নিবন্ধ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি – ৩০ লাখ নিহত নাকি ৩ লাখ নিহত, কোনটি সত্য?

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস , মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন জাতিগত ভাবে বাংলাদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এটি এদেশের মানুষের ঐক্য, সাহস, দৃড়তা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। তবে প্রতিটি বড়, গৌরবউজ্জল ঘটনার মতো এই ঘটনারও কিছু বিতর্কিত দিক রয়েছে, যা হয়তো মানুষের অশিক্ষা, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব বা সঠিক পরিকল্পনার কারনে সৃষ্টি হয়েছে বা হয়তো ইচ্ছা করেই সৃষ্টি করা হয়েছে। কারন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য যতটা গৌরবের, বিপক্ষ বাহিনীর জন্য ততটাই লজ্জাজনক।

কেউ খুন হলে তার পরিবার ও ভালোবাসার মানুষরা যেমনি সবাইকে খুনের কথা জানাতে চায় তেমনি কিন্তু যারা খুন করে তারা সেটা তার চাইতেও বেশি গোপন করে রাখতে চায়!
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে এক পক্ষের দাবী মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ, আর অন্য পক্ষের দাবি মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ নয় বরং ১২ লাখ বা ১০ লাখ বা ৫ লাখ বা কারো কারো মতে ৩ লাখ! তবে কাদের দাবী সত্য তা নিয়ে অনেকেরই দ্বিধা রয়েছে। এই দ্বিধা অবশ্যই আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

আমরা এখানে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষনের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করবো কাদের দাবী সত্য হওয়ার সম্ভবনা বেশি। আমি এখানে সম্ভবনার কথা বলছি কারন এই বিষয়ে একেবারে ১০০% হিসাব মিলিয়ে গুনে গুনে হিসাব দেয়া যেহেতু সম্ভব নয় তাই বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করে আমাদের ধারনা নিতে হবে।

আগেই বলে নেই, লেখা পড়তে পড়তে হয়তো আপনার মনে হতে পারে যে আমি একটি পক্ষের হয়ে কথা বলছি। কারন আমি এই বিষয়ে আপনাদের জন্য লেখার আগেই উক্ত তথ্য উপাত্ত ও যুক্তিগুলো নিজে নিজে বিশ্লেষন করে দেখেছি এবং বিশ্লেষন করে একটি সিদ্ধান্তে পৌছেছি। তবে আপনি যদি আমার বিপক্ষেও হোন তবুও আপনি এটি পড়ে দেখতে পারেন বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত জানার জন্য। আপনি পক্ষে থাকুন বা বিপক্ষে থাকুন, তথ্য উপাত্ত ও যুক্তিগুলো অবশ্যই আপনার কাজে দিবে। আর লেখাটি কিছুটা বড় হতে পারে তাই দয়া করে একটু সময় নিয়ে পড়বেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখিত ৩০ লাখ শহীদ কি সত্য নাকি শুধুই গল্প?

যারা বলেন মুক্তিযুদ্ধে আসলে ৩ লাখ নিহত হয়েছে, তাদেরকে প্রথমেই আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই একটা মিমাংসিত বিষয় নিয়ে আপনার এত দুশ্চিন্তা কেন? ৩০ লাখ বিশ্বাস করতে আপনার সমস্যা কোথায়? উত্তর হবে কিছুটা এধরনের- “আমি কোন আজগুবি কথা বিশ্বাস করতে পারবোনা, আমি সত্যটা জানতে চাই।” 😒😒😒

যদি আপনার মনোভাব এমন হয়ে থাকে তাহলে আরেকটা প্রশ্ন, আপনি কিভাবে বুঝলেন ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যাটি আজগুবি? আপনি কি যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেছেন? বোঝার চেষ্টা করেছেন? আপনিতো আগেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন যে ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যা বিশ্বাস করবোনা। কেন আপনার এটাকে মিথ্যা মনে হয়েছে? উত্তর- ৩০ লাখ সংখ্যাটা অতিরিক্ত বেশি, এত মানুষ হত্যা করা সম্ভব নয়, শুধু মুখে বললেইতো হবেনা, যুক্তি বা প্রমান দেখাতে হবে। তাহলে বিশ্বাস করবো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি কিন্তু তাই বলে মিথ্যা বলতে পারবোনা। 😂😂😂

এভাবেই নিজের দেশ ও জাতির উপর বিশ্বাস রাখতে না পারা মানুষগুলো অন্য আরেকটি জাতির কথায় বিশ্বাস করে বসে আছে। যদিও সেটারও কোন প্রমান নেই। তারা সন্দেহ নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাদেরকে এই রোগ থেকে বের করতে না পারলে সেটা আমাদের সমগ্র জাতির জন্যই হবে লজ্জার।

তবে আমি যথাসম্ভব যাচাই-বাছাই করে দেখেছি যারা ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ পোষন করে তাদের সন্দেহের ভিত্তিগুলোই বরং বেশি দূর্বল। আসুন তাহলে দেখে নেই কোন কোন বিষয়গুলো তাদের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুললো!

যেসব প্রশ্ন তুলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চালানো হয় সেগুলো হলো-

  • শেখ মুজিব ভূল করে ৩ লাখ বলতে গিয়ে ৩ মিলিয়ন বলে ফেলেছে!
  • মাত্র নয় মাসে এত মানুষ মারা সম্ভব নয়!
  • আমার গ্রামে ১ জনও মরেনি!
  • আমেরিকা জাপানে পারমানবিক বোমা মারলো তবু ৩০ লাখ মরলো না আর পাকিস্তান এত মানুষ মারলো কিভাবে ?
  • ৩০ লাখ মানুষের নাম/পরিচয়/তালিকা দেখান!

সাধারনত উপরিউক্ত বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করেই সন্দেহ করা হয়। অথচ দেখুন এই বিষয়গুলোও কিন্তু নিশ্চিত নয়, এগুলোও অনুমান নির্ভর। অনুমান নির্ভর কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই সন্দেহ পোষন করা হচ্ছে।

এখন আমার প্রশ্ন, শেখ মুজিব যে ভূল করে ৩ লাখ বলতে গিয়ে ৩ মিলিয়ন বলেছে তার প্রমান কি? আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে এটা ভুল করে বলেছে ? শেখ মুজিব কোন অশিক্ষিত মানুষ না যে ৩ মিলিয়ন আর ৩ লাখের পার্থক্য বুঝবেনা। শেখ মুজিব ছোটকাল থেকেই একজন মেধাবি ছাত্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। দেশ বিদেশের রাজনৈতিক সভা বা আলোচনায় তিনি অতিথিদের সাথে ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতেন। বিভিন্ন বিদেশি গনমাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে সবসময় ইংরেজিতে কথা বলতেন, সাক্ষাৎকার দিতেন। তাই শেখ মুজিব ইংরেজি বলতে পারতোনা এমন ধারনা বোকামি। তবে হ্যাঁ, ভুল মানুষের হতেই পারে কিন্তু এটা যে ভুল ছিলো সেটা কিভাবে বুঝলেন?

আর শেখ মুজিব যে ভুল করে ৩০ লাখ বলেনি বরং জেনেশুনেই বলেছে তার কিছু প্রমান আপনাদের জন্য উল্লেখ করছি।
শেখ মুজিব ৩০ লাখ নিহতের কথা বলার আগেই সবাই ৩০ লাখ নিহতের কথা জানতো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত “চরমপত্র” অনুষ্ঠানে এম আর আখতার মুকুল তার জানা মতে ত্রিশ লক্ষ শহীদের কথা উল্লেখ করেছেন।

১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষন করে লেখা হয়, “হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশে প্রায় ত্রিশ লক্ষ নিরীহ লোক ও দু শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।”

১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা-র ‘হুশিয়ার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ শিরোনাম খবরে তাদের বিশ্লেষন অনুযায়ি লেখা হয়, “দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তাতে ৩৫ লক্ষাধিক বাঙালি প্রাণ হারিয়েছে।”
এই পত্রিকায় বলা হয়েছে যে নিহতের সংখ্যা ৩৫ লাখ।

১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার The Daily Observer-এর শিরোনাম ছিল “Pak Army Killed Over 30 Lakh People.”
এই পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ হত্যা করেছে। খেয়াল করুন তারা ৩০ লাখ বলেনি, বরং ৩০ লাখেরও বেশি বলেছে।

সেদিন The Morning News-এর শিরোনামও ছিল “Over 30 Lakh Killed by Pak Force.” এই পত্রিকাতেও বলআ হয়েছে যে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি।

একইভাবে অন্য গনমাধ্যমগুলোতেও ৩০ লাখ বা ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দেখলেনতো শেখ মুজিব বলার আগেই সবাই ৩০ লাখ নিহত হওয়ার বিষয়টি জানতো (সাধারনত যারা ৩০ লাখ সংখ্যাটি নিয়ে সন্দিহান তারা বংগবন্ধুকে বংগবন্ধু বলে স্বীকার করতে চায়না, শেখ মুজিব নামেই ডাকে। তাই সেধরনের মানুষরা যাতে লেখাটি পড়তে গিয়ে বিরক্ত না হয় সেজন্য তাদের সুবিধার্থে বংগবন্ধুকে আমি শুধু শেখ মুজিব নামেই উল্লেখ করলাম)। শেখ মুজিব হুট করে বলে বসেনি বা ভূল করেও বলেনি। কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে এগুলো আমাদের দেশীয় পত্রিকা তাই এরা আমাদের পক্ষে বাড়িয়ে বলেছে। চলুন তাহলে দেখি বিদেশি গনমাধ্যমগুলো কি বলেছে…

রাশিয়ার ‘প্রাভদা’ পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশে ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিষয়টি প্রকাশ করে। এই প্রাভদার ইংরেজি সংস্করণে উল্লেখ করা হয়, “Over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakisthani occupation forces during the last nine months”
এখানেও দেখুন পত্রিকাটি বলেছে যে “Over 30 lakh person” মানে ৩০ লাখেরও বেশি।

অপারশন সার্চ লাইটের মাত্র ১ দিন পরে ২৮/৩/১৯৭১ তারিখে প্রকাশিত আমেরিকার জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস জানায় নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার। এর ৩ দিন পরে নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আবারো রিপোর্ট প্রকাশ করে যেখানে নিহতের সংখ্যা শুধু ঢাকাতেই ৩৫০০০ বলে জানানো হয়। তাহলে সারাদেশে কি পরিমান নিহত হতে পারে ধারনা করুন। আর এটাতো মাত্র ৪/৫ দিনের হিসাব। যুদ্ধতো তখনো পুরোদমে শুরুই হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ার The Sydney Morning Herald পত্রিকা ২৯/৩/১৯৭১ তারিখে জানায় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার আক্রমনে নিহতের সংখ্যা নূন্যতম ১০ হাজার থেকে ১ লাখ হতে পারে। ভাবুন মাত্র ৪/৫ দিনেই এই অবস্থা!

কারাকাসের পত্রিকা The Momento, জুন মাসেই নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ থেকে ১০ লাখের ভিতর বলে উল্লেখ করেছে।

আমেরিকার আরেকটি বিখ্যাত পত্রিকা Wall Street Journal ২৩ জুলাই তাদের রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ বলে জানিয়েছে। এরপরও আরো ৫ মাস যুদ্ধ হয়েছে।

ইংল্যান্ডের পত্রিকা দি হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস- ১লা অক্টোবর ১৯৭১ জানিয়েছে নিহতের সংখ্যা ২০ লক্ষ। খেয়াল করে দেখুন, অক্টোবর মাসের মধ্যেই নিহতের সংখ্যা ছিলো ২০ লাখের মতো। এর পরও আরো আড়াই মাস যুদ্ধ হয়েছে।

দেখলেনতো, আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমগুলোতেও ৩০ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এখন আপনি কি বলবেন ? সবার তথ্যই ভুল? দেশ বিদেশের সবাই-ই কি মিথ্যা বলেছে? আর যারা কোন প্রমান ছাড়া সন্দেহ পোষন করছে তারাই সঠিক? আবারো ভাবুন। এতগুলো তথ্য একটি বিন্দুতে এসে মিলে যাচ্ছে। সবগুলোই তো আর ভুল হতে পারেনা। কিছুটা যৌক্তিকতা নিশ্চয় আছে।

শুধু এই কয়টি পত্রিকা নয় বরং সকল দেশের সকল পত্রিকাতেই বাংলাদেশের গনহত্যার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিলো। সবগুলো লিখতে গেলে লিখে শেষ করা যাবেনা। তবু ধরে নিলাম যে আপনি দেশ-বিদেশের এতগুলো পত্রিকার উপরও বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। 😂😂😂
চলুন তাহলে দেখে নেই পৃথীবির বিভিন্ন গনহত্যা নিয়ে যারা গবেষনা করেন সেই সমস্ত গবেষক এবং ইতিহাসবিদেরা কি বলেছেন…

পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী গবেষক ও লেখিকা Samantha Power-এর লেখা গণহত্যা সম্পর্কিত সর্বাধিক বিক্রি হওয়া একটি বই “A Problem from Hell”: America and the Age of Genocide” এই বইয়ের ভেতর ১৯৭১ সালে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বলে জানানো হয়েছে। এটা গণহত্যা সম্পর্কিত একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ এবং সারা বিশ্বে গ্রহনযোগ্য। তবে ধরে নিলাম এটাও আপনার বিশ্বাস হচ্ছেনা। 😅😅😅
আপনি আরো তথ্য জানতে চান। আপনার জন্য আরো কিছু তথ্য-প্রমান তুলে ধরছি।

লিও কুপার একজন বিখ্যাত গণহত্যা গবেষক। তিনি তার গবেষনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জেনোসাইড নামে একটি বই লিখেছেন। যেখানে তিনি বিশ্বের বড় বড় গনহত্যাগুলো নিয়ে তার বিশ্লেষন তুলে ধরেছন। বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে কিছু সংখ্যা দিয়ে। লেখা হয়েছে- ১৯৩৩-৪৫ : ৬০ লক্ষ ইহুদী। ১৯৭১ : ৩০ লক্ষ বাংলাদেশী। ১৯৭২-৭৫ : ১০০,০০০ হুটু। নিচে লাল কালিতে বড় করে লেখা জেনোসাইড। এই পরিমান মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছে।

Dr. Ted Robert Gurr এবং Dr. Barbara Harff কে বলা হয়ে থাকে রাজনীতি বিজ্ঞানের দুই দিকপাল। তাদের গবেষণালব্ধ বই “Towards Empirical Theory of Genocides and Politicides” বইতে উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালের সংঘাতে নূন্যতম ১২,৫০,০০০ থেকে ৩০,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

ড. রুডলফ যোসেফ রামেল হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত গণহত্যা বিশেষজ্ঞদের একজন। তার লেখা ‘STATISTICS OF DEMOCIDE’ বইটিকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে বিশ্বে গণহত্যা নিয়ে সংখ্যাগতভাবে অন্যতম কমপ্রিহেন্সিভ বই। বইটির অষ্টম অধ্যায়ে Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources নিবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে সর্বোচ্চ সম্ভাবনার ঘরে মৃত্যু হয় ৩০,০৩,০০০ মানুষের ।

Encyclopedia Americana তাদের ২০০৩ সালের সংস্করণে বাংলাদেশ নামক অধ্যায়ে ১৯৭১ এ নিহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছে ৩০ লাখ।

গিনেস বুক শব্দটিতো সবাই শুনেছেন। পৃথীবির বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বরেকর্ড করা ঘটনাগুলোর স্বীকৃতি দেয় এই সংস্থাটি। এই গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে ১৯৭১ এ বাংলাদেশের গণহত্যা বিংশ শতাব্দীর সর্বোচ্চ পাঁচটি গনহত্যার একটি!
এটা নিশ্চয় জানেন যে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ যথেস্ট যাচাই-বাছাই করেই রেকর্ডগুলোর স্বীকৃতি প্রদান করে। আন্দাজে স্বীকৃতি দেয়না।

এতএব বিভিন্ন পত্রিকা, বই এবং গবেষকদের মতামত অনুযায়ি দেখা যাচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বা তারও বেশি এবং একদম কম করে হলেও এ সংখ্যা নূন্যতম ১২ লাখ ৫০ হাজার তো হবেই, এর কম কিছুতেই নয়। সুতরাং ৩ লাখের তো প্রশ্নই আসেনা।

১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হত্যার পর রিক্সার উপরে পরে রয়েছে লাশ
১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হত্যার পর রিক্সার উপরে পরে রয়েছে লাশ

এতগুলো প্রমান থাকার পরও ৩০ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আপনার বিশ্বাস হচ্ছেনা? তবুও কেমন যেন খটকা লাগছে ? ভাবছেন মাত্র ৯ মাসে এতো মানুষ মারা সম্ভব নয়। 🐸 চলুন তাহলে কিছু ঘটনা ও যুক্তি বিশ্লেষন করে দেখি মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ মারা সম্ভব কিনা।

প্রথমেই বলতে চাই, নয় মাস কোন “মাত্র” সময় নয়। ৯ মাস অনেক দীর্ঘ সময়। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে পাকিস্তানি সৈন্যের সংখ্যা ১ লাখ। তবে বাস্তবে পাকিস্তানি সৈন্যের সংখ্যা ১ লাখ ছিলোনা বরং আরো অনেক বেশি ছিলো। কারন একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন যে ১৬ই ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পনই করেছিলো। তাহলে চিন্তা করুন যেখানে ৯ মাস যুদ্ধের পর ৯৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পন করেছে তাহলে তাদের বাহিনীতে সব মিলিয়ে কত সৈন্য ছিলো! এই ৯ মাসে তো অনেক পাকিস্তানি সৈন্যও মারা গিয়েছে, অনেকে আহত হয়ে দেশে ফিরে গেছে, অনেকে বদলি হয়েছে এবং তাদের জায়গায় নতুন সৈন্য এসেছে। অতএব মারা যাওয়া পাকিস্তানি সৈন্য, আহত হয়ে দেশে ফিরে যাওয়া সৈন্য এবং বদলি হওয়া সৈন্য বাদ দিয়েও ৯৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পন করলে সব মিলিয়ে কত সৈন্য যুদ্ধ করেছে আপনিই চিন্তা করুন।

তবে আমি সেগুলো বাদ দিয়ে যদি শুধু ৯৩ হাজার সৈন্যকেই হিসাবে ধরি তাহলেও ৩০ লাখ মানুষ মারাটা কোন ব্যাপার না। ৩০০০০০০ ÷ ৯৩০০০ = ৩২। এতএব দেখা যায় একজন সৈন্য গড়ে ৩২ জন হত্যা করলেই ৯৩ হাজার সৈন্য দিয়ে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করা সম্ভব। এখন আপনিই বলুন একজন অস্ত্রধারী সৈন্যের পক্ষে ৯ মাসে মাত্র ৩২ জন নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা কি অসম্ভব কিছু ? আর অস্ত্র বলতে কোন সাধারন অস্ত্র নয় বরং পাকিস্তানি বাহিনী অসহায় দরিদ্র বাংগালিদের উপর পিস্তল বা রাইফেল থেকে শুরু করে গ্রেনেড, TNT, ট্যাংক, আর্টিলারি, যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান সহ সব কিছুই ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চীন সহ বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ অর্থ ও রাজনৈতিক সহায়তা পেয়েছে। সুতরাং আরো কত সহজে, কত দ্রুত মানুষ হত্যা করেছে তা নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন।

আর প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি সৈন্য ৯৩ হাজার ছিলোনা। মারা যাওয়া পাকিস্তানি সৈন্য, আহত হয়ে দেশে ফিরে যাওয়া সৈন্য, চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়া সৈন্য, বদলি হয়ে চলে যাওয়া সৈন্য এবং তাদের বদলে আসা নতুন সৈন্য সহ সব মিলিয়ে হিসেব করলে যুদ্ধে অংশ নেয়া পাকিস্তানি সৈন্যের সংখ্যা দেড় লাখ থেকে পৌনে ২ লাখের মতো হবে।

এছাড়া পাকিস্তানি সৈন্য বাদ দিয়েও দেশে ৪৫ হাজার থেকে ২ লাখের মতো রাজাকার, আল-বদর, আল শামস বাহিনীও ছিলো।

আর আমরা সব সময় যুদ্ধের সময়কাল ৯ মাস হিসেব করি কারন ৯ মাসে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো এবং পাকিস্তানি বাহিনী আত্বসমর্পন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলো কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ হয়েছে আরো ১ মাস বেশি। ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি বরং ১৯৭২ এর জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত যুদ্ধ চলেছে। মূল পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ই ডিসেম্বর আত্বসমর্পন করলেও সব পাকিস্তানি কমান্ডার এবং সৈন্যদের গ্রুপ তখনো আত্বসমর্পন করেনি। যেমন ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ি জেলা স্বাধীন হয়েছে ১৮ই ডিসেম্বর। কিছু ছোট ছোট বিদ্রোহি সৈন্যদের গ্রুপ ও পাকিস্তানি কমান্ডার তাদের অধীনস্ত সৈন্যদের নিয়ে ১৯৭২ এর জানুয়ারি পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছে। সেই সময় পর্যন্ত তাদের আওতাধীন এলাকায় অনেক সাধারন মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা মারা গিয়েছেন (পাকিস্তানি সৈন্যরাও মারা গিয়েছেন)।

এরপর আসি বিপক্ষ দলের পরের যুক্তিতে। অনেকেই বলে থাকেন “৩০ লাখ মানুষ মরলো অথচ আমার গ্রামেতো একজনও মরেনি!”

এবার আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা তো যুক্তি প্রমান ছাড়া কিছু বিশ্বাস করেননা। তাহলে আপনার গ্রামে যে একজনও মরেনি তার কি প্রমান আছে আপনার কাছে ? জানি এবার আপনি নিজেই কোন প্রমান দেখাতে পারবেননা। খুব অল্প কিছু এলাকা ছাড়া প্রতিটি এলাকাতেই মানুষ নিহত হয়েছে। ভালো করে খুজে দেখুন পেয়ে যাবেন।

তাছাড়া আপনার এলাকাতে একজনও মরেনি আবার অনেক জায়গায় তো একটি পরিবারেই ১০জন মরেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে তো পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে এমন ঘটনাও আছে। সেগুলোর বিষয়ে কি বলবেন?

এছাড়া আমি বলবো যে, আপনার গ্রামেও কেউ না কেউ ঠিকই নিহত হয়েছে যেই ঘটনা হয়তো চাপা পরে গেছে বা আপনি জানতে পারেননি। আপনি ভালো করে খোজ নিয়ে দেখুন, শুধু ১ জন বরং অনেকের তথ্যই জানতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। তাছাড়া অনেক মানুষকে এক এলাকা থেকে ধরে নিয়ে অন্য এলাকায় হত্যা করা হয়েছে যাদের নিহত হওয়ার প্রমান এলাকাবাসীর কাছে নেই। অনেক মানুষ হারিয়ে গেছে বা নিখোজ হয়েছে যাদেরকে হয়তো হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে কিন্তু তাদের কথা এলাকার মানুষ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনা। এই বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

সারা দেশে এপর্যন্ত ৯৪২ টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সব মিলিয়ে মোট বধ্যভূমির সংখ্যা আরো বেশি হবে। প্রতিটি বধ্যভূমিতে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কোন কোন বধ্যভূমিতে হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলি বধ্যভূমির কেবল একটা গর্ত থেকেই ১ হাজার ১০০ টা মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছে! আবার কোন কোন গর্তে কমও পাওয়া গেছে। পুরো বধ্যভূমিটিতে এমন প্রায় ১০০ এর কাছাকাছি গর্ত ছিলো যার সবগুলো খনন করা সম্ভব হয়নি। তাহলে সব মিলিয়ে শুধু এই বধ্যভূমিটিতেই কত হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে আপনিই চিন্তা করুন। একজন বিদেশি সাংবাদিক একবার বলেছিলেন ৭১ এ বধ্যভূমির আশেপাশের এলাকার শকুনগুলি বধ্যভূমিতে থাকা মৃতদেহ খেতে খেতে এত মোটা হয়ে গিয়েছিলো যে তারা উরতে পারতো না!

১৯৭১ সালে বধ্যভূমিতে পরে থাকা কিছু লাশ
১৯৭১ সালে বধ্যভূমিতে পরে থাকা কিছু লাশ

বহু নিহত মানুষকে স্বাভাবিক ভাবেও কবর দেয়া হয়েছে, আবার বহু লাশ নদীতে, খালে, বিলে, জংগলে ফেলা দেয়া হয়েছে যেগুলো আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে। শুধু বধ্যভূমিতে পাওয়া লাশের সংখ্যা হিসাব করলে হবেনা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নদীতে ভেসে আসা লাশ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নদীতে ভেসে আসা কিছু লোকের লাশ

হানাদারদের হাতে নিহত কিছু লোকের নদীতে ভেসে আসা লাশ উদ্ধার করছে এলাকাবাসি

হানাদারদের হাতে নিহত কিছু লোকের নদীতে ভেসে আসা লাশ উদ্ধার করছে এলাকাবাসি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নদীতে ভেসে আসা লাশ ছিড়ে খাচ্ছে কুকুর

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নদীতে ভেসে আসা লাশ ছিড়ে খাচ্ছে কুকুর

এরপর যে প্রশ্নটি তুলে ৩০ লাখ সংখ্যাটিকে অবাস্তব প্রমান করার চেষ্টা করা হয় তা হলো, “জাপানে পারমানবিক বোমা মারার পরও ৩০ লাখ মরলোনা, ইরাক-আফগানস্তানে এত যুদ্ধের পরও ৩০ লাখ মরলোনা তাহলে আমাদের এখানে ৩০ লাখ মরলো কিভাবে ?

এই প্রশ্নটি আমার কাছে সবচেয়ে ছাগলামি মার্কা প্রশ্ন বলে মনে হয়।

আমিও এমন কিছু ছাগলামি মার্কা প্রশ্ন করতে চাই। দেখি আপনাদের উত্তরটা কি হয়। আচ্ছা বলুনতো সৌদি আরবে এত তেল উত্তোলিত হয় কিন্তু বাংলাদেশে এত তেল উত্তোলিত হয়না কেন? নদীতে কোথাও জাল মারলে মাছ বেশি পাওয়া যায় আবার কোথাও জাল মারলে মাছ কম পাওয়া যায় কেন? সুন্দরবনে প্রচুর হরিন পাওয়া যায় কিন্তু ঢাকাতে পাওয়া যায়না কেন?

উত্তর হলো- সৌদি আরবে প্রচুর তেল রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে নেই তাই সৌদিতে প্রচুর তেল উত্তোলিত হয় কিন্তু বাংলাদেশে হয়না। নদীর যেখানে মাছ বেশি আছে সেখানে জাল ফেললে বেশি মাছ পাওয়া যায় যেখানে মাছ কম সেখানে জাল ফেললে কম মাছ পাওয়া যাবে সেটাই স্বাভাবিক। সুন্দরবনে প্রচুর হরিন বাস করে কিন্তু অন্যত্র বাস করেনা তাই সুন্দরবনে হরিন পাওয়া যায় কিন্তু অন্যত্র পাওয়া যায়না যা স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি বাংলাদেশে মানুষ বেশি তাই পাক বাহিনী সহজেই বেশি মানুষ হত্যা করতে পেরেছে অন্যান্য দেশে মানুষ কম তাই যুদ্ধ হলে মানুষ মরেও কম।

জ্বী আমি জনসংখ্যার কথা বলছি। “জনসংখ্যা” ও “জনসংখ্যার ঘনত্ব” – এই দুইটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ন। বাংলাদেশের বিরাট জনসংখ্যাই বিরাট সংখ্যক মানুষ মারতে পারার মূল কারন। যেসব দেশের জনসংখ্যা কম, জনসংখ্যার ঘনত্ব কম এবং যেসব দেশ আয়তনে বড় সেসব দেশে যুদ্ধ হলে স্বাভাবিকভাবেই কম মানুষ মারা যায়। পৃথীবিতে এমন বহু দেশ আছে যাদের সম্পূর্ন দেশ ধংস করে দিলে যতখানি মানুষ মারা যাবে বাংলাদেশের একটি জেলা ধংস করলেই তার চাইতে বহুগুন বেশি মানুষ মারা যাবে। এখনও যদি আমাদের দেশে যুদ্ধ হয় তাহলেও অন্য সব দেশের চাইতে আমাদের দেশে বেশি মানুষ মারা যাবে। আমি বাস্তব হিসাব কষে আপনাদের বিষয়টা বুঝিয়ে দিচ্ছি(২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ি পৃথীবির বিভিন্ন দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার হিসাব বিশ্লেষন করে দেখি চলুন)।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের প্রভাব:

প্রথমেই রাশিয়ার কথা চিন্তা করুন। রাশিয়া পৃথীবির সবচাইতে বড় দেশ। রাশিয়ার আয়তন ১ কোটি ৭০ লক্ষ ৯৮ হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। যা প্রায় ১১৬ টি বাংলাদেশের সমান! এখন যদি সম্পূর্ন রাশিয়াকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় তবুও মানুষ মরবে মাত্র ১৪ কোটি ৬০ লাখ অথচ বাংলাদেশকে ধংস করলে মারা যাবে ১৮ কোটি। রাশিয়ার চাইতে ১১৬ ভাগ ছোট হয়েও বাংলাদেশে ৩ কোটি ৪০ লাখ বেশি মানুষ মারা যাবে! আর রাশিয়াতে যদি সম্পূর্ন বাংলাদেশের সমান একটি এলাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় তবে মানুষ মরবে মাত্র ১২ লাখ ৫৮ হাজার! আর আমাদের দেশে এমন অনেক এলাকাও আছে যেখানে মাত্র একটি উপজেলাতেই ১২ লাখ মানুষ মারা সম্ভব। কারন মানুষ মারতে হলেতো মানুষ থাকতে হবে, যদি মানুষই না থাকে তাহলে মানুষ মারবে কিভাবে?

এরপর দেখুন কানাডার হিসাব। কানডা প্রায় ৬৮ টি বাংলাদেশের সমান। এত বড় একটি দেশকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেও মরবে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ। কানাডায় বাংলাদেশের সমান একটি এলাকাকে পারমানবিক বোমা মেরে ধংস করে দিলেও মরবে মাত্র ৫ লাখ ৫১ হাজার আর সম্পূর্ন বাংলাদেশকে পারমানবিক বোমা মেরে ধংস করলে মরবে ১৮ কোটি!

এইতো গেলো বাংলাদেশের চাইতে কম জনসংখ্যার দুইটি দেশের উদাহারন। এখন দেখুন বাংলাদেশের চাইতে জনসংখ্যা বেশি এমন দেশে হামলা হলেও মানুষ কম মরবে তার যুক্তি। কোন আবোল তাবোল কথা নয় বরং সরাসরি গানিতিক হিসাব কষে দেখিয়ে দিচ্ছি আমার কথার ভিত্তি। প্রথমেই ধরুন আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতের কথা। ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। বাংলাদেশের চাইতে অনেক বেশি। তবুও ভারতে হামলা হলে কম মানুষ মরবে কারন জনসংখ্যা বেশি হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। ভারতের আয়তন ৩২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। যা ২২টি বাংলাদেশের চাইতেও বড়! জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। আমরা বাংলাদেশে বাস করি ১৮ কোটি মানুষ কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের সমান এলাকাতে গড়ে ৫ কোটি ৯০ লাখের মতো মানুষ বাস করে। (১৩০০০০০০০০÷ ২২= ৫৯০৯০৯০৯)।

এবার ধরুন বাংলাদেশে পারমানবিক বোমা মেরে পুরোপুরি ধংস করে দিলে মানুষ মারা যাবে ১৮ কোটি কিন্তু সেই একই শক্তি সম্পন্ন বোমাটি ভারতে মেরে বাংলাদেশের সমান একটি এলাকাকে সম্পূর্ন ধংস করে দিলে মারা যাবে ৫ কোটি ৯০ লাখ! কারন বাংলাদেশের সমান এলাকাতে ভারতে গড়ে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বাস করে। একই রকম হামলায় ভারতের চাইতে বাংলাদেশে ৩ গুনেরও বেশি মানুষ নিহত হবে।

একইরকম ভাবে চীনের বিষয়টি হিসাব করে দেখুন। চীনের জনসংখ্যা পৃথীবিতে সবচেয়ে বেশি হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশ বা ভারতের চাইতে কম। চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটির মতো। আয়তন ৯৬ লাখ বর্গ কিলোমিটার। যা প্রায় ৬৬ টি বাংলাদেশের সমান। অতএব চীনে ১৪০ কোটি মানুষ বাস করে ৬৬টি বাংলাদেশের সমান এলাকায়। তাহলে ১টি বাংলাদেশের সমান এলাকায় বাস করে (১৪০০০০০০০০ ÷ ৬৬ = ২১২১২১২১ জন) মাত্র ২ কোটি ১২ লাখ মানুষ। এতএব চীনে হামলা চালিয়ে বাংলাদেশের সমান সম্পূর্ন একটি এলাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেও মারা যাবে মাত্র ২ কোটি ১২ লাখ মানুষ আর বাংলাদেশে একই ভাবে হামলা করে সম্পূর্ন দেশ ধংস করলে মরবে ১৮ কোটি মানুষ যা চীনেরর তুলনায় সাড়ে আটগুন বেশি!

ঠিক তেমনি ধরে ধরে আফগানস্তানের সকল মানুষকে মেরে ফেললে নিহতের সংখ্যা হবে ৩ কোটি ২২ লাখ আর বাংলাদেশে ৩ কোটি ২২ লাখ মানুষ মারতে শুধু ঢাকা বিভাগই যথেস্ট, অন্য বিভাগগুলোর হিসাবতো বাদই দিলাম।

এভাবে আপনি নিজেই অন্যসব যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষন করে দেখতে পারেন যে কেন বাংলাদেশে এত সহজে এত বেশি মানুষ মারা সম্ভব হলো। এর মূল কারন হলো জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব। ছোট দেশ হওয়ায় এবং সেই তুলনায় জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় হানাদার বাহিনী সহজেই বেশি মানুষ মারতে পেরেছে। কারন যেখানেই তারা অভিযান চালিয়েছে সেখানেই হাতের কাছে হাজার হাজার মানুষ পেয়েছে। ছোট একটি এলাকাতে অভিযান চালিয়েও কয়েক হাজার মানুষ মারতে পেরেছে যা অন্য দেশগুলোর বেলায় সম্ভব নয়। কারন সেখানে এত মানুষই নেই তাহলে এত মানুষ মারবে কিভাবে ?

আসলে অন্য বিভিন্ন বড় বড় গনহত্যার সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ি আরো বেশি মানুষ মারা যাওয়ার কথা কিন্তু দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের কারনে কম মানুষ মারা গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা যদি প্রতিরোধ গড়ে না তুলতো তবে ৩০ লাখের চাইতেও অনেক বেশি মানুষ হয়তো মারা যেত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জনসংখ্যার ৪.২% মানুষ নিহত হয়েছে। যা অন্যান্য বড় বড় গনহত্যার সাথে তুলনা করলে অনেক কম বলেই দেখা যায়।
কি আজাইরা প্যাচাল মনে হচ্ছে? ভাবছেন ৩০ লাখ সংখ্যাটাই তো অনেক বেশি, এর চাইতে বেশি মারা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?
চলুন তাহলে অন্যান্য ভয়ংকর কিছু গনহত্যার সাথে তুলনা করে দেখি বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা ভালো ছিলো!!!

বিশ্বের অন্যান্য কিছু গনহত্যার সাথে ১৯৭১ এ বাংলাদেশের গনহত্যার তুলনামূলক বিশ্লেষন:

কম্বোডিয়ার গনহত্যা পৃথীবির একটি অন্যতম নৃশংসতম গনহত্যা। এই গনহত্যায় কম্বোডিয়ার খেমারুজরা তাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯% মানুষকে হত্যা করে!
তাদের দেশের মোট জনসংখ্যা তখন ছিলো ৭০ লাখ। এর ভিতরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই গনহত্যায় নিহত হয়! ৭০ লাখের ভিতরে যদি ২০ লাখ মানুষ হত্যা করা সম্ভব হয় তাহলে ৭ কোটির ভিতরে ৩০ লাখ হত্যা করা কি অসম্ভব কিছু ?

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিলো ৭ কোটি। বাংলাদেশে যদি কম্বোডিয়ার মতো মোট জনসংখ্যার ২৯% মানুষকে হত্যা করা হতো তাহলে নিহতের সংখ্যা হতে পারতো (৭০০০০০০০× ২৯% = ২০৩০০০০০) ২ কোটি ৩ লাখ! এর থেকে বোঝা যায় ৩০ লাখ সংখ্যাটা কোন অবিশ্বাস্য সংখ্যা নয় বরং কম্বোডিয়ার গনহত্যার সাথে আক্রমনের ভয়াবহতার তুলনা করলে দেখা যায় যে বাংলাদেশের মতো দেশে ২ কোটি ৩ লাখ মানুষও হত্যা করা সম্ভব!
কম্বোডিয়াতে যদি দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯% মানুষ হত্যা করা সম্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪% মানুষ হত্যার ঘটনা আপনার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছে?

এরপর চলুন দেখি রুয়ান্ডার গনহত্যার সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করে। রুয়ান্ডার গনহত্যায় মাত্র ১০০ দিনে মোট জনসংখ্যার ২০% মানুষকে হত্যা করা হয়! অতএব রুয়ান্ডার সাথে তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশে যদি রুয়ান্ডার মতো ভয়াবহ হামলা করা হতো তাহলে (৭০০০০০০০× ২০% = ১৪০০০০০০০) মাত্র সোয়া তিন মাসেই ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষও হত্যা করা সম্ভব এবং ৯ মাসে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষও হত্যা করা সম্ভব। ( যদিও এমনটা কেউ করেনি কিন্তু চাইলে করা সম্ভব। রুয়ান্ডার ঘটনা সেটাই প্রমান করে)। রুয়ান্ডাতে যদি তাদের দেশের ২০% মানুষ হত্যা করা সম্ভব হতে পারে তাহলে বাংলাদেশে ৪% মানুষ হত্যার কথা আপনার কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছে ?

এবার চলুন নজর দেই চীনের নানকিং গনহত্যার দিকে।

নানকিং গনহত্যার সময় জাপানি সৈন্যরা একজন চীনা নাগরিককে শরীর থেকে মস্তক দিখন্ডিত করে হত্যা করার আগ মূহর্তের ছবি
নানকিং গনহত্যার সময় জাপানি সৈন্যরা একজন চীনা নাগরিককে শরীর থেকে মস্তক দিখন্ডিত করে হত্যা করার আগ মূহর্তের ছবি

চীনের নানকিং গনহত্যায় ১ মাসে ৮০ হাজার নারীকে ধর্ষন এবং ৩ লাখ মানুষকে হত্যা করে জাপানি সৈন্যরা। আগেই হিসেব কষে দেখিয়েছি যে চীনের জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম। বাংলাদেশের চাইতে জনসংখ্যার ঘনত্ব কয়েকগুন কম থাকার পরেও চীনে যদি এক মাসে ৩ লাখ মানুষ হত্যা করা সম্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশে ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা আপনার কাছে “গাজাখুরি গল্প” মনে হচ্ছে?

একবার এক বিদেশি বীজে জন্ম নেয়া বাংলাদেশি পরগাছা আমাকে তাচ্ছিল্য করে হাসতে হাসতে বলেছিলো, “পাকিস্তানি সৈন্যরা মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করে আবার ৩ লাখ নারীকে ধর্ষন করার সময় পেলো কিভাবে ? শরীরও তো ক্লান্ত ছিলো। ক্লান্ত শরীরে এসব করা যায়?” সেই ধরনের সকল পরগাছাদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই জাপানি সৈন্যরা মাত্র ১ মাসে নানকিংয়ের ৩ লাখ মানুষকে হত্যা করে আবার ৮০ হাজার নারীকে ধর্ষন করার সময় পেলো কিভাবে? তাদের শরীর ক্লান্ত হয়নি?

১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর গনধর্ষনের পর ফেলে রেখে যাওয়া এক মূমূর্ষ নারী
১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর গনধর্ষনের পর ফেলে রেখে যাওয়া এক মূমূর্ষ নারীকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পরিবারের এক সদস্য

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের আরও ছবি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

এরপর ধরুন আর্মেনিয় জাতির উপর চালানো গনহত্যার কথা। তখন আর্মেনিয়দের মোট জনসংখ্যাই ছিলো মাত্র ৪৩ লাখের মতো। এই ৪৩ লাখের ভিতরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষকেই তুর্কী বাহিনী হত্যা করে। এখন চিন্তা করুন একটা জাতির ৪৩ লাখ মানুষের ভিতরে যদি ১৫ লাখকেই হত্যা করা যায় তাহলে বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের ভিতরে ৩০ লাখ নিহত হওয়ার কথা কেন আপনার কাছে অবান্তর মনে হয়?

ভিয়েতনাম যুদ্ধে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ নিহত হয়। এই যুদ্ধে হানাদার আমেরিকার ৫৮ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং আহত ও পঙ্গু হয় ৩ লাখ সৈন্য। ভিয়েতনামে যদি ৬০ লাখ মানুষ নিহত হতে পারে তাহলে বাংলাদেশে ৩০ লাখ নিহত হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। যদিও ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা জিততে পারেনি, কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর হমলার চাইতে ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনী আরো ভয়াবহ হামলা করেছিলো তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভিয়েতনামকে নিশ্চিন্হ করে দিতে চেয়েছিলো আমেরিকা। মার্কিন সরকার বোধহয় তখন পাগলা কুকুরের চাইতেও বেশি পাগল হয়ে গিয়েছিলো।

এছাড়া হিটলারের গনহত্যার কথা, সম্রাট অশোকের গনহত্যার কথা সহ আরো বহু ঘটনা রয়েছে। কত উদাহারন দিতে হবে আপনাদের?

আপনারা আসলে কি বলতে চান? পৃথীবির সব গনহত্যার ঘটনা সত্য শুধু বাংলাদেশেরটাই মিথ্যা ? নাকি পৃথীবির সব ঘটনাই মিথ্যা শুধু আপনাদের অনুমান নির্ভর সন্দেহটাই সত্য ?

ভাবতে লজ্জা হয়। কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, চীন, জাপান, আর্মেনিয়া বা ইহুদিরা কখনো বলেনি যে আমাদের দেশে এত মানুষ কিভাবে মরলো? তারা বলেনি যে, আমাদের নেতা ভুল করে বলেছেন। তারা বলেনি আমার গ্রামে একজনও মরেনি। তারা কেউ নিহতেদের তালিকা চায়নি। মনে হয় এসব দেশ ও জাতির লোকেরা অশিক্ষিত, বোকা, মিথ্যাবাদি। দুনিয়াতে শুধু আপনারা বা আপনিই বিজ্ঞ, বিচক্ষন, বিবেকবান ও মহা সত্যবাদী!

যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা দূর্ঘটনা ঘটলেও আপনি দেখবেন যে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বা যেসব দেশে জনসংখ্যা বেশি সেসব দেশে বেশি মানুষ মারা যায়।

এরপর যেই কান্ডজ্ঞানহীন প্রশ্নটি করা হয় সেটি হলো- “৩০ লাখ নিহত মানুষের তালিকা কই ? নিহতদের তালিকা দেখান, তাহলে বিশ্বাস করবো।”
যারা এই ধরনের কথা বলেন তারা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান মনে করেন । কিন্তু বেশি বাস্তবধর্মী ও বিজ্ঞ হতে গিয়ে তারা যে তাদের কমনসেন্সটাই হারিয়ে ফেলেছেন তা নিজেরাই খেয়াল করেননি।

ভাইজান মনে রাখবেন, এটা যুদ্ধ। যুদ্ধ মানে “যুদ্ধ”। কোন ক্রিকেট খেলার স্টেডিয়াম নয় যে গুনে গুনে টিকেট বিক্রি করে লোক মাঠে ঢুকানো হবে বা স্কুলের কোন ক্লাসরুম নয় যে হাজিরা খাতা গুনে গুনে কয়জন ক্লাসে উপস্থিত ছিলো তা জানা যাবে।

কত মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর হাতে মারা পরে, কত মানুষ আহত হয়ে ধুকে ধুকে মরে, কত মানুষ শত্রুর হাতে আটক হয়ে পরে তাদের হাতে মারা যায়, কত লাশ রাস্তা-ঘাটে পরে থাকে, কত লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, কত লাশ গোপনে মাটি চাপা দেয়া হয়, কত লাশ কামানের গোলায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিক সেদিক পরে থাকে তা কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে তালিকা বানিয়ে গুনে গুনে হিসাব করা সম্ভব?

১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হত্যার পর ভ্যানগাড়ির উপরে পরে রয়েছে লাশ
১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হত্যার পর ভ্যানগাড়ির উপরে পরে রয়েছে লাশ

সামরিক বাহিনীতে চাকুরীরত সৈনিকরা নিহত হলে তাদের তালিকা করা সম্ভব, কারন তাদের সব তথ্যই নিজেদের বাহিনী ও কমান্ডারদের কাছে থাকে কিন্তু সাধারন জনগন নিহত হলে সেগুলোর তালিকা করা সম্ভব নয়। আর এটা চার-পাঁচশো মানুষের বিষয় নয় বরং লাখ লাখ মানুষের বিষয়।

বাংলাদেশ আমার নিজের দেশ বলে বলছিনা বরং সব দেশেরই এই অবস্থা। আপনি খোজ নিয়ে দেখুন কোন দেশেরই যুদ্ধে নিহত নাগরিকের তালিকা নেই। কারন এটা করা আসলেই সম্ভব নয়। সীমান্তে দুই-চার দিনের মারামারি আর পুরোদমে যুদ্ধ কিন্তু এক বিষয় নয়। খোজ নিয়ে দেখুন ইরাক, আফগানস্তান, সিরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিন কোরিয়া, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ড বা আমেরিকা কোন দেশেই তাদের যুদ্ধে নিহত নাগরিকের পূর্নাঙ্গ তালিকা নেই। কারন পূর্নাঙ্গ তালিকা করা সম্ভব নয়।

উপরের সবগুলো যুক্তি প্রমান বিশ্লেষন করলে বোঝা যায় যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৩০ লাখ সংখ্যাটা কোন অবান্তর সংখ্যা নয় বরং খুবই বাস্তবসম্মত একটি সংখ্যা। পাকিস্তানকে দোষ দেয়ার জন্য ইচ্ছাকরে বাড়িয়ে ৩০ লাখ বলা হয়নি। বাংলাদেশতো চুক্তি অনুযায়ি আত্মসমর্পন করা পাকিস্তানি সৈন্যদের ফিরে যেতে দিয়েছে এবং আত্মসমর্পন করা সৈনদের ফিরে যেতে দিবে এই সিদ্ধান্তটা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বাধীনতা অর্জনের আগেই নেয়া হয়েছে। তাহলে পরবর্তিতে পাকিস্তানের দোষ বাড়িয়ে বলে বাংলাদেশের লাভ কি? পাকিস্তান কি বাংলাদেশকে কোন ক্ষতিপুরন দিয়েছে যে বেশি ক্ষতিপুরন পাবার আশায় বাংলাদেশ নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলবে? বাংলাদেশ কখনোই পাকিস্তানের কাছে ক্ষতিপুরন আশা করেনা এবং ক্ষতিপুরন পাবার আশায় কখনো হাত পাতেনি (ক্ষতিপুরনের আশায় বাংলাদেশে কোন আবেদন করেনি এবং মামলাও করেনি)। তাহলে বাংলাদেশ কেন শুধু শুধু নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলতে যাবে ?

সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করে ৩০ লাখ নিহত হওয়ার সংখ্যাটি বলা হয়েছে। আগেই অন্যান্য দেশের বিভিন্ন গনহত্যার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষন করে দেখিয়েছে যে অন্যান্য দেশে যেখানে ২০%, ২৫%, বা ৩০% মানুষ নিহত হয়েছে সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ৪% মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলতে চাইলে ঐসব দেশের মতো আরো বড় একটা সংখ্যা বলতে পারতো কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি।

আর আরেকটা বিষয় আমি মনে করিয়ে দিতে চাই। যেকোন যুদ্ধে নিহত মানে এই নয় যে সরাসরি শত্রুদেশের সৈন্যের গুলি খেয়ে মরতে হবে। আরো বিভিন্ন ভাবে মানুষ মারা যেতে পারে। আমি যেহেতু এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিবৃতি নিয়ে কথা বলছি তাই বাংলাদেশের কথাই ধরুন। মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষ বলতে শুধু পাকিস্তানি সৈন্যরা নিজ হাতে সরাসরি যাকে গুলি করে মেরেছে তাকে হিসাবে ধরলেই হবেনা। অনেক মানুষ আছে যারা রাজাকার, আল বদর, আল শামস এর হাতে মরেছে। অনেক মানুষ নিখোজ হয়েছে যাদেরকে পরবর্তিতে আর খুজে পাওয়া যায়নি, তাদেরকেও নিহতের তালিকায় ধরতে হবে। অনেক মানুষ আছে যুদ্ধের কারনে চিকিৎসা না পেয়ে মরেছে। অনেক মানুষ যুদ্ধের কারনে না খেতে পেয়ে মরেছে। অনেক মানুষ ঔষধ না পেয়ে মরেছে। বাড়িঘর ধংস হয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন থাকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মরেছে। এমন আরো অনেক মানুষ মরেছে যুদ্ধের কারনে সৃষ্টি হওয়া বিরুপ পরিস্থিতির জন্য। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো তাদের মৃত্যু হতোনা। এরাও মুক্তিযুদ্ধে নিহত। এদেরকেও হিসাবে ধরতে হবে। যদিও পাকিস্তানি বাহিনী সরাসরি এদের হত্যা করেনি কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিরা হত্যা করেছে অথবা পাকিস্তানি বাহিনীর সৃষ্টি করা পরিস্থিতিতে পরে মৃত্যু বরন করেছে। এগুলো সব মিলিয়ে হিসেব করলে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ নয় বরং আরো অনেক বেশি হবে। তবে আমি সব মিলিয়েই ৩০ লাখ ধরে নিলাম। এতএব দেখা যাচ্ছে কোন যুক্তিতেই ৩০ লাখ সংখ্যাটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি ভুল করেও বলা হয়নি আর ইচ্ছা করে বাড়িয়েও বলা হয়নি। সুতরাং দ্বিধাগ্রস্থ না থেকে সংগত কারনেই ৩০ লাখ নিহত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেয়া উচিত।
যুক্তিসংগত মনে হলে লেখাটি সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইলো, আর কোন মতামত থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন। আপনার কমেন্টটি এপ্রুভ করার মতো হলে যখন আবার ওয়েবসাইটে ঢুকবো তখন এপ্রুভ করে দিবো।

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।