নিবন্ধ

মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

এই লেখাটিতে আমরা ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তবে মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম তুলে ধরার আগে আমি কিছু কথা বলতে চাই।

বর্তমানে আমাদের দেশে ধর্মিয় মতবিরোধ চরম আকার ধারন করেছে। আর এই বিরোধ অন্য অন্য ধর্মের মানুষের সাথে নয় বরং নিজ ধর্মের মানুষের সাথেই! এই লেখায় যেহেতু আমি ইসলাম ধর্মের একটি ছোট বিষয় নিয়ে কথা বলবো তাই আমি মুসলমানদের কথাই তুলে ধরছি। একদল মুসলমান যেটা সঠিক বলছে আরেকদল মুসলমান সেটা ভূল বলছে, একপক্ষ যেটাকে জায়েজ বলছে অন্যপক্ষ সেটাকে নাজায়েজ বলছে। বলতে গেলে প্রায় সব বিষয় নিয়েই বিতর্ক চলছে। আর মাজার জিয়ারতের বিষয়টিও এই বিতর্কের বাইরে নয়। একদল মাজার জিয়ারতের পক্ষে আবার আরেকদল মাজার জিয়ারতের ঘোর বিরোধি।

একদল বলছে এটা পূন্যের কাজ আবার আরেকদল বলছে এটার কোন প্রয়োজন নেই বরং এটা থেকে শিরকের মতো ভয়াবহ পাপ হতে পারে! নিজেদের মধ্যে কথার লাড়াইতে জিততে গিয়ে এরা যখন-তখন একে অপরকে কাফের, মুনাফিক, শিরককারী ইত্যাদি কথা বলতে দ্বিধাবোধ করছেনা! যা খুবই দুখ:জনক ও উদ্বেগজনক।

সেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধিতার পথ ধরেই বর্তমানে অনেকে মাজার জিয়ারতকে নিরুৎসাহিত করতে গিয়ে এর সাথে বেদাত, শিরক শব্দগুলোকে জড়িয়ে ফেলেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন রূপ ধারন করেছে যে কেউ মাজার জিয়ারত করলে তাকে “মাজার পূজারী” “কবর পূজারী” ইত্যাদি বলা হচ্ছে। যা একদমই উচিত নয়। তবে অনেক স্থানে আসলেই মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপকর্ম বা গুনাহের কাজ হচ্ছে- এটাও সত্য কথা। কিন্তু আগুনে হাত পুড়তে পারে এই ভয়ে যেমন রান্না না করে বসে থাকলে হবেনা তেমনি অনেক জায়গায় মাজারে বিভিন্ন অপকর্ম হয় বলে সব মাজারকে দোষারোপ করে মাজার জিয়ারতের চর্চাটাই দেশ থেকে উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা ঠিক নয়। মাজার ইসলামেরই একটি নিদর্শন স্বরুপ। এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মেরই বহি:প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে।

“বিদ্যুৎ” সঠিকভাবে ব্যবহার করলে জীবন বাচতে পারে আবার ভূল হলে এই “বিদ্যুৎ” এর কারনেই একমূহুর্তে জীবন চলে যেতে পারে। ইসলামের বিষয়গুলোও তেমন। সঠিকভাবে করলে হবে সওয়াব আর ভূল ভাবে করলে হতে পারে গোনাহ বা শিরক! তাই আমার অনুরোধ আপনারা মাজার জিয়ারত বন্ধ করার চেষ্টা না করে বরং মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম জেনে সঠিক ভাবে মাজার জিয়ারত করুন। নিচে আপনাদের জন্য মাজার জিয়ারতের সঠিক নিয়ম তুলে ধরছি।

আসলে মাজার জিয়ারতের জন্য আলাদা কোন নিয়ম নেই বরং মাজার জিয়ারতও কবর জিয়ারতের মতোই। “মাজার” এবং “কবর”- এই দুটি জিনিসের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। দুটোই এক জিনিস। পার্থক্যটুকো হলো শব্দের ভিতর। মাজার শব্দটি আরবি ভাষা থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
আরবি (مزار) মাজার শব্দের অর্থ হলো জিয়ারত বা পরিদর্শন করার জায়গা। আরবি ভাষায় বিশেষ কোন সম্মানিত ব্যক্তির সমাধিস্থলকে নির্দিষ্ট করে বোঝানোর জন্য মাজার শব্দটির ব্যবহার হতো। তবে বর্তমানে আরবি ভাষায় মাজার শব্দটি আর তেমন ব্যবহার হয়না বরং শব্দটি বাংলা ভাষার সাথে মিশে গিয়ে বাংলাতেই ব্যবহার হয়। যেমন চেয়ার, টেবিল, মোবাইল ইত্যাদি শব্দগুলো বাংলা ভাষার সাথে মিশে গিয়ে এখন বাংলা ভাষায় ব্যবহার হচ্ছে।

সুতরাং কবর জিয়ারত যেমন জায়েজ তেমনি মাজার জিয়ারতও জায়েজ কারন দুইটি বিষয়ই এক। পার্থক্য এইটুকুই যে মাজার বলতে বিশেষ কোন সম্মানিত ব্যাক্তির (যেমন: সাহাবি, অলি-আউলিয়া, খুব ধার্মিক লোক) সমাধিস্থলকে বোঝানো হয়। তাই যে নিয়মে কবর জিয়ারত করা হয় সেই একই নিয়মে মাজার জিয়ারত করতে হবে।

* মাজার(কবর) জিয়ারতে গেলে প্রথমে মাজারে সমাহিত ব্যাক্তিকে উদ্দেশ্য করে প্রথমে সালাম দিতে হবে। সংক্ষিপ্ত সালাম- اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ يَا اَهْلَ الْقُبُوْرِ (উচ্চারণঃ আস্সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, অর্থঃ হে কবরবাসী! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।

সম্পূর্ন সালামটি হলোঃ “আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুরি মিনাল মুসলিমিনা ওয়াল মুসলিমাতি ওয়াল মু’মিনিনা ওয়াল মু’মিনাত আনতুম লানা ছাওফুও ওয়া নাহনু লাকুম তাবাউওন ইন্না ইনশাআল্লাহ হা বিকুম লা হিক্কুন।”

* এরপর মাজার জিয়ারতের নিয়ত করে মাজার জিয়ারতের দোয়া পড়তে হবে। (সুরা ফাতেহা ১ বার এবং সুরা ইখলাস ৩ বার)

* এরপর সময় থাকলে মাজারে সমাহিত ব্যাক্তির ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে নিন্মোক্ত সুরা-দরুদ পাঠ করবেন-

  • তওবা শরীফ ১১ বার পাঠ করবেন –
    (আস্তাগফিরুল্লাহ ইন্নাল্লাহা গাফুরুর
    রাহিম)।
  • দরুদ শরীফ ১১ বার পাঠ করবেন –
    (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
    নিম্নে আর যদি অফুরন্ত সময় থাকে
    তাহলে দূরুদে তুনাজ্জিনা শরীফ
    (আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা সায়্যিদিনা
    মুহাম্মাদিন সালাতান তুনাজ্জিনা
    বিহামিন যামি’য়্যিল আহ’ওয়ালি ওয়াল
    আফাত, ওয়া তাক্’দিলানা বিহা
    যামি’য়্যাল হাজাত, ওয়া তুতাহ্’হিরুনা বিহা
    মিনন্ যামি’য়্যিছ ছায়্যিয়াত, ওয়াতার ফা-
    উনা বিহা ইন্দা কাআ’লাদ দারাজাত, ওয়া
    তুবাল্লিগুনা বিহা আক্বসাল গাইয়াত মিন
    যামি’য়্যিল খাইরাতি ফিল হায়াতি ওয়া
    বা’য়দাল মামাতি ইন্না কা’য়ালা
    কুল্লিশাইয়িন ক্বাদীর।)
  • আয়াতুল কুরসী ৩ বার পাঠ করবেন – আয়াতুল কুরছি (আউজু বিল্লাহ্ হিমিনাশ সাইতোয়ানির রাজিম, বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহিম, আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ূল কাইয়ূম লা তা’খুজুহু সিনাতু ওয়ালা নাহুম, লাহু মা ফিছ ছামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আর্দ্, মাঞ্জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইন্দাহু ইল্লা বি ইজনিহ্, ইয়ায়লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম ওয়ালা ইয়ুহিতুনা বি শাইয়িম্ম মিন ই’ল্মিহি ইল্লা বিমা শা’আ, ওয়াসিয়্যা কুরসিয়্যু হুচ্ছামাওয়াতি ওয়াল্ আর্দ্র, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়্যুল আজীম।)

* এরপর মাজারে সমাহিত ব্যক্তির মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করবে। এক্ষেত্রে চাইলে হাত উঠিয়ে দোয়া করা যায় বা চাইলে মনে মনেও দোয়া করা যায়।

* কবরস্থানের মতো মাজার প্রাঙ্গনেও যথাযথ আদব ও পবিত্রতা বজায় রেখে চলতে হবে।

মাজার জিয়ারতের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বা যা যা বর্জন করতে হবে:

* মাজারকে উদ্দেশ্য করে সেজদা দেয়া যাবেনা। সেজদা শুধুমাত্র আল্লাহর হক। অন্য কাউকে সেজদা করা সম্পূর্ন হারাম।

* সরাসরি মাজারকে সামনে রেখে নামাজ পড়া যাবেনা। তবে অনেক জায়গায় মাজারের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় মসজিদ রয়েছে। সেক্ষেত্রে মাজারের অংশটুকু দেয়াল বা অন্য কোন ভাবে আলাদা করা থাকলে সেখানে নামাজ পড়া যেতে পারে তবে সরাসরি মাজারকে সামনে রেখে নামাজ পড়া যাবেনা।

* মাজারে সমাহিত ব্যাক্তির কাছে কিছু চাওয়া যাবেনা। চাইতে হবে আল্লাহর কাছে। আপনি মাজারে গেলে মাজারে সমাহিত ব্যাক্তির জন্য ও অন্য কবরবাসিদের জন্য এবং নিজের জন্য দোয়া করতে পারেন তবে মাজারে শায়িত ব্যাক্তি আপনার কোন কাজ করে দিবে বা মনের ইচ্ছা পূর্ন করে দিবে এমন ধারনা করা যাবেনা।

* মাজারে গিয়ে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নাচ-গান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা কান্নাকাটি করা যাবেনা। মাজারে বা যেকোন কবরের সামনে গেলে প্রিয়জনের কথা মনে পড়লে বা তার স্মৃতি মনে পড়লে নিজের অজান্তেই অনেক সময় চোখে পানি চলে আসতে পারে। এটা স্বাভাবিক বিষয়, এতে সমস্যা নেই তবে এর বেশি বাড়াবাড়ি করা যাবেনা।

* অপচয়কারি শয়তানের ভাই! তাই মাজার, মাদ্রাসা বা মসজিদ- যাই হোকনা কেন সেখানে কোন অপচয় করা যাবেনা। মাজারে যদি আলো প্রয়োজন হয় বা কোন কারনে সুগন্ধির প্রয়োজন হয় তাহলে সেখানে বৈদ্যুতিক বাতি, মোমবাতি বা আগর বাতি জ্বালানো যেতে পারে তবে অকারনে মোমবাতি বা আগরবাতি জ্বালানোর প্রয়োজন নেই।

* মাজারে সমাহিত ব্যাক্তির কাছে মানত করে মাজারে কোন টাকা পয়সা দেয়া যাবেনা। তবে মাজারের রক্ষনা-বেক্ষন ও অন্যান্য বিষয় পরিচালনার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু টাকা পয়সা দান করা যাবে। ঠিক তেমনি মাজারে মানত করে গরু-ছাগল, হাস-মুরগি দেয়াও ঠিক নয়। তবে মানুষকে খাওয়ানোর জন্য মানত না করেও খুশি মনে এসব দান করতে পারেন।

অনেক মাজারে প্রতিদিন বা কয়েকদিন পর পর সাধারন মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। সেখানে সাধারন মানুষের পাশাপাশি অনেক গরীব, পথের ফকির এমনকি পাগলকেও খাবার দেয়া হয়। আপনি চাইলে সেখানে দান করতে পারেন। ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ তাআলা সেজন্য আপনার উপর খুশি হবেন।

আগেই বলেছি বর্তমানে একদল মানুষ মাজার জিয়ারতের বিরোধিতা করতে করতে বিষয়টি এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে তাতে মনে হয় যেন মাজার জিয়ারত করাটাই অপরাধ। তবে মাজার জিয়ারত করাও কবর জিয়ারত করার মতোই একটি সাধারন বিষয়। আসুন আমরা মাজার জিয়ারত বন্ধ করতে না বলে বরং মাজার জিয়ারত করার সঠিক নিয়ম মেনে চলি এবং অন্যকেও মেনে চলতে বলি। মাজার অলি-আউলিয়াদের একটি সম্মানজনক নিদর্শন। তাই আমাদের সবার উচিত মাজারের রক্ষনাবেক্ষন ও যত্ন নেয়া তবে গনহারে সবার কবরকেই মাজার বানানো উচিত নয়। বর্তমানে দেখা যায় গনহারে যে কোন ধার্মিক লোক বা অনেক ক্ষেত্রে সাধারন লোকদের কবরকেও মাজার বানিয়ে ফেলা হয় বা পাকা করে, দেয়াল দিয়ে স্থায়িভাবে সংরক্ষন করে রাখা হয়। এখন যদি কিছুটা ধার্মিক হলেই বা ছোটখাটো কোন বিশেষ গুনের অধিকারি হলেই তাদের কবরকে মাজার বানিয়ে ফেলা হয় বা স্থায়িভাবে সংরক্ষন করে রাখা হয় তাহলেতো ৫০ বা ১০০ বছর পরে মাজারের কারনে মানুষ বসবাসেরই জায়গা থাকবেনা। তাই গনহারে মাজার তৈরি বা কবর সংরক্ষন করে রাখা পৃথীবির স্বাভাবিক অবস্থার পরিপন্থি।

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।