বাংলা সংবাদ

মুন সিনেমা হলের মালিককে ১০০ কোটি টাকা জরিমানা দিলো মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট!

প্রায় অর্ধশত বছর আগে বেহাত হওয়া পুরান ঢাকার মুন সিনেমা হলের জমির দাম পেয়েছেন ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলম।

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চে মুন সিনেমা হল মামলা নামে পরিচিত বহুল আলোচিত রিট মামলার শুনানিতে জমির দখলদার মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট তার হাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার চেক তুলে দেয়।
তবে মুন সিনেমা হলের মালিক বলেছেন এটি জরিমান নয়, এটি শুধু জমি ও ভবনের মূল্য।

৪৮ বছর আগে হারানো মুন সিনেমা হল ফিরে পেতে মুন সিনেমা হলের মালিক প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কসের করা এই রিট আবেদন থেকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের যুগান্তকারী রায় এসেছিল।

ওই মামলার ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার মুন সিনেমা হলের জমি শিগগির মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নামে নিবন্ধনের অঙ্গীকারনামা দেওয়ার পর প্রকৃত মালিককে জমির দাম দেওয়া হয়।
মামলার নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালত আগামী ৫ জানুয়ারি পরবর্তী আদেশের জন্য দিন রেখেছেন বলে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। মুন সিনেমা হলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি; সঙ্গে সাইফুল্লাহ মামুন। আর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মইনুল ইসলাম।
মাকসুদুল আলমের হাতে চেক হস্তান্তরের পর আদালত কত টাকা পেলেন তা মাকসুদুল আলমের কাছে জানতে চায়। আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের চেকটি পড়ে তিনি বলেন, ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সা।

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মুন সিনেমা হলের জমি ও স্থাপনার মূল্য বাবদ ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সা বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডকে পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল আপিল বিভাগ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করার পর শিল্প মন্ত্রণালয় তা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ন্যস্ত করে।

ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস মালিকানা দাবি করলেও পরিত্যক্ত ঘোষিত সম্পত্তি নিয়ে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বলে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানের তা আটকে যায়।
ওই সামরিক ফরমানকে বৈধতা দেওয়া সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস ২০০০ সালে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করে।

আবেদনটির শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৯ অগাস্ট হাই কোর্ট যে রায় দেয়, তাতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাগ্রহণ সংবিধানবহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হয়।

হাই কোর্টের রায় বহাল রেখে ৯০ দিনের মধ্যে মুন সিনেমা হল ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডকে ফেরত দিতে ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

সিনেমা হলের জমির দখল না দেওয়ায় ২০১২ সালের ১০ জানুয়ারি ভূমিসচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করে ইতালিয়ান মার্বেল কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের শুনানিতে মুন সিনেমা হল আগের অবস্থায় ফেরত দেওয়ার কোনো উপায় নেই জানিয়ে মালিককে জমির ও সিনেমা হলের মূল কাঠামোর মূল্য ধরে দাম পরিশোধ করা যেতে পারে বলে মত দেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

আপিল বিভাগের কাছ থেকে সিনেমা হলের জমি, স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব পেয়ে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ৯৯ কোটি ২১ লাখ টাকা দাম নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দেন|

ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বছরের ১৮ জানুয়ারি মুন সিনেমা হলের মালিককে ওই অর্থ তিন কিস্তিতে পরিশোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে নির্দেশ দেয় আদালত।

আদেশে বলা হয়, প্রথম কিস্তিতে দুই মাসের মধ্যে ২৫ কোটি টাকা, পরের দুই মাসের মধ্যে আরও ২৫ কোটি এবং বাকি টাকা আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট বলে আসছিল, এত টাকা দিতে তারা অপারগ। সরকারকেই এ দায় শোধ করতে হবে।

নির্ধারিত সময়ে তারা অর্থ পরিশোধ না করায় গত ১ জুলাই আপিল বিভাগ দ্রুত অর্থ পরিশোধের জন্য মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষকে মৌখিক নির্দেশ দেয়। আদালত বলে, অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তলব করা হবে।

পরে গত বছরের ৮ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত এক চিঠি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে উপস্থাপন করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, “মুন সিনেমা হল ও এর সম্পত্তির মূল্য বাবদ ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সা পরিশোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ওইদিন অর্থ পরিশোধের জন্য সরকার তিন মাসের সময় চাইলে আদালত ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মধ্যে টাকা পরিশোধ না করে সরাকার আবারও সময় চাইলে ১০ ডিসেম্বর আদালত প্রায় সাত মাস সময় দিয়ে ২০১৯ সালের ৩০ জুন আদেশের জন্য রাখে।

পরবর্তীতে গত ১৭ অক্টোবর জমির নিবন্ধন প্রক্রিয়া ১০ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে পক্ষগুলোকে নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ।

এরপরও চেক ইস্যু ও জমির নিবন্ধন সংক্রান্ত জটিলতায় আরও কয়েক দফা সময় নেওয়ার পর মঙ্গলবার এর রফা হলো।

ট্যাগ গুলো

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।