলেন। স্কুলের পড়াশোনা ভালো লাগত না। শিক্ষকের বকাঝকায় দিন কাটত তার। একদিন স্কুলের শিক্ষক তার মাকে জানিয়ে দেন, এরকম বোকা ও অপদার্থ ছাত্রকে তাদের স্কুলে রাখা সম্ভব নয় । কারন তার দ্বারা কোন কিছু করা সম্ভব নয় । তাকে বের করে দেয়া হয় স্কুল থেকে । এর পর থেকে মা-ই ছিলেন তার শিক্ষক। প্রচুর বই পড়ে ফেলেন এ বয়সে। সে থেকেই পড়াশোনাকে কাজে লাগানো শুরু। একসময় ছিলেন পত্রিকার হকার, স্টেশনে সিগন্যাল দেওয়ার কাজও করেছেন। কিছুদিন পর টেলিগ্রাফি রপ্ত করেন। নানা উদ্ভাবন আর আবিষ্কারে ডুবে থাকতেন তিনি। এই বহিষ্কৃৃত ছেলেটিই মাত্র ১১ বছর বয়সে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পন্ডিত হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞানের যুগে যিনি বিজ্ঞান বিপ্লবের সরদার। বৈদ্যুতিক বাতি, কিন্টোগ্রাফ ও ফোনোগ্রাফ আবিষ্কারক। গোটা পৃথিবী আলোকিত করেন তার বিখ্যাত আবিষ্কারে। তার নাম টমাস আলভা এডিসন। বাবা স্যামুয়েল ও মা ন্যান্সি এডিসনের সবচেয়ে ছোট এবং সপ্তম সন্তান ছিলেন এডিসন। এই মহান বিজ্ঞানী ছোট বড় মিলিয়ে ১ হাজারেরও বেশি আবিষ্কার করেছেন । প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ি, শিল্পি, অভিনেতা ও খেলোয়ারদের ছাড়িয়ে একসময় আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এই স্কুল থেকে বহিষ্কার হওয়া অপদার্থ ব্যক্তিটি ! তার বিভিন্ন আবিষ্কার পৃথিবীকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকখানি । ১৮৪৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওহিওর মিলানে জন্ম নেন। ১৯৩১ সালে মারা যান। ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর চূড়ান্ত সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

ওয়াল্ট ডিসনি –

ওয়াল্ট ডিসনি, নামেই যার পরিচয়। সারা বিশ্বজুড়ে দেখা যায় ডিসনির পণ্য, সিনেমা, থিয়েটার হল, কমিক চরিত্র ও থিম পার্ক। মজার ব্যাপার হলো শুরুতেই তিনি একজন কার্টুনিস্ট ছিলেন। তবে তার সম্পাদক তাকে ছাঁটাই করেছিলেন। অভিযোগ ছিল ওয়াল্ট ডিসনির কোনো কল্পনাশক্তি নেই। এরপর আরো বেশ কয়েকটি ব্যবসা শুরু করেন। তবে লোকসানের সম্মুখীন হন, দেউলিয়া হয়ে পথে নামেন । তবুও হাল ছাড়েননি । নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আপ্রান চেষ্টা করে গেছেন । ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর চূড়ান্ত সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

অপেরাহ উইনফ্রে –

আজকের টেলিভিশন জগতের (প্রধানত আমেরিকা) প্রতিষ্ঠিত এই মুখ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সবচেয়ে ধনী নারীর তালিকায় স্থান করে নেয়ার আগে কাটিয়েছেন এক কঠোর শৈশব । প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে তাকে । এমনকি বর্ণবৈষম্যের কারণে টেলিভিশন প্রতিবেদক হিসেবে চাকরিচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। তবে হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি কখনো । সবসময় চেষ্টা করেছেন কিভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায় । তাইতো বর্তমানে তিনি সফলতার শীর্ষে অবস্থান করছেন । বর্তমানে তিনি আমেরিকার মিডিয়া মোঘলদের মধ্যে অন্যতম । ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর চূড়ান্ত সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

আইনস্টাইন –

ব্যর্থতার গল্প আছে আইনস্টাইন এরও ।স্কুল জীবনে যিনি ছিলেন সবচেয়ে ব্যর্থ, অনেক ঘুরেও একটা চাকরি জোটাতে না পেরে ২ বছর বেকার থাকতে হয়েছে তাকে । আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সবাই না বুঝলেও এই তত্ত্বের কথা এখন একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। ১৯০৫ সালে বিখ্যাত তত্ত্বটি দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। এই তত্ত্বটির কারণে গত শতাব্দী থেকে মানুষের চিন্তার জগতে ঘটে গেছে এক আমূল পরিবর্তন। আমাদের চারপাশের রহস্যময় প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে আইনস্টাইনের এই তত্ত্বটি। এই একবিংশ শতাব্দীতেও তার প্রভাব যে কমেনি বরং বেড়েছে সেটাও বলাই বাহুল্য। আপেক্ষিকতা তত্ত্বটির জনক আইনস্টাইন জার্মানির উলম শহরে জন্মেছিলেন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ । জার্মানির উপর দিয়ে বয়ে চলেছে দানিয়ুব নদী। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটা ছিমছাম শহর। শহরটার নাম উলম। এই শহরেই একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা হেরম্যান আইনস্টাইন। সেখানে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে ভালোভাবেই জীবন কাটাচ্ছিলেন।১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ তাদের ঘর উজ্জল করে এক ফুটফুটে শিশু জন্মলো। দুজনে শখ করে ছেলের নাম রাখলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। আপনার কি বুঝতে পারছেন এই নবজাতক কে? হ্যাঁ, ইনিই আইনস্টাইন। পরে যিনি আবিস্কার করেছিলেন বিখ্যাত আপেক্ষিকতার সূত্র। যখন তার বয়স পনেরো বছর, তার সমবয়সীরা স্কুলে যেতে শুরু করেছে, তখনও কিন্তু আইনস্টাইন স্কুলে যাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেননি। তাই স্কুলে ভর্তির উপযোগী করার জন্যে তাকে বাড়িতেই পড়ানো হয়। এসব নানা কারণে, অনেকে মনে করেন আইনস্টাইন আসলে প্রতিবন্ধী বা অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। তার শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না । কিন্তু একথা শিক্ষকরা বললে কী হবে, স্কুলে পড়া অবস্থাতেই আইনস্টাইন নানা রকম মজার মজার যন্ত্রপাতি বানিয়ে সবাইকে দেখাতেন। এসব যন্ত্রপাতি সবাইকে অবাক করে দিত। তাছাড়া তিনি গণিতে আর বিজ্ঞানে বেশ ভালো ছিলেন। স্কুলে পড়া অবস্থাতেই তিনি অনেক কঠিন কঠিন গণিতের সমাধান সহজেই করে দিতেন। কিন্তু অন্য দিকে স্কুলের অন্যান্য বিষয়ে কাঁচা থাকায় প্রতিবছর দেখা যেত, গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয় বাদ দিয়ে অন্যগুলোতে টেনেটুনে পাশ করেছেন আবার এমনও হয়েছে যে গনিত ও পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়া একেবারে সব গুলোতেই ফেল করেছেন। ফলে প্রথম স্কুল থেকে তাকে কোন রকম সার্টিফিকেট ছাড়াই বের হয়ে যেতে হয়। এরপর তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে এডজেনোসিস পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি হন। এটি মুলত একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। আপনাদের তো আগেই বলেছি যে, তার কোন রকম কোন সার্টিফিকেট ছিল না। তার পরেও তার মেধার কথা বিবেচনা করে তাকে এখানে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। তবে তাকে শর্ত দেওয়া হয় যে তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই ভর্তি করা হবে। কিন্তু দেখা যায় তিনি পদার্থ বিজ্ঞান আর গণিতে ভালো করলেও ফরাসি ভাষা, রসায়ন আর জীব বিজ্ঞানে ফেল করেন। কিন্তু তবুও গণিতে ভালো করার জন্যে তাকে পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ভর্তি করতে রাজি হয়। তবে সাধারণ স্কুলের পর্যায়গুলো তাকে পার করে আসতে বলা হয়। তিনি অবশ্য পরে একটা বিশেষ স্কুলে সেগুলো অধ্যয়ন করেন। এসময় তিনি জার্মানির নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন আর সুইডেনের নাগরিত্বের জন্যে আবেদন করেন। ১৯০০ সালে আইনস্টাইন ইটিএইচ থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক হবার পর অনেক খোঁজাখুঁজির করেও তিনি একটা শিক্ষকতার চাকরি জোটাতে পারেননি। প্রায় দুই বছর তিনি বেকার বসে থাকেন। তারপর একটা পেটেন্ট অফিসে সহকারী পরীক্ষকের চাকরী পান। তবে সেখান থেকে তাকে বলে দেওয়া হয়, পূর্ণ দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত তার পদোন্নতি হবে না। ১৯০৬ সালে পেটেন্ট অফিস তাকে পরীক্ষকের পদে উন্নীত করে। এরপর ১৯০৮ সালে তিনি বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর ১৯১১ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তার কিছুদিন পরেই তিনি চার্লস ইউনিভার্সিটি অফ প্রাগে প্রফেসরের পদ গ্রহন করেন।যে সব কর্মে তিনি উজ্জলঃ১৯০৫ সালে পেটেন্ট অফিসে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে আইনস্টাইন একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে চারটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন। চারটি বিষয় হলঃ “আলোক তড়িৎ ক্রিয়া” আইনস্টাইনের আলোক তড়িৎ সমীকরণ প্রতিপাদন। “ব্রাউনীয় গতি” আনবিক তত্বের সমর্থন, “তড়িৎ গতি বিজ্ঞান” আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আবিস্কার ও ভর শক্তি সমতুল্যতার বিখ্যাত E=mc² সূত্র প্রতিপাদন। তারপর আইনস্টাইনকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এই গবেষণাপত্র প্রকাশের কিছূদিন পরই আইনস্টাইন বিজ্ঞানীদের নজরে আসেন। আর এখন তাকে ছাড়া বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন বলে গণ্য করা হয় তাকে। আপেক্ষিকতার তত্ব ছাড়াও বিজ্ঞানের জগতে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তার।সেই বিখ্যাত থিওরিঃআইনস্টাইনের নানা কর্মের মাঝে যে অবদানটি তাকে চিরঞ্জীব করে রেখেছে তা হল থিওরি অফ রিলেটিভিটি। এই থিওরি মানুষের এতদিনের চিন্তা চেতনাকে ওলটপালট করে দেয়। নিত্যদিনের চিরচেনা ভাবনাগুলো থমকে দাঁড়ায় এখানে। কেউ যদি থিওরি অফ রিলেটিভিটি জানে, তাহলে সে অনুভব করতে পারবে তার চারপাশের জগৎটা কত রহস্যময়।এই থিওরি বলে পৃথিবীর কোন কিছুই স্থির নয়। সবকিছুই গতিশীল। এবং এই গতির কারণে দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, অবস্থান সবকিছুই আসলে আপেক্ষিক। আপনার নিশ্চয় অজানা নয় যে পৃথিবীটাও সূর্যটাকে ঘিরে অনবরত ঘুরছে। পৃথিবীটা যেমন প্রতি সেকেন্ডে ২৯.৮ কিলোমিটার বেগে সুর্যের চারদিকে ঘুরছে।আবার ধরেন, আপনি একটা চলন্ত ট্রেনে বসে আছেন আর আপনার পাশ দিয়ে আরেকটা ট্রেনে আপনার বন্ধু যাচ্ছে। আপনাদের দুটো ট্রেন যাচ্ছে একই দিকে। যদিও আপনাদের ট্রেনটা আসলে চলছে তবু আপনার নিজেকে এবং আপনাদের ট্রেনটাকে স্থির মনে হবে। আবার আপনার বন্ধুও নিজেকে এবং তার ট্রেনটাকে স্থির মনে করবেন। আসলে এই ব্যাপারটাই হচ্ছে আপেক্ষিকতা। ধরি, আপনাদের ট্রেনে আপনি আপনার আব্বুর পাশে বসে যাচ্ছেন আর আপনার বন্ধু ট্রেনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। তখন চলন্ত ট্রেনের মধ্যেও আপনার কাছে আপনার বাবাকে স্থির বলে মনে হবে। আর আপনার বন্ধুকে মনে হবে প্লাটফর্ম সহ পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে। তাহলে আপনার সাপেক্ষে তোমার বন্ধু গতিশীল আর আপনার আব্বু হবে স্থির। ভালো করে ভেবে দেখেনতো আসলেই তা কিনা। তাহলে আপনার বন্ধুর গতিকে বলা যেতে পারে আপেক্ষিক গতি। তেমনি করে হতে পারে আপেক্ষিক অবস্থান, আপেক্ষিক দৈর্ঘ্য, আপেক্ষিক সময়, আপেক্ষিক ভর। এর সবই গতির ফলে হয়ে থাকে। আর এই গতিকে তুলনা করতে হয় আলোর গতির সঙ্গে। কেননা মহাবিশ্বে কেবল আলোর গতিই অপরিবর্তনীয়। কোন কিছুর গতিই আলোর থেকে বেশি নয়। তবে এই লেখাটুকু পড়লেই আপনি আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্পর্কে পুরো জেনে বা বুঝে যাবেন সেটা কিন্তু একদমই সত্য নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এখানে আপেক্ষিক তত্ত্বের ধারণা দেয়া হয়েছে মাত্র। এ সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে আপনাকে এ বিষয়ে আরও বেশি পড়তে হবে। এই থিওরির কয়েকটা মজার জিনিস আপনাদের বলি। যেমন কোন গতিশীল মানুষের হাতে যে ঘড়ি থাকবে তার ঘড়িটি একজন সি’র মানুষের হাতের ঘড়ির থেকে চলবে আস্তে। থিওরির একটা অংশ বলে যে কোন গতিশীল বস্তুর সময় তুলনামুলক কম গতিশীল বস্তুর তুলনায় কম দ্রুত চলে। আবার থিওরি থেকে জানা যায় গতিশীল সবকিছুর দৈর্ঘ্য স্থির বস্তুর তুলনায় কমতে থাকে। শুধু তাই না, এই থিওরি বলে ভর আর শক্তি বলে আলাদা কিছু নয়। একটা আরেকটাতে পরিবর্তিত হতে পারে গতির ফলেই। অর্থাৎ কোন বস্তুর ভরের সঙ্গে আলোর বেগের বর্গের গুনফলই হচ্ছে শক্তি।
থিওরি অফ রিলেটিভিটির আরেকটি মজার বিষয় হলো টুইন প্যারাডক্স। বিষয়টা বোঝার জন্য ধরেন, আপনি আর আপনার ভাই একই দিনে জন্ম গ্রহণ করলেন । জন্ম গ্রহণের কিছুদিন পরে একটা রকেটে আপনি ঘুরতে গেলেন পৃথিবী থেকে দূরের কোন নক্ষত্রের দিকে। এদিকে আপনার যমজ ভাই রয়ে গেল পৃথিবীতেই । আপনার রকেটটা আলোর প্রায় কাছাকাছি বেগে চলছে । তার মানে আপনাদের রকেটের বেগ হল ১৪৭০০০ মাইল/সেকেন্ড এর কাছাকাছি। আপনি তিন বছর বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র ঘুরে ফিরে আপনার ভাইকে দেখতে আবার পৃথিবীতে এলেন। বাড়িতে যখন আপনার ভাই আপনার সামনে এলো, আপনার তো চক্ষু ছানাবড়া। আরে আশ্চর্য! এই বুড়ো লোক আপনার ভাই হয় কীভাবে ! গত তিন বছরে আপনার বয়স বেড়েছে মোটে তিনটি বছর। আর আপনার ভাইয়ের কিনা বয়স তখন ত্রিশ বছর।
এরকম একটা ব্যাপার নিশ্চয় আপনার কাছে জগাখিচুরী লাগছে ? ভাবছেন এটা অসম্ভব । কিন্তু এমনটাও সম্ভব । অন্তত আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি কিন্তু তাই বলে।আইনস্টাইন গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করে দেখান যে কম গতিশীল বস্তুর তুলনায় স্থির বস্তুর সময় অধিক দ্রুত যায়। আর একারণেই এমনটি ঘটেছে। এটাকে বলে টুইন প্যারাডক্স বা যমজ বিভ্রান্তি।
আবার ধরেন, আপনি একটা রকেটের ছাদে করে আলোর থেকেও বেশি বেগে যাচ্ছেন। এসময় আপনার হাতে একটা চার ব্যাটারীর টর্চও আছে। আপনি আপনার টর্চটা জ্বালাতেই আলো ১৮৬০০০ মাইল/সেকেন্ড বেগে যেতে শুরু করলো। কিন্তু আপনি যেহেতু আলোর থেকেও বেশি বেগে যাচ্ছেন তাই আলো কিন্তু আপনার সামনে যেতে পারবে না বরং আপনার সাপেক্ষে টর্চের আলো বের হয়েই পিছন দিকে যেতে থাকবে। টর্চ জ্বালিয়ে আলোকে কখনো পিছনে যেতে দেখেননি বলে আপনার কাছে অবাক লাগতেই পারে।
আপনার নিউক্লিয়ার বোমার নাম হয়তো শুনে থাকবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ ধরনের দুটো বোমা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা হয়েছিল। এই বোমাগুলো আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর শক্তি রূপান্তর সূত্র E=mc² মেনে কাজ করেছে। এই সূত্র মেনে অল্প পরিমাণ ভর থেকে বিশাল শক্তি উৎপন্ন করেছিল। থিওরিটি আগে গাণিতিক ভাবে দেখানো হলেও বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তা সফলভাবে প্রমানিত হয়েছে ওই বোমা নিক্ষেপের ঘটনায়। ওই ঘটনা যে ঘটতে পারে তার আশংকা করেছিলেন আইনস্টাইন। এজন্য তিনি মন খারাপ করতেন এই ভেবে যে তার আবিষ্কার মানুষের অপকারের কাজে ব্যবহার করা হবে। আইনস্টাইন প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করতেই যুগান্তকারী তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। এখন এই তত্ত্ব ব্যবহার করে খারাপ কিছু বানিয়ে ফেলে, তাতে আইনস্টাইনের দোষটা কোথায়? আইনস্টাইনের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ যে আরো কত সব চমকপ্রদ আর নতুন নতুন ভাবনাকে জন্ম দেয় তা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তাই আপনাদের যারা এই থিওরি সম্পর্কে আরো জানতে চান তারা মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ বইটি পড়তে পারেন |

জর্জ সোরোস –

বিশ্বের আর্থিক জগতের অন্যতম ধনী জর্জ সোরোসের জন্ম ১৯৩০ সালের ১২ আগস্ট। তিনি জন্মগ্রহণ করেন হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের এক ইহুদি পরিবারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এ ধনকুবের বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সোরোস ফান্ড ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান। এ ছাড়া বিশ্বের খ্যাতনামা অলাভজনক জনকল্যাণমূলক সংস্থা ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউটেরও চেয়ারম্যান তিনি। ১৯৪৪ সালে যখন হিটলারের জার্মানি হাঙ্গেরিদখল করে নেয়, তখন তিনি মাত্র ১৩ বছরের বালক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোরোস চলে আসেন ইংল্যান্ডে। এখানেই শুরু হয় অভিবাসী এক নিঃসম্বল তরুণের জীবনসংগ্রাম। তখন ইহুদি এক চাচার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন তিনি। ওই চাচা তার জন্য সামান্য কিছু মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে। তবে দারিদ্র্য দমাতে পারেনি সোরোসকে। তিনি ভর্তি হন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে। ১৯৫২ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেনতিনি। পেট চালানোর দায়ে ছাত্রাবস্থায় রেলওয়ের কুলিগিরি থেকে শুরু করে হোটেলের ওয়েটার—এ রকম আরও অনেক কাজ করেছেন তিনি।স্নাতক সম্পন্ন করার পর বহু কষ্টে কাজ শুরুকরেন ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে। ১৯৫৬ সালে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। এখানেও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সোরোসের অধিকাংশ জনকল্যাণমূলক কাজের দৃষ্টিভঙ্গি গণতন্ত্র ও সুশাসন। সোরোসের মতে, বেশিরভাগ দারিদ্র্যের কারণ অদক্ষ শাসনব্যবস্থা। নিউইয়র্কের নিউ স্কুল ফর সোস্যাল রিসার্চ, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও করভিনাস ইউনিভার্সিটি অব বুদাপেস্ট থেকে অনারারি ডক্টরাল ডিগ্রি লাভ করেন সোরোস। ২০১২ সালের ১২ মার্চ ফোর্বস ম্যাগাজিনের তালিকা অনুযায়ী তিনি পৃথিবীর ২২তম ধনী ব্যক্তি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের মধ্যে তার অবস্থান সপ্তম। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, তার সম্পদ ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী, ধনকুবেরদের তালিকায় তিনি ২২ নম্বরে; তবে নিশ্চিতভাবে আরও কয়েকজনকে ডিঙিয়ে সামনের দিকেই থাকতেন, যদি না তিনি ৮০০ কোটি ডলার দান-ধ্যানে ব্যয় করতেন।

শাহিদ খান –

ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে যারা সফলতার গল্প রচনা করছেন তাদের মধ্যে শাহিদ খান অন্যতম | তিনি জন্মেছেন মধ্যবিত্ত পরিবারে। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল। যে কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। পরিবার ছেড়ে একাই পাড়ি জমান আমেরিকায়। সেখানে নিজের থাকা-খাওয়া আর পড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেয়েছেন। বিভিন্ন সময় তাকে কাজ করতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। অর্থ জোগাতে রেস্তোরাঁয় থালাবাসন মাজার কাজও নেন। বাসা ভাড়া নেই বলে পুরো ছাত্রজীবন হোটেলেই থেকেছেন। জীবনযুদ্ধ জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের বংশোদ্ভূত শাহিদ খানের কথা। এখন তিনি আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রভাবশালীদের একজন। গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির বিখ্যাত কোম্পানি ফ্লেক্স-এন-গেটের মালিক তিনি। শুধু নিজেই ধনকুবের বনেননি। তৈরি করেছেন নতুন কর্মসংস্থান। শাহিদ খান। এখন বিলিওনিয়ার। অথচ জীবিকার খোঁজে এক সময় রেস্তোরাঁয় থালাবাসন মাজতে হয়েছে তাকে। তার শুরুর গল্পটা আপনার চারপাশের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই। আর্থিক দৈন্য থাকলেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকায়। সেখানে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তারপর জুটিয়েছেন চাকরি। যে কোম্পানিতে তিনি চাকরি করতেন, কিছুদিন পর নিজেই কিনে নেন সেই কোম্পানিটি। এখন তিনি আমেরিকার অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দানকারী গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি। নাম লিখিয়েছেন বিলিয়নিয়ারদের তালিকায়। অনেকটা গল্পের মতো শোনালেও শাহিদ খান এই গল্পকেই বাস্তবে পরিণত করেছেন। এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে ধনীব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে গেলেও প্রথমেই আসবে তার নাম। তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। বিখ্যাত গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কোম্পানি ফ্লেক্স-এন-গেটের মালিক তিনি। হাজারো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা কোম্পানিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শাহিদ খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ১৮ জুলাই। পাকিস্তানের লাহোরে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন সাধারণ ব্যবসায়ী, আর মা গণিতের অধ্যাপিকা। ১৯৬৭ সালে নিজ দেশ পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় পাড়ি জমান মাত্র ১৬ বছর বয়সে। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তাকে যেতে হয়েছিল মাতৃভূমি ছেড়ে। আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের কাছে ‘শাদ খান’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। কিন্তু গোটা বিশ্ব তাকে চেনে শাহিদ খান নামেই। পাকিস্তানি-আমেরিকান বিলিয়নিয়ার হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করেন। ছাত্রজীবনের শুরুতে তিনি আমেরিকার রেস্তোরাঁয় বাসন মাজার কাজ জুটিয়ে নেন। সে সময় তার পারিশ্রমিক ছিল ঘণ্টা প্রতি ১ দশমিক ২০ ডলার। ভাড়ার টাকা বাঁচাতে বাসায় না থেকে রাত কাটাতেন হোটেলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে শাহিদ ইলিনয়ের ফ্লেক্স-এন-গেট নামের এক প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি তখন গাড়ির যন্ত্রাংশ বানাত। ফ্লেক্স-এন-গেট কোম্পানিতে শাহিদ খান যখন যোগ দেন তখনো তার পড়াশোনা শেষ হয়নি। পড়াশোনা শেষে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিরেক্টর হিসেবে সেই কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে কোম্পানির বাম্পার তৈরির কাজে তিনি নিযুক্ত হন। সেখানে শুধু কার ও মাইক্রো বাসের বাম্পার তৈরি করা হতো । এখানে চাকরি করে শাহিদ খান মাত্র দুই বছরে ব্যাংক ট্রানজেকশন করেন ৫০ হাজার ডলার। সুযোগ আসে ছোট ব্যবসা প্রশাসন থেকে ১৬ হাজার ডলার ঋণ নেওয়ার। তারপর ১৯৮০ সালে তিনি ফ্লেক্স-এন-গেট-কে প্রতিষ্ঠাতা চার্লস গ্লেসন বাটজো-এর কাছ থেকে কিনে নেন। প্রথমে তিনি ছোট গাড়ির জন্য বাম্পারের ব্যবসাকে গুটিয়ে বড় গাড়ির জন্য বাম্পার বানানোর কাজে হাত দেন। এই কাজে বেশ লাভবান হন। তারপর মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালে শাহিদ খান টয়োটা পিকআপের জন্য অল্প সংখ্যক বাম্পার সরবরাহ করা শুরু করেন। কাজের প্রতি একাগ্রতা আর নিষ্ঠার ফলশ্রুতিতে দ্রুত তার উন্নতি হয়। এরই মধ্যে টয়োটা কোম্পানির আস্থা অর্জনেও তিনি সক্ষম হন। ১৯৮৭ সালে ফ্লেক্স-এন-গেট টয়োটা পিকআপের একমাত্র বাম্পার সরবরাহকারী কোম্পানি হিসেবে পরিণত হন। এর দুই বছর পরই শাহিদ পুরো আমেরিকায় ব্যবহার হওয়া টয়োটা গাড়ির বাম্পার সরবরাহের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হন। এর পরেই কোম্পানির আয় বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদনের পদ্ধতিও পাল্টে যায় । তখন থেকে কোম্পানির বিক্রয়ের পরিমাণ ১৭ মিলিয়ন থেকে ২০১০ সালে এসে পৌঁছায় ২ বিলিয়নে।২০১১ সালে ফ্লেক্স-এন-গেটের কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজার ৪৫০ জনে। ৪৮টি মেনুফ্যাকচারিং প্লান্ট স্থাপন করেন আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায়। এই কোম্পানির আয় থেকে আমেরিকাকে প্রতি বছর তিন বিলিয়ন করে রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০১২ সালে কোম্পানিটির পেশাগত নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধ প্রশাসন গড়ে তোলা হয়। ফ্লেক্স-এন-গেট ৫৭ হাজার ডলার ব্যয় করে গ্রামীণ খাতে স্বাস্থ্য বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়াও তার মালিকানায় আছে আমেরিকার ন্যাশনাল ফুটবল লিগ বা এনএফএল-এর পেশাদার ফুটবল দল জ্যাকসনভিল জাগার্স এবং ইংলিশ ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের দল ফুলহাম এফ.সি.। শাহিদ খান ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ন্যাশনাল ফুটবল লিগকে প্রথম কেনার প্রস্তুতি নেন। সেসময় তিনি একটি চুক্তির মাধ্যমে ৬০ শতাংশের মালিক হন। এরপর ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ওয়াইনি ওয়েভারের কাছ থেকে জ্যাকসনভিল জাগার্স ফুটবল দল কিনে নেন। এরপর ন্যাশনাল ফুটবল লিগকে সঙ্গে করে একটি গ্রুপ মালিকানাধীনে আনা হয়। তখন ওয়াইনি ওয়েভার টিমের কাছে শাহিদ খানের মালিকানার কথা ঘোষণা করেন। ২০১২ সালের জানুয়ারির ৪ তারিখে ফুটবল দলের ওপর শাহিদ খানের মালিকানা চূড়ান্ত হয়। জাগার্সের শতভাগ ক্রয়মূল্য ছিল ৭৬০ মিলিয়ন ডলার। এদিকে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে মুহাম্মদ আল ফায়েদের কাছ থেকে কিনে নেন ইংলিশ ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের দল ফুলহাম এফ.সি.। দলটির ক্রয়মূল্য ছিল ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শাহিদ খান পেয়েছেন বেশ কয়েকটি পুরস্কার। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আছে পুরস্কার লাভের ইতিহাস। ১৯৯৯ সালে মেকানিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সফলতম বিশিষ্টজন ক্যাটাগরিতে তিনি পুরস্কার পান। ২০০৬ সালে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং শাহিদ খানকে অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড দিয়ে ভূষিত করে।

স্টিভ জবস –

ব্যর্থতার গল্প আছে স্টিভ জবস এরও ।আই ফোন বা আইপ্যাড তো বর্তমানে আমাদের স্ট্যাটাস বা আভিজাত্যের বহিপ্রকাশ এ পরিণত হয়েছে । তবে যার উদ্ভাবনে আমাদের এই আয়েস কখনো তার ব্যর্থতা সম্পর্কে কোন গল্প কি আমরা শুনেছি? বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানি অ্যাপল এর প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারেননি । এমনও দু:সময় গিয়েছে যখন তিনি সপ্তাহে একদিন একটু ভালো খাবারের আশায় সাত মাইল দুরে গির্জায় হেটে যেতেন ! ১৯৮৫ সালে তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকেই তাকে বরখাস্ত করা হয় যা তিনি তার বন্ধুর সাথে সম্মিলিত ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাকে বরখাস্তের কারন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিলো যে তাকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়। আর তিনি যে প্রোজেক্ট গুলো নিয়ে আসেন তাও কল্পনাপ্রসূত ও শেষ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। স্টিভ ১৯৯৬ সালে আবার তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ‘অ্যাপল এ ফিরে আসেন যখন কোম্পানি প্রায় দেউলিয়া হবার পথে । তখন তিনি তার হাতে তৈরি কোম্পানিটি পুনরায় কিনে নেন। তার এই ফিরে আসাই ‘অ্যাপল’ কে আবার নিয়ে যায় সফলতার শীর্ষে।

জে কে রাউলিং –

ব্যর্থতার গল্প আছে জে কে রাউলিং এরও ।
পৃথিবীতে লেখালেখি করে প্রথম বিলিয়নিয়ার বনে যাওয়া লেখিকা জে কে রাউলিং। রাতারাতি জনপ্রিয়তা পাওয়া এ লেখিকার ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রথমবার তিনি যখন ‘হ্যারি পটারের’ পান্ডুলিপি নিয়ে একটি প্রকাশনীতে যান প্রকাশনীর মালিক তো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে তাকে এবং তার সৃষ্টিকর্মকে। অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের উপর বিশ্বাস অটুট রেখে বিভিন্ন প্রকাশনীর দ্বারে দ্বারে পাণ্ডুলিপি নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। কিন্তু হায়! একজন কিংবা দুইজন নয়, তেরোজন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়েছেন তিনি। তারপরেও থেমে যায়নি, পুনরায় নব উদ্যমে কাজ করে গেছেন বলেই হ্যারি পটার সিরিজ প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সাহিত্য জগতের সর্বোচ্চ আসন থেকে কেউ তাকে সরাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে বইটি প্রকাশের সাথে সাথেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে যান এই লেখিকা। সারা পৃথিবী ব্যাপি বইটির মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। হ্যারি পটার সিরিজ শুধু বই হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা নিয়ে সিনেমা হয়েছে এবং লাখো মানুষের হৃদয় জয় করেছে জে কে রাউলিং। পেয়েছেন অনেক পুরষ্কারও।

কারসানভাই প্যাটেল –

নিতান্ত গরীর এক কৃষক পরিবারে জন্ম তার। রসায়ন বিভাগ থেকে ২১ বছর বয়সে বিএসসি পাশ করে একজন সাধারণ ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে শুরু করেন জীবন।
নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই নিজের বাড়ির পেছনে শুরু করলেন কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট তৈরির কাজ। ভদ্রলোকের এহেন খামখেয়ালী কাণ্ড দেখে প্রতিবেশীরা শুরু করলো হাসাহাসি। বাজারে তখন সার্ফের একচেটিয়া দাপট। এ যেন কুমিরের সাথে রুই মাছের যুদ্ধ! মানুষ হাসবে না তো কি করবে?
সারাদিন অফিসে কাজ শেষ করে সারা রাত ধরে শুরু হলো হার না মানা পরিশ্রম। একজন ব্যক্তি, একাই মালিক, একাই শ্রমিক, একাই বিক্রেতা, বলতে গেলে ওয়ান ম্যান কোম্পানি।
অফিসে যাওয়ার পথে সাইকেলে করে ডিটারজেন্ট প্যাকেটগুলো নিয়ে যান। খুবই সস্তা দামে বিক্রি করার চেষ্টা করেন। কাজ থেকে ফিরে পাড়া মহল্লায় ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝান। কেউ কিনে, কেউ ধমক দেয়, কেউ বা গালাগালি করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তিনি অদম্য। তার তৈরি জিনিসটি ভালো। দামে সস্তা। এক কেজি পাউডারের দাম মাত্র সাড়ে তিন রুপি। সেখানে সার্ফের দাম প্রায় ১৬ রুপি । জিনিসটি মানুষ কিনবে না কেন ?
অবশেষে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ । ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসের কোনো একদিন । সারাদিন ছুটি । অফিস নেই । সকালে কাক ডাকা ভোরে বের হয়ে রাতে বাসায় ফিরলেন। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিক্রি করলেন মাত্র ১৬ প্যাকেট পাউডার । আর এতেই ভদ্রলোক যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো আনন্দ পেলেন ।
এরপর থেকে ইতিহাস । প্রতিদিন বাড়তে থাকলো বিক্রি । সেদিনের ১৬ প্যাকেট আজ দৈনিক বিক্রি হয় লাখো প্যাকেট । ১০০ স্কয়ার ফিটের যে ঘরে সারারাত জেগে পাউডার তৈরি করতেন সেই ১০০ স্কয়ার ফিটের আধিপত্য আজ শুধু ভারতবর্ষই নয়, ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ।
সেদিনের সাইকেলে চড়ে ঘরে ঘরে গিয়ে পাউডার বিক্রি করা ছেলেটি ২০০৭ সালে আমেরিকার অন্যতম মেট্রিয়ালস কোম্পানী Searles Valley Minerals Inc. মিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নেয় ।
একাই একটি ছোট খুপড়ি ঘরে যে কাজ শুরু করেছিলেন সেখানে এখন প্রতিদিন কাজ করে প্রায় ১৪ হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী । আর সাড়ে তিন রুপির শুরু করা ব্যবসা দাঁড়িয়েছে বর্তমানে ১২.১৭ বিলিয়ন ডলারে।
নিজের আদরের মেয়ে নিরুপমার নামে ব্র্যাণ্ডের নাম দিয়েছিলেন “নিরমা ডিটারজেন্ট পাউডার”। পাউডারের গায়ে যে ছবিটি থাকে সে তারই মেয়ে নিরুপমা ডাকনাম ‘নিরমা’।
নিরমা নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন কারসানভাই প্যাটেল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভারতের অন্যতম ফার্মাসি কলেজ- নিরমা ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি।
গুজরাটি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কারসান প্যাটেল একজন, যার ব্যক্তিগত এয়ারক্রাফ্ট আছে। আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এবং জাইডাস গ্রুপের প্রোমোটার পঙ্কজ প্যাটেলের পরে কারসানিভাই হলেন আহমেদাবাদের তৃতীয় ব্যবসায়ী, যিনি চপার কিনেছেন।
৪০ কোটি টাকা দামের ৬ আসনের চপারটি আপাতত দাঁড় করানো আছে আহমেদাবাদ বিমানবন্দরে । ভারত সরকার এই বিশিষ্ট শিল্পপতিকে পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত করেছে । ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি সফল |

জ্যাক মা-

ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে যারা সফলতার গল্প রচনা করছেন তাদের মধ্যে চীনের উদ্যোক্তা জ্যাক মা অন্যতম ।চীনের ব্যবসায়ী, আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা সারা পৃথিবীর ব্যবসায়ী ও উদ্যাক্তাদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম, আদর্শের নাম। প্রশ্ন হলো জ্যাক মা কি রাতারাতি সফল হয়েছেন? না, রাতারাতি সফল হননি। তাঁর সফলতার পেছনে রয়েছে করুন ব্যর্থতার গল্প। তিনি বার বার ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়েছেন কিন্তু কখনো ভেঙ্গে পড়েননি, সফলতার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে হেঁটে গিয়েছেন দুর্গম পথে। চীনের জাতীয় কলেজে ভর্তির জন্য উত্তীর্ণ হতে সময় লেগেছে তিন বছর। পরপর দুইবার ফেল করে তৃতীয় বারে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি । যেখানে বছরে মাত্র একবার সুযোগ দেয়া হয়, সেখানে জ্যাক মার লেগেছে তৃতীয় চান্স। ইচ্ছে ছিলো পৃথিবির সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হাভার্ডে পড়বেন । হাভার্ডে ভর্তির জন্য দশবার আবেদন করেছেন কিন্তু প্রতিবারই তাকে প্রত্যাখাত হতে হয়েছে, একবারও ভর্তি হতে পারেননি । হোঁচট খেতে হয়েছে চাকুরী বাজারেও। ছোট বড় প্রায় ত্রিশটি কোম্পানিতে আবেদন করেও কোন সুফল আসেনি। বরাবরের মত প্রত্যাখাত হতে হয়েছে। পুলিশের চাকুরীতে আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন এমনকি তার শহরে কেএফসি চালু হলে সেখানেও আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনও হয়েছে যে চাকরিতে আবেদন করা সবাইকেই নেয়া হয়েছে কিন্ত শুধুুমাত্র তাকেই বাদ দেয়া হয়েছে । এমনই পোড়া কপাল ছিলো তার । আলিবাবার সফলতার আগে আরো দুটো উদ্যেগে খুব খারাপ ভাবে ব্যর্থ হন। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। সফলতার স্বপ্ন দেখেছেন দিনের পর দিন। তাইতো আলিবাবা বর্তমানে বিজনেস টু বিজনেস, বিজনেস টু কাস্টমার, কাস্টমার টু কাস্টমার সার্ভিস দেয়া বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। জ্যাক মার বর্তমান সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হলেন তিনি । ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর চূড়ান্ত সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স –

ব্যর্থতার গল্প আছে হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স এরও । খাবারের জনপ্রিয় ব্রান্ড কেএফসির কথা কে না জানে! এও সবাই জানে কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স একজন সফল ব্যক্তি। কিন্তু তার সফলতার পেছনের গল্প জানা আছে কি? বার বার ব্যর্থ হয়েছেন ডেভিড স্যানডার্স।
বিশ্বব্যাপি খাবারের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড কেএফসি বা কেনটাকি ফ্রায়েড চিকেন। এর প্রতিষ্ঠাতা হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। যাকে আমরা কর্নেল স্যান্ডার্স নামে চিনি। তবে জানেন কি, শুরুতে তিনিও ব্যর্থ ছিলেন? তার উদ্ভাবিত কেএফসির এই গোপন রন্ধন প্রণালী বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট এক হাজার ৯ বার প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি রেলওয়ের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, কাজ করেন বীমাকর্মী হিসেবে, কিন্তু কোন কিছুতেই মন বসেনি তার। ১৯২০ সালে নিজের কিছু জমানো টাকা দিয়ে বোট কোম্পানি খোলেন তারপর যোগ দেন ইন্ডিয়ানার চেম্বার অব কমার্সে। সেখানেও মন বসেনি তার। ওখানে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে কেন্টাকিতে একটি টায়ার নির্মানকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মীর কাজে নিযুক্ত হন। কিন্তু সেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায় ১৯২৪ সালে। তারপর কেন্টাকির স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির ম্যানেজারের সাথে পরিচয়ের সুবাদে একটি সার্ভিস স্টেশনে চাকুরি পান তিনি। কিন্তু কথায় আছে না অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। ঐ কোম্পানিটাও দেউলিয়া হয়ে গেল ১৯৩০ সালে। চল্লিশ বছর বয়সে বেকার হয়ে পড়েন হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। তবুও থেমে যাননি। স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। খাবার তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সরবরাহ করা শুরু করলেন। নানা ঘাত প্রতিঘাত, হুমকি সহ্য করেও টিকে গেছেন। ১৯৫২ সালে তিনি বাণিজ্যিকভাবে নিয়ে এলেন তাঁর অনেক সাধনার রেসিপি- ‘কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন’। শেলবিভিলে’তে নতুন একটা রেস্তোরা খুললেন তিনি, যেখানে শুধু ফ্রাইড চিকেনের এই ডিশটাই পাওয়া যাবে। লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়লো নতুন এই আইটেম চেখে দেখতে, সবার পছন্দও হলো। বিক্রি করে কূলোতে পারছিলেন না কর্নেল স্যান্ডার্স, শুরু করলেন বিভিন্ন শহরে কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেনের শাখা খোলা, প্রথমে আমেরিকা আর তারপরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো কেএফসি। ১৯৫৫-১৯৬৫ এই দশ বছরে চীন, কানাডা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেএফসি’র প্রায় ছয়শোর বেশি শাখা খোলা হয়েছিল, রমরমা ব্যবসা চলছিল, এতদিনে দেখা দেয়া সাফল্যের তরী চলা শুরু করলো মাতাল গতিতে !

অক্ষয় কুমার –

অমৃতসরের মফস্বল শহর থেকে উঠে এসে তিনি এখন মুম্বাইয়ের আলো ঝলমলে সিনেমা জগতের সবচেয়ে ব্যস্ততম অভিনেতা, গত কয়েক বছরেই ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে বেশী সফল ছবির নায়ক। অমৃতসর থেকে মুম্বাইয়ের দূরত্ব প্রায় সতেরোশো কিলোমিটার, কিন্ত এই দূরত্ব পাড়ি দিতে তাঁকে পার করতে হয়েছে অনেকটা সময়, ঢেলে দিতে হয়েছে নিজের শ্রম আর মেধার সবটুকুই। সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা ঢাকা হয়ে বোম্বে- বন্ধুর পথটা তিনি পাড়ি দিয়েছেন একা, একদম শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি শিখরে। বলিউডে কোন ফাদার-গডফাদার ছিল না তাঁর, একের পর এক ফ্লপ আর ডিজাস্টারের সাগর পেরিয়েই তাঁর হাতে ধরা দিয়েছে আজকের এই সাফল্য। আর এর পেছনে আছে তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ঝুঁকি নেয়ার বাসনা, কাজের প্রতি একাগ্রতা আর জীবনযাপনের অদ্ভুত এক নিয়মানুবর্তীতা। ক্যারিয়ারের বেশীরভাগ সময়েই নানা বঞ্চনা সয়েছেন, ঢাকা পড়ে ছিলেন তিন খান কিংবা অন্য অনেকের আড়ালে। কিন্ত সূর্যের মতো আপন আলোয় জ্বলেছেন তিনি, হার মানেননি, হেরে যাবার ভাবনাটা মাথায় আসতেও দেননি কখনও।
প্রচন্ড রুটিনমাফিকভাবে সাজানো একটা জীবন অক্ষয়ের, সেই জীবনে ছন্দপতন নেই, নেই কোন অনিয়ম। কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতেই পছন্দ করেন মানুষটা। ভোর চারটায় বিছানা ছাড়েন তিনি, তখন থেকেই শুরু হয় ব্যায়াম। পঞ্চাশে পা দিয়েও দারুণ ফিট বডির পেছনের গল্পটা এই শৃঙখলাবদ্ধ জীবন জানে। জিমে ওয়েট লিফটিং ছাড়াও এর বাইরে শরীর ঠিক রাখার জন্যে দৌড়, মার্শাল আর্ট আর বক্সিং এর প্র‍্যাকটিস করেন তিনি নিয়মিত।

অক্ষয় বিশ্বাস করেন, সূর্যাস্তের পর মানবশরীর ক্যালরি বার্ন করা বন্ধ করে দেয়, আর তাই সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পরে কোন খাওয়াদাওয়া করেন না তিনি। ডিনার সেরে নেন সূর্যাস্তের আগেই! রাত নয়টার মধ্যে ঘুমে কাদা হয়ে পড়েন এই সুপারস্টার, বলিউডের লেট নাইট পার্টির যে রেওয়াজ, তার সঙ্গে দারুণ ব্যতিক্রম অক্ষয় কুমার। সান্ধ্য বা রাত্রীকালীন কোন পার্টিতে কখনোই তাঁকে দেখা যায় না। করণ জোহর একবার জোর করে সস্ত্রীক অক্ষয়কে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, সেখানে নাকি এক কোণায় বসে ঢুলছিলেন অক্ষয়!

টুইঙ্কেলের সঙ্গে তাঁর বিয়েটাও অদ্ভুত এক ঘটনা! ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের কভারের জন্যে ফটোশুট করতে গিয়ে প্রথমবার টুইঙ্কেলকে সামনাসামনি দেখেন অক্ষয়, দেখেই প্রেমে পড়ে যান। অনেকবার ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন, কিন্ত পাত্তা পাননি। ২০০০ সালে টুইঙ্কেলের ‘মেলা’ সিনেমা মুক্তি পাবার কথা, সেই সিনেমা নিয়ে টুইঙ্কেল ছিলেন দারুণ উচ্ছ্বসিত। কিন্ত অক্ষয় বলে দিলেন, ‘মেলা’ ফ্লপ হবে। দুজনে বাজী ধরলেন, মেলা সিনেমাটা হিট হলে অক্ষয় আর টুইঙ্কেলকে বিরক্ত করবেন না, আর যদি সিনেমাটা সত্যিই ফ্লপ হয়, টুইঙ্কেল রাজী হবেন অক্ষয়কে বিয়ে করতে। বিধাতার লিখন না যায় খন্ডণ, মেলা ঠিকই ফ্লপ হলো। দুজনের পারিবারিক সম্মতিতেই পরে তাঁদের বিয়ে হয়!

বলিউডে তাঁর আরেক নাম খিলাড়ি এটা সবাই জানে। খিলাড়ি নামের মোট আটটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন অক্ষয়। প্রতিবছর গড়ে তিন-চারটে সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি, কোন সিনেমাতেই চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ দিনের বেশী শুটিং টাইম রাখেন না। শুধু নিজের সিনেমা করেই ক্ষান্ত থাকেন না, অনুরোধে ঢেঁকি গিলে অতিথি চরিত্র সেজে হাজির হয়ে যান অন্যদের সিনেমাতেও! দ্যা কপিল শর্মা শো তে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি আশুতোষ গোয়াড়িকর বা সঞ্জয় লীলা বানশালীর মতো পরিচালকের সঙ্গে সিনেমা করেন না। উল্লেক্ষ্য, এদের দুজনেই নীরিক্ষাধর্মী কাজ করেন বেশী, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের নানা দিক উঠে আসে তাঁদের সিনেমায়। দুজনেই একেকটা সিনেমা বানাতে আট-বারোমাস পর্যন্তও সময় নেন! প্রশ্নটার জবাবে হাসতে হাসতে অক্ষয় সোজাসুজিই বলে দিয়েছিলেন, “উনারা যদি কখনও পঞ্চাশ দিনের মধ্যে শুটিং শেষ করার কথা ভাবেন, তাহলে নিশ্চয়ই কাজ করবো!” বেশী সিনেমায় অভিনয় করার কারণে অনেকে তাঁর সমালোচনা করেন, বলেন এত পরিমাণে কাজ করার ফলে স্ক্রিপ্ট বাছাইতে ভুল হবার সুযোগ বেশী থাকে, অভিনয়ের মানও ঠিক থাকছে না। এই অভিযোগগুলো আজ থেকে আট-দশ বছর আগে সত্যি ছিল। কিন্ত নিজের মেধা আর পরিশ্রমে অক্ষয় এখন সত্যিই অন্যরকম উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছেন। বছরে হয়তো তিনি চারটা সিনেমায় নায়ক হয়ে পর্দায় আসছেন, সবগুলো আলাদা আলাদা চরিত্রে, আলাদা গল্পে। আর গল্পগুলোও কি দুর্দান্ত! সমাজের গল্প, পরিচিত গণ্ডির ভেতরের গল্প, যে গল্পের সঙ্গে মানুষ নিজেকে সংযুক্ত করতে পারবে। গত দুই বছরের অক্ষয়কেই দেখুন, ২০১৬ শুরু করেছিলেন সত্যি ঘটনার ওপরে নির্মিত ‘এয়ারলিফট’ দিয়ে, দারুণ অভিনয় করেছেন সেখানে। আবার দুই মাস পরেই ‘হাউজফুল থ্রি’ এর মতো সম্পূর্ণ মাসালাধর্মী সিনেমা নিয়ে এসেছেন, দুই সিনেমার ধরণে আকাশ পাতাল তফাৎ! ‘ঢিশুমে’ সমকামী চরিত্রে অতিথি অভিনেতা হিসেবে হাজির হবার পরে বছরশেষে ‘রুস্তম’ নিয়ে জাদু দেখিয়েছেন। ‘রুস্তম’ অক্ষয়ের জীবনে অন্যরকম মাইলফলক, এই সিনেমার জন্যেই সেরা অভিনেতা হিসেবে অধরা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার ঘরে তুলেছেন তিনি।

বলিউডের এই মন্দার বাজারে সালমান শাহরুখদের ফ্যান-টিউবলাইট সব যখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, অক্ষয় তখন এগিয়ে চলেছেন দুর্দান্ত গতিতে। দর্শকের ভালোবাসা আর প্রযোজকের মুখের হাসি, অক্ষয় আদায় করে নিচ্ছেন দুটোই।

বছরপ্রতি তিন-চারটা সিনেমায় অভিনয় করা নিয়ে সুন্দর যুক্তিও দিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়- “একটা সময় ছিল যখন আমি টাকার জন্যে সিনেমা করতাম। সংসারে স্বচ্ছ্বলতা আনার জন্যে সেটা আমি করেছি, তখন আমার স্ক্রিপ্ট বাছাইয়ের সুযোগও ছিল না, যে যা বলেছে করে ফেলেছি। অনেকের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল, হয়তো তাদের কেউ স্ক্রিপ্ট নিয়ে এসেছে, আমি না পড়েই বলে দিয়েছি করবো। একটা সময়ে আমার আর্থিক প্রয়োজন মিটে গেল, কিন্ত এখনও কেন আমি তিন-চারটে সিনেমায় অভিনয় করি? বছরে দুইটা সিনেমা আমি করি অর্থের জন্যে, সেগুলো দিয়েই আমার পরিবারের ভরনপোষণ হয়। এর বাইরে একটা বা দুটো সিনেমার জন্যে আমি অপেক্ষা করি, দারুণ কোন গল্প, ভালো পরিচালক- এমন মিল পেলে আমি সেটায় হ্যাঁ বলে দেই। সিনেমাটা লাভজনক হবে কিনা, আমি পারিশ্রমিক পাবো কিনা সেসব নিয়ে ভাবি না। এই একটা বা দুইটা কাজ আমি করি নিজের জন্যে, নিজের খুশীর জন্যে। যতোক্ষণ আমার শরীর আর মন আমাকে সাপোর্ট দিচ্ছে, এটা আমি করে যাবো।”

অক্ষয় নিজের সুপারস্টার তকমা ঝেড়ে ফেলে অভিনেতা হবার দিকে মন দিয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। নিজের অভিনয়প্রতিভা নিয়ে করছেন নানারকমের পরীক্ষা নীরিক্ষা, চরিত্র আর গল্প নিয়েও গবেষণা করছেন, সেটা গল্প বাছাইতেই বোঝা যায়। রজনীকান্তের বিপরীতে ভিলেন হিসেবে হাজির হচ্ছেন দক্ষিনী ২.০ সিনেমায়, ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা হতে যাচ্ছে এটি। ক্যারিয়ারের সাফল্যের সূর্য গনগন করছে মাথার ওপরে, এমন সময়ে নায়কের আসন ছেড়ে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার দুঃসাহস। আর কেউ দেখাবে না, তিনি অক্ষয় কুমার বলেই পেরেছেন এটা।
তায়কোয়ান্দোতে অক্ষয় ‘ব্ল্যাকবেল্ট’ এটা অনেকেই জানেন। মার্শাল আর্ট তাঁর কৈশরের স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নপূরণে থাইল্যান্ড পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। রঙিন পর্দায় শুরুটাও তাঁর এই মার্শাল আর্ট দিয়েই হয়েছিল, তখনও তাঁকে নায়ক বানানোর কথা কেউ ভাবেওনি। মহেশ ভাটের ‘আজ’ সিনেমায় মার্শাল আর্ট ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে ছোট্ট একটা চরিত্র দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। নিজের সিনেমায় স্ট্যান্টম্যান ব্যবহার করতে পছন্দ করেন না অক্ষয়, বেশীরভাগ স্ট্যান্ট তাঁর নিজেরই করা। আর এসব করতে গিয়ে আহতও হয়েছেন বহুবার। ‘খিলাড়িও কা খিলাড়ি’ সিনেমায় রেসলিং সুপারস্টার আন্ডারটেকারকে খালিহাতে শূন্যে তুলতে গিয়ে প্রায় গলা ভাঙতে বসেছিলেন তিনি। এছাড়া হাত পা তো অজস্রবার ভেঙেছেন। নারীদের সেলফ ডিফেন্স শেখানোর চেষ্টা করছেন নিজের উদ্যোগে। এছাড়া বিরল একটা রেকর্ডের মালিক তিনি, অক্ষয় অভিনীত ‘চাঁদনী চক টু চায়না’ একমাত্র ভারতীয় সিনেমা, যেটির শুটিং হয়েছে চীনের প্রাচীরের ওপরে। এর আগে-পরে কোন ভারতীয় সিনেমা এখানে শুটিঙের অনুমতি আদায় করতে পারেনি।

মানুষটা কথাবার্তা কম বলেন, তবে শুটিং চলাকালে সেটের সবাইকে মাতিয়ে রাখেন অবশ্য। যে কারো বিপদে আপদে ছুটে যান সবার আগে। সেটে লাঞ্চের সময় খোঁজ নেন সবার খাওয়া ঠিকঠাক হয়েছে কিনা। পর্দায় তিনি দারুন অভিনেতা, লাখো মানুষের কাছে বিশাল সুপারস্টার। তবে তাঁর আরেকটা পরিচয় অনেকের অজানা, তিনি সহকর্মীদের জন্যে দারুণ একজন মেন্টরও। ক্যাটরিনা কাইফ আর জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজকে হিন্দী ভাষা শিখতে সাহায্য করেছিলেন তিনি, ‘রুস্তমে’ অভিনয় করা ২৯ বছর বয়েসী অভিনেত্রী ফারিনা ওয়াজের তো অক্ষয়ের একেবারে গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন শুটিঙের অল্প ক’দিনেই! তাঁর ভাষায়- অক্ষয়ই প্রথম আমাকে বলেছে আমার মধ্যে প্রতিভা আছে এবং ভাষা আর নাচে আমার আরো ভালো করা উচিত। এমনকি উনি আমাকে হিন্দি ভাষা শেখার জন্যে সেটে কয়েকজনের সঙ্গে আলাদা বসিয়ে দিতেন।”

বাইরে যাওয়া আসায় অক্ষয় ব্যবহার করেন হোন্ডা সিআরভি’র একটি কার, তাঁর মতে ভারতের রাস্তায় চালানোর মতো উপযুক্ত গাড়ি হোন্ডাই তৈরী করে। অথচ চাইলেই তিনি কয়েকশো বিএমডাব্লিউ কিনতে পারেন একদিনেই, বিশ্বের সর্বাধিক পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের তালিকায় তাঁর অবস্থান এখন দশে! অথচ খাবার খরচ বাদ দিয়ে মাসে দশ হাজার টাকা হাতখরচা করতেও তাঁর আপত্তি। ছেলে আরাভ স্কুলে যায় ছোট্ট একটা সেডানে চড়ে, অক্ষয়ের মতে- “ও বড় হয়ে নিজে কিছু করতে পারলে অবশ্যই এরচেয়ে ভালো গাড়ি কিনতে পারবে। ওদের জন্যে আমার যতোটুকু করা দরকার আমি করছি, ও এই বয়সে আমার চাইতে অনেক ভালো অবস্থায় আছে।”
সিনেমা জগত তাঁকে খ্যাতি দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, অচেনা এক তরুণ রাজীব ভাটিয়া থেকে সুপারস্টার অক্ষয় কুমার বানিয়েছে, এই জগতটার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাঁর। ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে শেফের চাকুরী থেকে আজকের এই আলো ঝলমলে জগতে দারুণ অবস্থান- অক্ষয়ের যাত্রাটা মোটেও সহজ কিছু ছিল না। কিন্ত অসম্ভবকে তিনি সম্ভবে পরিণত করেছেন মেধা, পরিশ্রম আর ধৈর্য্য দিয়ে। কাজকে ভালোবেসেছেন, সেটার ফলে সাফল্যও ধরা দিয়েছে হাতে।

নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা –

ব্যর্থতার গল্প আছে নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলারও । ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। একই সাথে দেশটিতে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতিও বলা হয় তাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সরকারের বর্ণবাদী নীতির বিপক্ষে সংগ্রাম এবং ত্যাগের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন নেলসন ম্যান্ডেলা।
আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শাসকদের আনুকূল্য পাওয়া অভিজাত শ্রেণীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়েন। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি’তে যোগ দেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি মার্কসবাদ দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। গোপনে দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি’কে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে ম্যান্ডেলা যুক্তি দেখান সশস্ত্র উপায়ে দাবি আদায় করতে হবে। এএনসি থেকেও এর বিরোধিতা করা হয়নি। ১৯৬২ সালে তাঁকে আটক করে সহিংসতা চালানোর অভিযোগে জেল দেয়া হয়। পরের বছর তাঁর সশস্ত্র গোষ্ঠীর আরও অনেকের সাথে তাঁকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় কাটাতে হলেও এ সময়টাতে ম্যান্ডেলার পরিচিতি বাড়তে তাকে। তাঁর প্রথম স্ত্রী দেশে-বিদেশে জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার ভেতরেই বিরোধীরা সংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। এমনকি একপর্যায়ে গৃহযুদ্ধের আশংকাও দেখা দিয়েছিল। এমন কঠিন অবস্থায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা পিছু হটে এবং ম্যান্ডেলাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়।
১৯৯৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ম্যান্ডেলা। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিশোধের পথে না হেঁটে সমঝোতার পথেই হেঁটেছিলেন তিনি আর নিজে মার্কসবাদী আদর্শে বিশ্বাসী হলেও সেধরনের সংস্কার আনার চেষ্টা করেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে ১৯৯৯ সালে অবসর নেন তিনি।
তাঁর বহু সম্মাননা আর পুরস্কারের মধ্যে নোবেল পুরস্কার অন্যতম। শান্তির পথে আলোচনার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার সমস্যার সমাধান আনার জন্য ১৯৯৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় তাঁকে। প্রবল রাজনৈতিক চাপ এবং জীবনের একটা দীর্ঘ অংশ জেলের ভেতরে কাটানোর পরও ভেংগে পরেননি তিনি । পরবর্তীতে তিনিই হয়ে ওঠেন দক্ষিন আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা
| ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর চূড়ান্ত সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

শাহরুখ খান –

ব্যর্থতার গল্প আছে শাহরুখ খান এরও | অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নপূরণ করতে মুম্বাই এসেছিলেন শাহরুখ খান। এর আগে দিল্লিতে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেছেন কিছুদিন। কিন্তু মুম্বাইতে তখন তার থাকার কোনো জায়গা ছিল না। সে সময় অভিনেতা বিবেক ভাসানীর সঙ্গে থেকেছেন কিছুদিন। পরিশ্রম, মেধা আর আত্মবিশ্বাসের দারুণ সমন্বয় ঘটিয়ে জীবনের বাজি জিতে নিয়েছেন এই বাজিগর। এখন তিনি বলিউডের বাদশাহ কিং খান। প্রথম চলচ্চিত্র ‘দিওয়ানা’ থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কোটি কোটি ভক্তকুলকে দিওয়ানা করে যাচ্ছেন এই ‘কিং অব রোমান্স’। প্রায় ৬০০ মিলিয়নের বেশি ডলারের মালিক শাহরুখ খান বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী অভিনেতা।
১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন শাহরুখ খান। তার বাবা ছিলেন পাঠান মুসলিম পরিবার বংশোদ্ভূত ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী তাজ মোহাম্মদ খান। মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন একজন সরকারি প্রকৌশলী, ইফতেখার আহমেদের মেয়ে। তাজ মোহাম্মদ খান এবং লতিফ ফাতিমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। শাহরুখ খানের বাবা ভারত ভাগের আগে বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ারের কিসসা কহানি বাজার থেকে দিল্লিতে চলে আসেন। তার মায়ের বাড়ি ছিল পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে। দিল্লির তালভার নার্সিং হোমে জন্মের পর কোনো এক নার্স নাকি বলেছিল ‘শিশুটি বড় হয়ে অনেক বিখ্যাত হবে।’
আর সেই শিশুটিই আজকের শাহরুখ খান। তার শৈশব কেটেছে দিল্লির রাজিন্দর নগরে। নিজের জীবনীতে সেই বাড়ির নম্বরটিও লিখেছেন তিনি, এফ-৪৪২। শাহরুখের বাবা এক সময় পরিবহন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আর মা ছিলেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ছোটবেলা থেকেই কিং খান ভীষণ মা ভক্ত ছেলে ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তার মা ব্যবসাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলেন। শাহরুখ বলেন, আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে তার মায়ের অনুপ্রেরণা। মায়ের কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্য বাবা-মাদের মতো কোনো কিছু শাহরুখের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেননি তার মা। শাহরুখ বলেন, কখনো আমার ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেননি মা। যখন আমি বলেছিলাম আমি অভিনয় করতে চাই, মা আমাকে নিষেধ করেননি। মায়ের মৃত্যু আমাকে শিখিয়েছে, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। অঝোরধারায় কেঁদেছিলাম তার মৃত্যুর পর, সব আশা-আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের সময়, যখন মা আমার কোলে মারা গেলেন। প্রায় সুস্থই হয়ে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু কী হলো, হঠাৎ করে চলে গেলেন। অনেক কিছু শিখেছি তার কাছ থেকে। যেমন ব্যয় কমিয়ে লাভ নেই, তার চেয়ে উপার্জন বাড়াও। তাই আমি দুই হাতে খরচ করি। আমি বিশ্বাস করি, মা আমাকে সারাক্ষণ দেখে রাখছেন।
ছোটবেলা থেকেই শাহরুখ ছিলেন খুব ফিটফাট। স্বাস্থ্য ও চুলের যত্নে ছিলেন বিশেষ মনোযোগী। তাকে ভর্তি করা হয়েছিল দিল্লির বিখ্যাত সেন্ট কলম্বিয়া স্কুলে। সেই স্কুলের ছাত্রদের মেনে চলতে হতো কঠোর নিয়মকানুন। স্কুলজীবনেই কিং খান তার চেয়ে বয়সে বড় এক আপুর প্রেমে পড়েছিলেন। শাহরুখ বেশ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তবে পড়ালেখায় তার মন একদমই বসত না। হিন্দিতে খুবই দুর্বল ছিলেন শাহরুখ। সব সময় তাই হিন্দিতে ফেল করতেন। একবার পরীক্ষার আগে তার মা উৎসাহ দিতে বললেন— এবার হিন্দিতে ভালো মার্ক পেতে পারলে তাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবেন। তারপরই পরীক্ষার আগে হিন্দি অধ্যয়নে লেগে গেলেন শাহরুখ এবং তখন খুবই ভালো ফলাফল করলেন। কথামতো তার মা ফাতিমা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি থিয়েটারে। আর এটাই প্রথম শাহরুখ খানের সিনেমা দেখা।
সেই থেকেই হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন আজকের এই সুপারস্টার। তার মা তাকে যদি সেদিন থিয়েটারে না নিয়ে যেতেন তাহলে হয়তো হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাস অন্যরকম হতো।
মানুষের বিপদে-আপদে যিনি সবার আগে এগিয়ে আসেন তিনিই তো সত্যিকারের নায়ক। বলিউড তারকারা তারকাসুলভ জীবনযাপন করেন। তাদের আশপাশে সাধারণ মানুষ বিচরণ করার সুযোগও পান না। আর এদিক থেকে শাহরুখ খান সত্যিকারে নায়ক। দুই হাতে নিজের উপার্জিত টাকা দান করেন তিনি। বিপদে পড়ে কেউ তার কাছে এসে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার দৃষ্টান্ত নেই।
মানবকল্যাণে দৃষ্টান্তমূলক অবদান এবং অভিনেতা হিসেবে বৈশ্বিক আবেদনের কারণে বলিউড তারকা শাহরুখ খান সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ডক্টরেট উপাধি প্রদান করেছে স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়। রাজকুমারী এলিজাবেথের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন শাহরুখ। বেডফোর্ডশায়ার, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেন শাহরুখ খান। অথচ শাহরুখ কিন্তু মাস্টার্সে ভর্তি হয়েও তা শেষ করতে পারেননি। অনার্স শেষে গণযোগাযোগ গবেষণা কেন্দ্রে মাস্টার্স পড়ার জন্য ভর্তি হন। চলচ্চিত্র এবং সাংবাদিকতা এ দুটি বিষয়ে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু প্রথম বর্ষ শেষেই ভাইস প্রিন্সিপালের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে মাস্টার্স কোর্স মাঝপথেই বন্ধ করে দেন। এর আগে স্কুলে সেরা ফলাফল করার পর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হ্যানসরাজ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকেই অর্থনীতিতে অনার্স পাস করেন শাহরুখ। এ সময় তিনি ক্রিকেট, ফুটবল এবং হকিতে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পিঠের ব্যথা এবং আথ্রাইটিসের সমস্যার কারণে খেলাধুলা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
অগণিত পুরস্কার ও সম্মাননা
শাহরুখ খানের পুরস্কারের সংখ্যা সঠিকভাবে তিনি নিজেও হয়তো বলতে পারবেন না। যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। জীবনে অর্জন করেছেন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অসংখ্য সম্মাননা। ক্যারিয়ারে মোট ৩৭৬ বার বিভিন্ন দিকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন শাহরুখ। যার মধ্যে ২৭৪ বারই শাহরুখ জিতেছেন কোনো না কোনো পুরস্কার। জাতীয় পর্যায়ে আইফা, রাজীব গান্ধী, বেস্ট ইন্ডিয়ান সিটিজেন ইত্যাদি সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হন। আর ২০০৫ সালে লাভ করেন সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’। আরও রয়েছে সর্বোচ্চ ১৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। এ ছাড়াও স্টার, জি সিনে, গিল্ড, আইফা, স্টারডাস্ট ইত্যাদি রেকর্ডসংখ্যক পুরস্কার অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘লিজিয়ান অব অনার’, মরক্কোর ‘এল’ এতোইলি ডি’অর’ সম্মাননা ইত্যাদি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন ফেলোশিপ। একমাত্র ভারতীয় নায়ক হিসেবে হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ‘শুভেচ্ছাদূত’।
১৯৮৮ সালে শাহরুখ খান জীবনে প্রথম ‘দিল দরিয়া’ নামক একটি টিভি ধারাবাহিকে কাজ করার চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু কাজ শুরু হতে বিলম্ব হচ্ছিল তখন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ‘ফৌজি’ নামক টিভি সিরিয়ালে তার অভিনয় জীবনের শুরু হয়। এই নাটকে তিনি ‘অভিমান্যু রায়’ নামের এক আর্মি ক্যাডেট চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন। পরে তিনি কাজ করেন ‘সার্কাস’ নামের আরেকটি ধারাবাহিকে। সিনেমায় কাজ করার প্রস্তাব এলেও তখনো তিনি নিজেকে উপযুক্ত মনে করতেন না। সার্কাসের পরেই তিনি ‘উমিদ’ নামে আরেকটি ধারাবাহিকে পার্শ্বচরিত্রে কাজ করেন। দিওয়ানা (১৯৯২) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন। তার বিপরীতে ছিলেন দিব্যা ভারতী। ছবিটি ব্যবসা সফল হয় এবং তিনি বলিউডে নিজের অবস্থান তৈরি তরতে সক্ষম হন।
একই বছরে তিনি আরও কিছু চলচ্চিত্র যেমন চমৎকার, বিতর্কিত আর্ট ফিল্ম মায়া মেমসাহেবে অভিনয় করেন। ১৯৯৩ সালে বাজিগর ও ডর ছবিতে খলচরিত্রে অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পেয়ে যান শাহরুখ খান। ডর চলচ্চিত্রটি খুব সাফল্য লাভ করেছিল। বাজিগর ছবির জন্য তিনি তার ক্যারিয়ারের প্রথম ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫ সাল ছিল শাহরুখ খানের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বলিউডের নতুন ইতিহাস গড়ার একটি বছর। সেই বছর মুক্তি পায় শাহরুখ-কাজল জুটির ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’। এটি বক্স অফিসের আগের সব রেকর্ড ভাঙে, যার সব কৃতিত্ব পান শাহরুখ খান। চলচ্চিত্রটি ভারতের সর্বাধিকবার প্রচারিত চলচ্চিত্র হিসেবে নতুন রেকর্ড করেছে। এর আগে অমিতাভ বচ্চনের ‘শোলে’র ২৬০ সপ্তাহ চলার রেকর্ডটি ভেঙে দেয়। চলচ্চিত্রটিতে শাহরুখ খান অভিনয় করেন ‘রাজ’ আর কাজল অভিনয় করেন ‘সিমরান’ চরিত্রে। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছবিটি বক্স অফিস মাত করে।
একদিকে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল, অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ১৯ মিলিয়ন ডলার তথা ১২২ কোটি ভারতীয় রুপি আয় করে ছবিটি তখনো পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আয় করা ভারতীয় ছবি হওয়ার গৌরব লাভ করে। ‘মারাঠা মন্দির’ নামক সিনেম হলে একটানা ১০০০ সপ্তাহ পর্যন্ত চালানো হয়েছিলো এই ছবিটি ! বলা হয়ে থাকে আদিত্য চোপড়া পরিচালিত এই ছবিটিই আসলে শাহরুখ খানকে ‘রোমান্টিক হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ছবিটি মোট দশটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছিল, ২০১৫ সালে চলচ্চিত্রটির ২০ বছর পূর্তি পালিত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটিই শাহরুখ খানকে ‘কিং অব রোমান্স’ উপাধিতে পরিচিত করে তোলে। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ এর ব্যাপক সাফল্যের পর এই ‘কিং অব রোমান্স’ একে একে উপহার দিতে থাকেন বক্স অফিস কাঁপানো রোমান্টিক ঘরানার সব চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে দিল তো পাগল হ্যায় (১৯৯৭), কুছ কুছ হোতা হ্যায় (১৯৯৮), মোহাব্বতে (২০০০), কাভি খুশি কাভি গম (২০০১), কাল হো না হো (২০০৩) এবং ভীর-জারা (২০০৪), দেবদাস (২০০২) ইত্যাদি।
এরপর ‘ডন’ সিরিজ এর প্রথম চলচিত্র মুক্তি পাওয়ার পর শাহরুখ খান ‘বলিউড কিং’ উপাধি পান। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে খ্যাত হলেও শাহরুখ খান অভিনীত চরিত্রগুলোতে দেখা যায় বিভিন্ন চরিত্রের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। ডর কিংবা বাজিগরে দেখা যায় নির্দয় এক শাহরুখ খানকে। অন্যদিকে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’তে চমৎকার এক রোমান্টিক যুবক। আবার কাল হো না হো কিংবা দেবদাসে এক ব্যর্থ প্রেমিকের উপাখ্যান আমরা দেখতে পাই। কিন্তু অ্যাকশন হিরো হিসেবেও শাহরুখ নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ডন সিরিজ, যাব তাক হেয় জান, শক্তি-দ্য পাওয়ার, ম্যায় হু না-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোতে দেখা মেলে অ্যাকশন হিরো শাহরুখ খানের।
এত ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র কিন্তু অসাধারণ নৈপুণ্যে তা পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি। এটা শুধু শাহরুখ খানের দ্বারাই সম্ভব। বর্তমানে সারা বিশ্বে বলিউডের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের মধ্যে শাহরুখ খান অন্যতম একজন। শাহরুখ খান অভিনীত হে রাম, দেবদাস এবং পেহেলি চলচ্চিত্রগুলো ভারত থেকে অস্কারে পাঠানো হয়েছিল। লন্ডনের বিখ্যাত মাদাম তুসোর জাদুঘরে শাহরুখ খানের মূর্তি রয়েছে। শাহরুখ-কাজল জুটিকে বলিউডের অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে বিবেচনা হয়। ২৫ বছরের বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে শাহরুখ খান ভারতের শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম উচ্চতায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
ধনসম্পদের দিক থেকেও সত্যিকারের রাজা-বাদশাহর থেকে শাহরুখ খান কম কিছু নন।
২০১৪ সালের জরিপ সংস্থা ওয়েলথ এক্সের পরিচালিত বিশ্বের সেরা ধনী অভিনেতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন শাহরুখ খান। আর এ বছর তিনি রয়েছেন তৃতীয় অবস্থানে। এই তালিকায় হলিউড-বলিউড মিলিয়ে বিশ্বের তাবৎ অভিনেতাদের পেছনে ফেলে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন কিং খান শাহরুখ। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদের মালিক তিনি। আর এ অর্থ তিনি কেবল অভিনয়ের বলেই উপার্জন করেননি। অভিনয় ছাড়াও আরও ৯টি উপায়ে অর্থ উপার্জন করেন শাহরুখ। নায়ক থেকে প্রযোজক, অতঃপর পরিবেশক। আবার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক শাহরুখ। কোটি কোটি রুপির ব্যবসা কিং খানের এই কেকেআর-এর মাধ্যমে। সিনেমা তৈরির থেকে বর্তমানে এর প্রচারের পেছনে প্রযোজকদের বরাদ্দ থাকে বেশি। তাই এখান থেকে শাহরুখ অর্জন করছেন প্রচুর অর্থ। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ চলচ্চিত্রের প্রচারে অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করে অর্থ আয়ের নতুন এক ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছিলেন শাহরুখ খান। চলচ্চিত্রটির কলাকুশলী দীপিকা পাড়ুকোন, অভিষেক বচ্চন আর বোমান ইরানিদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী ‘স্ল্যাম! দ্য ট্যুর’ নামের কনসার্টের আয়োজন করেন শাহরুখ খান। বিশ্বের বড় বড় শহরে প্রতিটি কনসার্ট থেকে শাহরুখের আয় ছিল ৭ কোটি রুপির বেশি।
আর বিজ্ঞাপনের বাজারে একক রাজত্ব শাহরুখ খানের। সেটা দিন দিন আরও বাড়ছেই। টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের শতকরা ছয় ভাগ শেয়ার তার একাই। নকিয়া, পেপসি, ট্যাগ হিউয়ের, হিউন্দাই, ডিস টিভি, ডে’কর, নেরোলাক, লাক্স-এর মতো আরও অসংখ্য পণ্যের মডেল শাহরুখ খান। প্রতি বছর টিভি বিজ্ঞাপন থেকে তার বার্ষিক আয় প্রায় দেড়শ মিলিয়ন ডলার। ভারতের সবচেয়ে বেশি ব্র্যান্ড ভ্যালু তারকা শাহরুখ খান।
স্যাটেলাইট স্বত্ব বিক্রি থেকেও প্রচুর উপার্জন শাহরুখ খানের। তার চলচ্চিত্রগুলোর স্যাটেলাইট স্বত্ব চড়া দামে বিক্রি করেন তিনি। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-এর মতো ব্লকবাস্টার হিট চলচ্চিত্রের স্বত্ব তিনি ৬৮ কোটি রুপিতে বিক্রি করেছিলেন জি সিনেমার কাছে। শর্ত ছিল চলচ্চিত্রটি যদি ১০০ কোটির বেশি আয় করে, তবে আরও বেশি অর্থ জি সিনেমাকে দিতে হবে। হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন শর্তে স্যাটেলাইট স্বত্ব বিক্রির ঘটনা ছিল এটাই প্রথম।
চলচ্চিত্রের লভ্যাংশের অংশীদারিত্ব থেকেও অনেক টাকা আয় করেন শাহরুখ। এই প্রথার সূচনাকারীদের একজন হলেন শাহরুখ।
অভিনব ব্যবসায়িক কৌশল ব্যবহার করতে দেখা যায় শাহরুখকে। প্রতিবারই চলচ্চিত্র মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন কৌশলে ব্যবসার গতি বাড়িয়ে চলেন শাহরুখ। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ মুক্তির পর দিল্লিতে দুটি টিকিট কিনলে একটি টিকিট বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ওদিকে টিকেটপ্রতি দাম মাত্র দশ শতাংশ বাড়িয়ে বিশাল অঙ্কের লাভ করেছিলেন তিনি। এ ছাড়াও কিডজেনিয়া নামের বিশ্বব্যাপী সমাদৃত শিশুদের জন্য গড়ে তোলা এক ইনডোর চেইন থিম পার্কের ভারতীয় অংশীদার ইমাজিনেশন এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডিয়াতেও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন শাহরুখ। বিয়ের আসরের নাচিয়ে হিসেবে সুনাম রয়েছে তার। চড়া পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিয়েতে নাচেন শাহরুখ খান।
আর বিয়েতে কেবল নিজের উপস্থিতির জন্য ১৫ হাজার ডলার নিয়ে থাকেন তিনি। আর তার পুরো একটি নাচের জন্য আট কোটি রুপির বিনিময়ে চুক্তিতে সই করেন। অনেক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ বলেছেন, বিয়ে বাড়িতে নাচের ক্ষেত্রে নিজের একাধিপত্যের বিষয়টা উপভোগই করেন তিনি। কারণ, শারীরিক অসুস্থতার জন্য নাচানাচির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে সালমান খানের। ওদিকে সাইফ আলী খান এবং আমির খান বিয়েতে কখনোই নাচে না। তাই এদিক থেকে শাহরুখ খান নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০১২ সালে শুধু এই খাত থেকেই বছরে ৮০ কোটি রুপি আয় করেছিলেন শাহরুখ।
প্রচুর অর্থবিত্তের পাশাপাশি অত্যন্ত জনপ্রিয় শাহরুখ খান বলেন, ‘জীবনটা আসলে কতগুলো অর্জন, সাফল্য, যোগ্যতা আর পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনকে জানো, স্বপ্ন দেখো; ব্যর্থ হলে ঘুরে দাঁড়াও। তোমার যা আছে তার উপযুক্ত মূল্য দিতে শেখো। লোকের কথায় কান দিয়ো না আর ব্যর্থতাকে ভুলে যেয়ো না। নিষ্ঠুর হলেও সেই প্রকৃত বন্ধু।’ ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে আজ তিনি পৃথিবীর সফল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ।

আসুন এবার জেনে নেই বাংলাদেশি কয়েকজন বিখ্যাত ব্যাক্তির সফলতা ও ব্যর্থতার গল্প

কাজী নজরুল ইসলাম –

দু:খে দু:খে জর্জরিত তার জীবন । ছোটবেলা থেকেই লোকে তাকে ডাকতো দুখু মিয়া বলে । মাত্র নয় বছর বয়সেই বাবা মারা যায় । অভাবের সংসারে অভাব আরো জেকে বসে । ফলে জীবিকার সন্ধানে মাত্র দশ বছর বয়সেই কাজে নেমে পড়েন । কাজ করেছেন হোটেল, লেটো গানের দল, সেনাবাহিনী সহ বিভিন্ন জায়গায় । সবসময় ছিলেন শাষক গোষ্ঠির চোখের কাটা । জেলও খাটতে হয়েছে বহুদিন । তার অনেক সাহিত্যকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষিত করা হয়েছিলো । তবে পরবর্তিতে তিনিই হয়ে ওঠেন মানুষের চোখের মনি । অর্জন করেন একটি দেশের জাতীয় কবি হওয়ার গৌরব ! তিনি হলেন বিদ্রোহি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানায় অবস্থিত। পিতামহ কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয়া পত্নী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম। তারা ছিলেন তিন ভাই এবং বোন। সবার বড় কাজী সাহেবজান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, বোন উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। তিনি স্থানীয় মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম , দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে যখন তার বাবা মারা যান তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেননা। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল) দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবং আরবি, ফারসি ও উর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গান রচনা করতেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯২২ সালে বিজলী কবিতায় প্রকাশিত হওয়া মাত্রই জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালী মানসিকতায় কবিতাটি “চির উন্নত শির” বিরাজমান। বল বীর -বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর -বল মহা বিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’ ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর-আমি চির উন্নত শির ! যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্‌ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্‌। প্রমীলা দেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে পরিণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল। তবে এর আগে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথে। বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পরে কাবিনের নজরুলের ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং বাসর সম্পন্ন হবার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলের পরিচর্যা করেন। এক পর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৪২ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েস। এতে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তার অসুস্থতা সম্বন্ধে সুষ্পষ্টরুপে জানা যায় ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে।১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এরপর নজরুল পরিবার ভারতে নিভৃত সময় কাটাতে থাকে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তারা নিভৃতে ছিলেন। ১৯৫২ সালে কবি ও কবিপত্নীকে রাঁচির এক মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।এরপর ১৯৫৩ সালের মে মাসে নজরুল ও প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন পাঠানো হয়। মে ১০ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশ্যে হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন ছাড়েন। লন্ডন পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। অবশেষে ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবি তার একটি কবিতায় বলেছিলেন: “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই, যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”এই কবিতায় তার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। তার এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তার সমাধি রচিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) ২০০৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক সরকারী সরকারী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কবির জন্মস্থান চুরুলিয়ায় নজরুল অ্যাকাডেমি ও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমী, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মূল শহরের সংযোগকারী প্রধান রাস্তাটি কবির নামে উৎসর্গ করে কাজী নজরুল ইসলাম সরণি করা হয়। এছাড়াও কলকাতা মেট্রোর গড়িয়া বাজার স্টেশনটিকে কবির সম্মানে কবি নজরুল নামে উৎসর্গিত করা হয়েছে |

বেবি হাসান –

ঘটনাটা ৩১ বছর আগের। এক তরুণী জীবিকার তাগিদে কাজ নেন পোশাক কারখানায়। মাননিয়ন্ত্রণকর্মী হিসেবে ৮০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু। কাজে যোগ দিয়ে কিছু সময় যেতেই নিজের ভেতরই যেন পরিবর্তনের ডাক পেলেন—এভাবে হবে না। এগোতে হলে শিখতে হবে মেশিনের কাজ। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ধরলেন মেশিন। কাজের দক্ষতায় পেতে থাকেন পদোন্নতি। এবার সচল হলো স্বপ্নও। পোক্ত হয়ে একসময় কাজ ছেড়ে নিজেই গড়লেন প্রতিষ্ঠান। শূন্য হাতে শুরু করে তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। তাঁর নাম বেবি হাসান। বিএস অ্যাপারেল নামের একটি বায়িং হাউসের কর্ণধার তিনি।নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন হয়েছেন বেবি হাসান। তাঁর অধীনেই কাজ করছেন প্রায় অর্ধশত কর্মী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানির কাজ করে তাঁর প্রতিষ্ঠান। বছরে লেনদেন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।সফল ব্যবসায়ী হবেন, এমন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে কর্মজীবন শুরু করেননি বেবি। অনেকের মতো তাঁরও শুরুটা জীবিকার তাগিদেই। এসএসসি পাস করার পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে ১৯৮১ সালে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। বিয়ের পরবর্তী বছর জন্ম নেয় কন্যাসন্তান। স্বামীর আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তাই সংসারে কিছুটা স্বস্তি আনতে নিজেই চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে পরিবারের কেউ উৎসাহ না দেখালেও পরে অবশ্য মেনে নিয়েছেন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পোশাক কারখানায় কাজ করেন বেবি। একসময় উৎপাদন পরিচালকের দায়িত্বও পান।সে সময়গুলোর কথা উঠতেই বেবি হাসানের চেহারায় দৃঢ়তা। বললেন, ‘দিনে ১৪ ঘণ্টা করে কাজ করতাম। সকাল আটটায় কাজ শুরু হতো, ফিরতাম রাত ১০টার দিকে। কোনো দিন কাজে অবহেলা করিনি। শুরুতে অনেক দূর যেতে হবে এমন লক্ষ্য ছিল না, তবে যখন কাজটাকে ভালোবেসে ফেললাম, তখন স্থির করলাম একটা পর্যায়ে যেতে হবে।’ নব্বইয়ে দশকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠান বদলে একটি বায়িং হাউসে যোগ দেন বেবি। পাশাপাশি টুকটাক এ–সংক্রান্ত ব্যবসাও শুরু করেন। ২০০০ সালে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের একটি সংগঠনের সদস্য হন তিনি। হাতে তেমন নগদ টাকা ছিল না, তাই দ্বারস্থ হন ব্যাংকের। দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে হালিশহর কে ব্লকে ‘বিতনু’ নামের একটি বুটিকের শোরুম খোলেন। ওই বছরই চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইম্যান এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন (উই) । ওই সংগঠনের সদস্য হন বেবি। ২০০০ সালের শেষের দিকে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ জন অংশ নেন কলকাতার একটি কুটিরশিল্প মেলায়। সেখানে গিয়েই চোখ খুলে যায় তাঁর। তিনি বলেন, ‘ওই মেলায় গিয়েই ব্যবসা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। কী করে জানি সেদিনই ব্যবসার পোকা ঢুকে যায় মাথায়। মনস্থির করি, আমাকে ব্যবসায় সফল হতে হবে।’ ২০০২ সালে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি বায়িং হাউস দাঁড় করানো শুরু করেন। এরপর ২০০৯ সালে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন বিএস অ্যাপারেল নামের পৃথক বায়িং হাউস। বছর বছর এই প্রতিষ্ঠানের কলেবর বাড়ছে। মা বেবি হাসানের সঙ্গে ছেলে সালাহউদ্দিন চৌধুরীও সম্প্রতি ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন।প্রায় শূন্য থেকে আজকের অবস্থানে আসার কৃতিত্বের ভাগ বেবি হাসান দিতে চান আরও দুজন নারীকে। একজন তাঁর মা ফরিদা খাতুন, অন্যজন ব্যবসায়ী নেতা মনোয়ারা হাকিম আলী। ১৯৯৮ সালে অসুস্থতায় ভুগে বেবি হাসানের মা মারা যান। মেয়ের চূড়ান্ত সাফল্য মা দেখে যেতে পারেননি, এই কষ্টই এখন তাড়িয়ে বেড়ায় তাঁকে। বেবি হাসানের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে হলেও তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে। চাকরির পাশাপাশি সংসারের দেখভাল করতে হয়েছে। ফলে অবসর বলে কিছু ছিল না। কিন্তু তাতে দুঃখ নেই বেবির। তিনি বলেন, চাকরি বা ব্যবসা মেয়েদের জন্য খুব কঠিন, এমনটি কখনো মনে হয়নি। চেষ্টা থাকলে যেকোনো নারীই ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারবেন।’ এসব কথা যখন বলছিলেন, তখন বেবির মুখে সাফল্যর তৃপ্তির হাসি। বললেন, ‘পরিচিত কোনো মেয়ে যখন চাকরি করার কথা বলেন, আমি তাঁদের উৎসাহ দিই ব্যবসা করো। কারণ, আমাদের একটাই লক্ষ্য, চাকরি করব না, চাকরি দেব |

স্যামসন এইচ চৌধুরি –

ব্যর্থতার গল্প আছে স্যামসন এইচ চৌধুরীরও ।সফল ব্যাবসায়ী উদ্দ্যোক্তা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরী। যিনি একটি ফার্মেসির দোকানি থেকে হয়েছেন স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার ! বাংলাদেশের ব্যবসা অঙ্গনের অন্যতম পুরোধা স্যামসন এইচ চৌধুরীর ব্যবসাজীবন শুরু হয়েছিল খুব স্বল্প পরিসরে। স্যামসনের বাবা ছিলেন হাসপাতালের আউটডোর ডিসপেনসারির মেডিক্যাল অফিসার। সে সূত্রে ওষুধ-পত্রের সঙ্গে জানাশোনা শৈশব থেকেই। তাই যৌবনে ওষুধশিল্পে মনোনিবেশ এবং ক্রমে এ শিল্পসহ অন্যান্য ব্যবসায়ে মহীরুহ হয়ে ওঠার বীজ তার পিতার পেশাসূত্রেই তার মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল বলা যায়।
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই কাউকে কিছু না বলে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি ছাড়েন স্যামসন। প্রথমে কলকাতার এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন তিনি। পরে সেখান থেকে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন। যান মুম্বাই। চাকরির সন্ধানে ঘুরতে থাকেন বন্দরে বন্দরে। এরপর সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় নৌবাহিনীতে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান। শুধু তাই নয়, কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণও হন।কিশোর স্যামসনের সব সময় ঝোঁক ছিল নতুন প্রযুক্তির প্রতি। নেভিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাকে সিগন্যাল বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু তাতে কোনোভাবেই সাড়া দিলেন না স্যামসন। উল্টো তিনি ‘রাডার অপারেটর’ হওয়ার জন্য আবেদন করলেন। সেই সময়ে নেভিতে রাডার একেবারেই নতুন ও আকর্ষণীয় একটি বিভাগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে গোপনে কাজ করত এই বিভাগ। যুদ্ধের সময় কীভাবে শত্রু জাহাজগুলো শনাক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করা হয়, তা জানার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ছিল স্যামসন চৌধুরীর। একসময় এই অদম্য আগ্রহই তার জন্য কাল হয়ে উঠল। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি কোনোভাবেই রাডার বিভাগ ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে চাইলেন না। তার এই একরোখা জেদের কারণে তাকে অবশেষে জেলে ঢুকতে হলো। সেবার চার দিন জেলে থাকতে হয়েছিল তাকে। সেখানে প্রতিদিন সকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে কিশোর স্যামসনকে জিজ্ঞাসা করতেন তার মন ঘুরেছে কিনা। কিন্তু না; কোনোভাবেই তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে একটুও নড়লেন না। অবশেষে পঞ্চম দিনে কর্মকর্তারা তার অদম্য ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করে তাকে রাডার বিভাগে নিয়োগ দিলেন।স্যামসন চৌধুরী সব মিলিয়ে তিন বছর রয়েল ইন্ডিয়ান নেভিতে চাকরি করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে তিনি ও তার কিছু সহকর্মী মিলে মাদ্রাজের বিশাখাপত্তন বন্দরে ফিরে আসেন। সেখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নৌ-বিদ্রোহে অংশ নেন। ফের জেলে যান। পাঁচ দিন জেলে থাকার পর বিদ্রোহী নৌ-সেনাদের বাহিনীর সদর দফতর তালোয়ারে পাঠানো হয়। তবে সেখানে তাদের বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়। এরপর তাদের প্রশ্ন করা হয়— তারা এখানে সেনা হিসেবে চাকরি চালিয়ে যেতে চায় নাকি চাকরি ছেড়ে দিতে চায়। স্যামসন চৌধুরী নিজের অবস্থানে অটল থেকে সেখানেই থেকে যেতে চান। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ‘ভারমুক্ত’র সার্টিফিকেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে সরকারের অন্য কোনো প্রশাসনিক দফতর বা আইনশৃঙ্খলা বিভাগে নিয়োগের সুপারিশ করে নৌবাহিনী। নৌ-বাহিনী ছেড়ে ১৯৪৭-এ বাড়ি ফিরে এলেন স্যামসন চৌধুরী। পাবনায় ফিরে নতুন করে সরকারের ডাক বিভাগে যোগদান করলেন তিনি। ওই বছর ৬ আগস্ট ১৫ বছরের কিশোরী অনীতা চৌধুরীকে বিয়ে করেন স্যামসন। স্যামসন এইচ চৌধুরীর তিন ছেলে— অঞ্জন চৌধুরী, তপন চৌধুরী ও স্যামুয়েল চৌধুরী। একমাত্র মেয়ের নাম রত্না পাত্র। পোস্ট অফিসে চাকরির সময় ট্রেড ইউনিয়নে জড়িয়ে পড়েন চৌধুরী সাহেব। একবার এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে বাগ-বিতণ্ডার জের ধরে শাস্তিস্বরূপ অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারসহ তাকে বদলি করে দেওয়া হলো। বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারেননি স্যামসন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। ফিরে আসেন বাড়িতে । নিজ গ্রাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পাবনার আতাইকুলায় ফিরে এসে সামান্য ফার্মেসির দোকোনে শুরু করেন জীবিকার লড়াই। সেটা ১৯৫২ সালের ঘটনা।
এরপর ১৯৫৮ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে উদ্যমী স্বভাবের স্বপ্নবাজ যুবক স্যামসন চৌধুরী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ধীরেন দত্তের কাছে গেলেন একটি আবদার নিয়ে। চাইলেন ওষুধ কারখানা স্থাপনের লাইসেন্স এবং পেয়েও গেলেন। এরপর ছেলেবেলার চার বন্ধু প্রত্যেকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়ে গড়লেন মোট ৮০ হাজার টাকার ফান্ড। সেই পুঁজিতে পাবনায় ওষুধ কারখানা স্থাপন করলেন চার বন্ধু। নাম স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। চারজন অংশীদারের সমান মালিকানায় শুরু হয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মযজ্ঞ। স্কয়ারের নামকরণ প্রসঙ্গে স্যামসন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘এটি চার বন্ধুর প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া আমাদের চার হাত সমান। এর লোগোও তাই বর্গাকৃতির।’
তবে কারখানা প্রতিষ্ঠিত হলেও তখন স্কয়ার কোম্পানিকে কেউ চিনতো না । কোনো ঔষুধের দেকানেই তাদের ঔষধ রাখতে চাইতো না । সারাদিন দোকানে দোকানে ঘুরতেন বিক্রির জন্য । কেউ কেউ আবার বাকি চাইতো । নতুন এবং ছোট কোম্পানি হয়েও বাকি না দেওয়াতে অনেক দোকানদার রাগ করে দোকান থেকে বের করে দিতো । কেউ কেউ আবার অপমানও করতো । তবে ধৈর্য হারা হননি তিনি । একসময় তার ধৈর্য ও একাগ্রতা দেখে কোন কোন দোকানদার তার প্রতিষ্ঠানের ঔষধ রাখতে রাজি হন । ঔষধ বিক্রির পরে সেগুলোর ভালো ফালাফল দেখে পরবর্তিতে অন্যরাও তার কোম্পানির ঔষধ রাখা শুরু করেন । কারন ঔষধগুলোর গুনগত মান ছিলো খুবই ভালো । বর্তমানে
ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের কাছে স্যমাসন এইচ চৌধুরী এক আইকন। ছোট্ট ওষুধ কারখানা স্কয়ারকে তিনি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে স্কয়ার এর পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানির তালিকায়ও শীর্ষে উঠে এসেছে। ১৯৫৮ সালের সেই ছোট উদ্যোগ বর্তমানে বিশাল গ্রুপে পরিণত। ২৭ হাজার কর্মীর এই বিশাল পরিবারের বার্ষিক আয় দুই হাজার পাঁচশো কোটি টাকারও বেশি । ‘স্কয়ার’ শুধু ওষুধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ, কনজ্যুমার প্রডাক্টস, স্বাস্থ্যসেবা, মিডিয়া, এমনকি বাড়ির রান্নাঘরেও সগৌরব উপস্থিতি স্কয়ারের। মিডিয়ায় উপস্থিতি মাছরাঙা টিভির মাধ্যমে। ব্যবসা মানেই মুনাফা- এ ধারণাকে অনেকটাই ভুল প্রমাণ করেছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে স্কয়ার গ্রুপ। এ কথার সঙ্গে দ্বিমত তার চরম প্রতিপক্ষও করবেন না। ‘আমার কাছে কোয়ালিটিই সবার আগে। সব পর্যায়েই আমরা কোয়ালিটি নিশ্চিত করি’ বলতেন কোয়ালিটিম্যান স্যামসন চৌধুরী। তার প্রমাণও রেখে গেছেন স্কয়ার ব্রান্ডিংয়ের সব পণ্য আর সেবাতে এই কর্মবীর।ব্যবসা ও বিপণনে সাফল্যের জন্য কোনও বিশেষ কৌশল প্রসঙ্গে স্যামসন চৌধুরী বলতেন, ‘আমি সব সময় স্বপ্ন দেখেছি বিশ্বের নামিদামি ওষুধ কোম্পানির আদলে গড়ে উঠুক স্কয়ার; যেখানে নিয়মিত গবেষণা হবে, উন্নয়ন হবে, কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ থাকবে সব পর্যায়ে। এখানে প্রায় ৮০ ভাগই হোয়াইট-কলার জব। তাঁদের সবাই গুণ-মান বজায় রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট, প্রশিক্ষিত। আমরা একটা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছি। আমাদের ওষুধের কোয়ালিটি আজ দেশে-বিদেশে স্বীকৃত। ডাক্তাররা অবিচল আস্থার সঙ্গে আমাদের ওষুধ প্রয়োগ করেন। পৃথিবীর ৫০টি দেশে আমাদের ওষুধ যাচ্ছে। ’ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কম্পানিগুলোর এক ধরনের যথেচ্ছচার দেখা যায়। এ ব্যাপারে স্কয়ার ফার্মার কর্ণধার বলেন, মানসম্পন্ন ওষুধের দাম নির্ধারণের ব্যাপারে সরকারের কার্যকর নীতিমালা না থাকায় আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। মাছের বাজারে তাজা মাছ আর পচা-বাসি মাছের দাম এক হয় না। ওষুধ কেনার সময় সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই শিল্পপতি। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সভাপতি, মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্টেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস’র (এমআইডিএএস) চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।তিনি ঢাকা ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান ছিলেন ২০০৪-২০০৭ সাল পর্যন্ত। শাহবাজপুর টি এস্টেট ও মিউচুয়াল স্ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। ২০০৯-১০ অর্থ বছরে সেরা করদাতা নির্বাচিত হয়েছেন স্কয়ার গ্রুপের উদ্যোক্তা স্যামসন চৌধুরী। তার সাথে ছিলেন তাঁর তিন ছেলে তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী ও স্যামুয়েল চৌধুরী। স্যামসন চৌধুরী ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যক্তি করদাতা হিসেবে আয়কর দিয়েছেন এক কোটি ৬৩ লাখ ২২ হাজার ১৮১ টাকা। তাঁর ছেলে তপন চৌধুরী আয়কর দিয়েছেন এক কোটি তিন লাখ ৪৩ হাজার ৩৫ টাকা। অঞ্জন চৌধুরী আয়কর দিয়েছেন ৭৭ লাখ ১২ হাজার ৮৩২ টাকা। স্যামুয়েল এস চৌধুরী ৭৬ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮৪ টাকা আয়কর দিয়েছেন।নিজের শখ-আহ্লাদ লালন করতেন স্যামসন চৌধুরী। ছবি তুলতেন অনেক আগ থেকে। ১০-১২টি ক্যামেরা ছিল তার। কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে ছবি তোলার জন্য বের হতেন তিনি। ছবি তুলেছেন ঢাকা শহরের পুরনো ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলোর ।

আকিজ উদ্দীন –

আকিজ উদ্দীন

ব্যর্থতার গল্প পাল্টিয়ে যারা সফলতার গল্প রচনা করছেন তাদের মধ্যে আকিজ উদ্দীন অন্যতম | দারিদ্রতার কারনে লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি । ফেরিওয়ালা হয়ে ফল বিক্রি করেছেন রাস্তায় আর স্টেশনে । মাত্র ১৬ টাকা পুঁজি নিয়ে ১৩ বছর বয়সে গলায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে কমলালেবুর ফেরিওয়ালা হিসেবে ব্যবসা শুরু। এরপর ১৯৫২ সালে বিড়ির ব্যবসার মধ্য দিয়ে ব্যবসার গতি-প্রকৃতি একেবারে জাদুর মতো বদলে যেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে যে ব্যবসায় হাত দিয়েছেন, সেখানেই সাফল্য পেয়েছেন তিনি। একে একে তিনি দেশের উল্লেখযোগ্য ২৩টি শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসার জাদুকরে পরিণত হন। এতক্ষণ বলছিলাম আকিজ গ্রুপ ও আদ্-দ্বীনের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দীনের জীবনের গল্প। খুলনার ফুলতলা থানার মধ্যডাঙ্গা গ্রামে ১৯২৯ সালে জন্ম নেন শেখ আকিজ উদ্দীন। শৈশব কেটেছে কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে। স্বপ্ন দেখতেন দারিদ্র্য জয় করে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। কিন্তু জীবন সংগ্রামের শুরুতে পদে পদে বাধার মুখে পড়েন। সেই বাধা পেরোতে শেখ আকিজ উদ্দীনের সম্বল ছিল সাহস, সততা আর কঠোর পরিশ্রম। এই তিনটি জিনিসকে পুঁজি করেই শুরু হয় উদ্যোক্তা আকিজ উদ্দীনের উত্থান পর্ব। তিনি দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে লাখো মানুষের নিয়োগকর্তা হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। আকিজ উদ্দীনের বাবা শেখ মফিজ উদ্দিন ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসয়ী। তিনি খুলনার ফুলতলা থানার মধ্যডাঙ্গা গ্রামে ফল ও ফসলের মৌসুমি ব্যবসা করতেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মা-বাবার একমাত্র সন্তান হয়েও আকিজ লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। তিনি খুব কাছ থেকে দারিদ্র্য দেখেছেন। আর গভীরভাবে বাবার ব্যবসা পর্যবেক্ষণ করেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু স্বপ্নের কোনো কিনারা করতে না পেরে ১৯৪২ সালে মাত্র ১৬ টাকা হাতে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে কিশোর শেখ আকিজ উদ্দিন খুলনার মধ্যডাঙ্গা গ্রাম থেকে বের হন। ট্রেনে চেপে তিনি কলকাতায় যান। কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তিনি রাত কাটাতেন। ওখানেই পাইকারি বাজার থেকে কমলালেবু কিনে ফেরি করে বিক্রি করতেন। কিছু দিন কমলালেবুর ব্যবসা করার পর তিনি একটি ভ্রাম্যমাণ দোকান দেন। কিন্তু একদিন পুলিশ অবৈধভাবে দোকান দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। কয়েক দিন জেল খেটে মুক্ত হয়ে আকিজ উদ্দিন উদ্ভ্রান্তের মতো কলকাতা শহর ঘুরেছেন। কলকাতায় তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের পেশোয়ারের এক ফল ব্যবসায়ীর পরিচয় হয়। আকিজ ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে পেশোয়ারে গিয়ে ফলের ব্যবসা শুরু করেন। দুই বছর ব্যবসা করে তাঁর পুঁজি দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আকিজ বাড়ি ফিরে আসেন। ১৯৫২ সালের দিকে বন্ধুর বাবা বিড়ি ব্যবসায়ী বিধু ভূষণের সহযোগিতায় আকিজ উদ্দিন বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি গ্রামগঞ্জ ঘুরে ধান, পাট, নারকিল ও সুপারি কিনে আড়তে আড়তে বিক্রি করেছেন। সামান্য কিছু টাকা জমিয়ে বাড়ির পাশে বেজেরডাঙ্গা রেলস্টেশনের কাছে একটি দোকান দেন। কিন্তু দোকানটি আগুনে পুড়ে যায়। আকিজ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি এলাকাবাসীর সহায়তায় ফের দোকান দেন। পাশাপাশি শুরু করেন ধান, পাট, চাল ও ডালের ব্যবসা। এরপর তিনি সুপারির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। রাত জেগে সেই সুপারি ছিলে দিতেন তাঁর সহধর্মিণী। এই সুপারি তিনি কলকাতায় পাঠাতেন। সুপারির ব্যবসায় তাঁর বেশ লাভ হয়। এরপর তিনি বিধু বিড়ির মালিক বিধু ভূষণের পরামর্শে বিড়ির ব্যবসায় যুক্ত হন। নাভারণের নামকরা ব্যবসায়ী মুজাহার বিশ্বাসের সহায়তায় তিনি ছোট্ট একটি বিড়ি তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। শুরু হয় আকিজের উত্থান পর্ব। বিড়ি ফ্যাক্টরির পর ১৯৬০ সালে অভয়নগরে অত্যাধুনিক চামড়ার কারখানা এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ১৯৬৬ সালে ঢাকা টোব্যাকো, ১৯৭৪ সালে আকিজ প্রিন্টিং, ১৯৮০ সালে আকিজ ট্রান্সপোর্ট, নাভারণ প্রিন্টিং, ১৯৮৬ সালে জেস ফার্মাসিউটিক্যাল, ১৯৯২ সালে আকিজ ম্যাচ, ১৯৯৪ সালে আকিজ জুট মিল, ১৯৯৫ সালে আকিজ সিমেন্ট, আকিজ টেক্সটাইল, ১৯৯৬ সালে আকিজ পার্টিকেল, ১৯৯৭ সালে আকিজ হাউজিং, ১৯৯৮ সালে সাভার ইন্ডাস্ট্রিজ, ২০০০ সালে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, একই বছর আকিজ অনলাইন, নেবুলা ইন্ক, ২০০১ সালে আকিজ করপোরেশন, আকিজ কম্পিউটার, আকিজ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড টেকনোলজি, ২০০৪ সালে আফিল এগ্রো, ২০০৫ সালে আফিল পেপার মিলস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেখ আকিজ উদ্দিন অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ ছাড়া তিনি আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর মৃত্যুর পর সন্তানরা আরো অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আকিজ উদ্দিনের ১৫টি সন্তান। ১০ ছেলে পাঁচ মেয়ে। বড় ছেলে ডাক্তার শেখ মহিউদ্দিন আদ্-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক ও আকিজ বিড়ির চেয়ারম্যান, অন্য সন্তানদের মধ্যে শেখ মোমিন উদ্দিন এসএএফ চামড়া ফ্যাক্টরির এমডি, শেখ আফিল উদ্দিন সংসদ সদস্য ও আফিল গ্রুপের এমডি, শেখ বশির উদ্দিন আকিজ গ্রুপের এমডি। এ ছাড়া শেখ নাসির উদ্দিন, শেখ আমিন উদ্দিন, জামিন উদ্দিন, শেখ আজিজ উদ্দিন, শেখ জামিল উদ্দিন সবাই আকিজ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত।বাবার স্মৃতিচারণা করে ডাক্তার শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবা আমাদের বলতেন, আগুন হয়তো মনের শক্তি দিয়ে হাতে চেপে রাখা যায়। কিন্তু ক্ষমতা ও সম্পদ ধরে রাখা তার চেয়ে আরো অনেক কঠিন। বাবার এই বাণী ধারণ করে তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সমাজসেবার হাল ধরে রেখেছি।’ শেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘বাবার নামাজ-কালামের পরই ছিল ফিন্যানশিয়াল ডিসিপ্লিনের স্থান। এ ছাড়া তাঁর সময়জ্ঞান ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি কোনো মিটিংয়ে এক মিনিট পরে আসেননি। আমি তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুটি অনুসরণ করে লাভবান হয়েছি।’ শেখ আফিল উদ্দিন বলেন, ‘বাবার মধ্যে কোনো আত্ম-অহমিকাবোধ ছিল না। তিনি সব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাঁর দূরদর্শিতার কারণেই আকিজ গ্রুপ সমপ্রসারিত হয়েছে।’ শেখ মোমিন উদ্দিন বললেন, ‘বাবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। কিন্তু তাঁর শিক্ষার প্রতি প্রেম ছিল। তিনি আমাদের উচ্চশিক্ষা দিয়ে ব্যবসার পাসপোর্ট দিতেন। তাঁর সততা, ধৈর্যশীলতা, মেধা, সহনশীলতার কারণেই আকিজ গ্রুপ সাফল্যের শিখরে উঠেছে। ’মধ্যডাঙ্গা গ্রামের শেখ আকিজ উদ্দিনের নিকটতম প্রতিবেশী আলী আকবর বলেন, ‘আকিজ উদ্দিনের সংসারে সব সময় অভাব লেগেই থাকত। আকিজ বাড়িতে থাকতেন না, মাঝেমধ্যে গ্রামে আসতেন। তিনি এসে স্ত্রী সকিনা খাতুনকে সংসার চালানোর জন্য কিছু টাকা দিতেন। কিন্তু তাতে সংসার ১৫ দিনও চলত না। আকিজ উদ্দিন বাড়িতে এলে তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধার শোধ করতেন। ’তিনি বলেন, ‘আকিজ উদ্দিন আমাদের বলতেন, কারো কোনো দেনা রাখব না। আমি রাতদিন ব্যবসার পেছনে ছুটছি। আল্লাহ আমাকে লাভ দেবেন। সেই লাভের টাকা দিয়ে তোমাদের দেনা শোধ করে দেব।’

এভাবেই ইচ্ছা, পরিশ্রম আর ধৈর্যের সমন্বয়ে শত শত ব্যর্থতার গল্প পরিনত হয়েছে সফলতার গল্পে । তবে আমি আর আপনি কেন পেছনে পড়ে থাকবো ? আসুন আমরাও পথ চলা শুরু করি ।

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।