নিবন্ধ

রোমান্টিক প্রেমের কবিতা (১১ জন লেখকের সেরা কবিতা)

রোমান্টিক প্রেমের কবিতা, ভালোবাসার ছন্দ, বাংলা ভালোবাসার কবিতা

এখানে আপনাদের জন্য বাংলা সাহিত্যের সেরা কিছু বাংলা রোমান্টিক প্রেমের কবিতা তুলে ধরছি। ভালোবাসার কবিতা বা প্রেমের কবিতা মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। যেকোন স্বপ্নবিলাসী মানুষের কাছেই রোমান্টিক প্রেমের কবিতা পড়তে ভালো লাগার কথা। তাই আপনাদের জন্য আমরা এখানে বেশ কয়েকজন লেখকের এমন কিছু বাংলা প্রেমের কবিতা তুলে ধরছি যা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কবিতাগুলো আপনার মনেও এক অজানা শিহরন সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ্বাস। চলুন তবে শুরু করা যাক।

শহীদ কাদরীর রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

প্রথমেই শহীদ কাদরীর কবিতা দিয়ে শুরু করছি। আসলে এই কবিতাটি দেশকে ভালোবেসে লেখা হয়েছিলো তবে এটি রোমান্টিক প্রেমের কবিতা হিসেবেও স্বীকৃত। আপনি যেই দৃষ্টিতেই দেখুন না কেন আশা করি ভালো লাগবে।

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা
– শহীদ কাদরী

ভয় নেই
আমি এমন
ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
.
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।
.
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।
.
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর
সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক,
প্রিয়তমা!
.
সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো,
শেষ হবে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয়
পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।
.
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি,
প্রিয়তমা।
.
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন
আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-
বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে গোলাপ
কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার
লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
.
ভয় নেই, ভয় নেই, ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।

হেলাল হাফিজের রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

এই অংশে আপনাদের জন্য হেলাল হাফিজের ২টি প্রেমের কবিতা তুলে ধরছি। দুইটি কবিতাই খুব সুন্দর।

তুমি ডাক দিলে
– হেলাল হাফিজ

একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থূল অনটন আজম্ন ভেতরে আমার।
তুমি ডাক দিলে
নষ্ঠ কষ্ঠ সব নিমিষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌছুবো
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না।
.
তুমি ডাক দিলে
সীমাহীন খাঁ খাঁ নিয়ে মরোদ্যান হবো,
তুমি রাজি হলে
যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো।
.
একবার আমন্রণ পেলে
সব কিছু ফেলে
তোমার উদ্দেশে দেবো উজাড় উড়াল,
অভয়ারণ্য হবো কথা দিলে
লোকালয়ে থাকবো না আর
আমরণ পাখি হয়ে যাবো,
খাবো মৌনতা তোমার।

 হৃদয়ের ঋণ
– হেলাল হাফিজ

আমার জীবন ভালোবাসাহীন গেলে
কলঙ্ক হবে কলঙ্ক হবে তোর,
খুব সামান্য হৃদয়ের ঋণ পেলে
বেদনাকে নিয়ে সচ্ছলতার ঘর
বাঁধবো নিমেষে। শর্তবিহীন হাত
গচ্ছিত রেখে লাজুক দু’হাতে আমি
কাটাবো উজাড় যুগলবন্দী হাত অযুত স্বপ্নে।
শুনেছি জীবন দামী, একবার আসে,
তাকে ভালোবেসে যদি
অমার্জনীয় অপরাধ হয় হোক,
ইতিহাস দেবে অমরতা নিরবধি
আয় মেয়ে গড়ি চারু আনন্দলোক।
.
দেখবো দেখাবো পরস্পরকে খুলে
যতো সুখ আর দুঃখের সব দাগ,
আয় না পাষাণী একবার পথ ভুলে
পরীক্ষা হোক কার কতো অনুরাগ।

মাহাদেব সাহার রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

চিঠি দিও
– মহাদেব সাহা

করুণা করে হলে চিঠি দিও,
খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়,
বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়
বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও!
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি
আসবেন অচেনা রাজার লোক
তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।
এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা,
সেন্টের শিশির চেয়ে
তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ
এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো,
তোমার কুশল!
ওই তো রাজার লোক যায় ক্যাম্বিসের জুতো
পায়ে, কাঁধে ব্যাগ,
হাতে কাগজের একগুচ্ছ জীজন ফ্লাওয়ার
কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর
ঝোপ, কারো নিবিড় বকুল
এর কিছুই আমার নয় আমি অকারণ
হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি,
আমার কি কোনো কিছু নাই?
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে
একখানি চিঠি দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো
একা লাগে, তাই লিখো
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও
বলো, ভালোবাসি।

মানিক হায়দারের রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

যে আমাকে প্রেম শেখালো
-মাকিদ হায়দার

যে আমাকে প্রেম শেখালো
জোৎস্না রাতে ফুলের বনে
সে যেন আজ সুখেই থাকে
সে যেন আজ রানীর মত
ব্যক্তিগত রাজ্যপাটে
পা ছড়িয়ে সবার কাছে
বসতে পারে
বলতে পারে মনের কথা
চোখের তারায়
হাত ইশারায়
ঐ যে দেখ দুঃখি প্রেমিক
যাচ্ছে পুড়ে রোদের ভিতর
ভিক্ষে দিলে ভিক্ষে নেবে
ছিন্ন বাসে শীর্ন দেহে
যাচ্ছে পুড়ে রোদের ভিতর
কিন্তু শোন প্রজাবৃন্দ
দুঃসময়ে সেই তো ছিলো
বুকের কাছে হৃদয় মাঝে
আজকে তারে দেখলে শুধু
ইচ্ছে করে
চোখের পাতায় অধর রাখি
বিজ্ঞাপন
যে আমাকে প্রেম শেখালো
প্রেম শিখিয়ে চিনিয়েছিলো
দুষ্টু গ্রহ অরুন্ধতী
বৃষ্টি ভেজা চতুর্দশী
জোৎস্না রাতের উজ্জ্বলতা
ভোরের বকুল শুভ্র মালা
নগর নাগর ভদ্র ইতর
রাজার বাড়ি
সেই তো আবার বুঝিয়েছিলো
যাওগো চলে আমায় ছেড়ে
যে আমাকে প্রেম শেখালো
জোৎস্না রাতে ফুলের বনে
সে যেন আজ সুখেই থাকে
নিজের দেহে আগুন জ্বেলে
ভেবেছিলাম
নিখাদ সোনা হবোই আমি
শীত বিকেলের টুকরো স্মৃতি
রাখবো ধরে সবার মত
হৃদয় বীণার মোহন তারে
ভুলেই গেলাম
যখন তুমি আমায় ডেকে
বললে শুধু
পথের এখন অনেক বাকি
যাও গো শোভন
যাও গো চলে বহুদুরে
কণ্ঠে আমার অনেক তৃষা
যাও গো চলে আপন পথে
এই না বলেই
হাসলে শুধু করুন ঠোঁটে
বাজলো দুরে শঙ্খ নিনাদ
কাঁদলো আমার বুকের পাথর
কাঁদলো দুরে হাজার তারা
একলা থাকার গভীর রাতে
একলা জাগার তিন প্রহরে
তাইতো বলি সবার কাছে
যে আমাকে দুঃখ দিলো
সে যেন আজ সবার চেয়ে
সুখেই থাকে
যে আমাকে প্রেম শেখালো
প্রেম শিখিয়ে বুকের মাঝে
অনল দিলো
সে যেন আজ সবার চেয়ে
সুখেই থাকে
সুখেই থাকে

জয় গোস্বামীর রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

এটি আমার খুব প্রিয় একটা কবিতা, পড়ে দেখুন। আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে।

পাগলি
-জয় গোস্বামী

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন
এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা
পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।
.
অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে
তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন
পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।
.
মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লোকসান
লোকাসান পুষিয়ে তুমি রাঁধবে মায়া প্রপন্ঞ্চ ব্যন্জ্ঞন
পাগলী, তোমার সঙ্গে দশকর্ম জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে বই দেখব প্যারামাউন্ট হলে
মাঝে মাঝে মুখ বদলে একাডেমি রবীন্দ্রসদন
পাগলী, তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে কলাকেন্দ্র কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে বাবুঘাট জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে দেশপ্রিয় কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে সদা সত্য জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘কী মিথ্যুক’ কাটাব জীবন।
.
এক হাতে উপায় করব, দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি
রেস খেলব জুয়া ধরব ধারে কাটাব সহস্র রকম
লটারি, তোমার সঙ্গে ধনলক্ষ্মী জীবন কাটাব
লটারি, তোমার সঙ্গে মেঘধন কাটাব জীবন।
.
দেখতে দেখতে পুজো আসবে, দুনিয়া চিত্‍কার করবে সেল
দোকানে দোকানে খুঁজব রূপসাগরে অরূপরতন
পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে রিডাকশনে কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।
.
কবিত্ব ফুড়ুত্‍ করবে, পিছু পিছু ছুটব না হা করে
বাড়ি ফিরে লিখে ফেলব বড়ো গল্প উপন্যাসোপম
পাগলী, তোমার সঙ্গে কথাশিল্প জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে বকবকম কাটাব জীবন।
.
নতুন মেয়ের সঙ্গে দেখা করব লুকিয়ে চুরিয়ে
ধরা পড়ব তোমার হাতে, বাড়ি ফিরে হেনস্তা চরম
পাগলী, তোমার সঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে হেস্তনেস্ত কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে পাপবিদ্ধ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধর্মমতে কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজা বেদি জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে মধুমালা কাটাব জীবন।
.
দোঁহে মিলে টিভি দেখব, হাত দেখাতে যাব জ্যোতিষীকে
একুশটা উপোস থাকবে, ছাব্বিশটা ব্রত উদযাপন
পাগলী, তোমার সঙ্গে ভাড়া বাড়ি জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে নিজ ফ্ল্যাট কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যাওড়াফুলি জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যামনগর কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে রেল রোকো জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে লেট স্লিপ কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে আশাপূর্ণা জীবন কাটাব
আমি কিনব ফুল, তুমি ঘর সাজাবে যাবজ্জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় জওয়ান জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় কিষান কাটাব জীবন।
.
সন্ধেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই বিছানা আলাদা
হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ মধ্যরাতে আচমকা মিলন
পাগলী, তোমার সঙ্গে ব্রক্ষ্মচারী জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে আদম ইভ কাটাব জীবন।
.
পাগলী, তোমার সঙ্গে রামরাজ্য জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী কাটাব জীবন
পাগলী, তোমার সঙ্গে ছাল চামড়া জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে দাঁতে দাঁত কাটাব জীবন।
.
এর গায়ে কনুই মারব রাস্তা করব ওকে ধাক্কা দিয়ে
এটা ভাঙলে ওটা গড়ব, ঢেউ খেলব দু দশ কদম
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোঝড় জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘ভোর ভয়োঁ’ কাটাব জীবন।

নির্মলেন্দু গুনের রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

নির্মলেন্দু গুন বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম গুনী লেখক। তার লেখা কবিতাগুলোও খুব জনপ্রিয়। এখানে নির্মলেন্দু গুনের ২টি রোমান্টিক প্রেমের কবিতা আমরা আপনাদের জন্য তুলে ধরছি।

তোমার চোখ এতো লাল কেন?
– নির্মলেন্দু গুন

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য ।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত ।
.
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে ।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না ।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি ।
.
আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক ।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন ?

আক্রোশ
-নির্মলেন্দু গুণ

আকাশের তারা ছিঁড়ে ফেলি আক্রোশে,
বিরহের মুখে স্বপ্নকে করি জয়ী;
পরশমথিত ফেলে আসা দিনগুলি
ভুলে গেলে এতো দ্রুতো,হে ছলনাময়ী?
পোড়াতে পোড়াতে চৌচির চিতা নদী
চন্দনবনে আগ্নির মতো জ্বলে,
ভূকম্পনের শিখরে তোমার মুখ
হঠাৎ স্মৃতির পরশনে গেছে গলে ।
ফিরে গেলে তবু প্রেমাহত পাখি একা,
ঝড় কি ছিলো না সেই বিদায়ের রাতে
ভুলে গেলে এতো দ্রুত, হে ছলনাময়ী,
পেয়েছিলে তাকে অনেক রাত্রিপাতে ।
শব্দের চোখে করাঘাত করি ক্রোধে,
জাগাই দিনের ধূসর প্রতিচ্ছবি ।
না-পাওয়া মুখের মুখর সুষমা দিয়ে,
তবুও তোমার ছলনা-আহত কবি
তোমাকেই লেখে, তোমাকেই রচে প্রিয় !

মহাদেব সাহার রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন
-মহাদেব সাহা

আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে, রোস্তোরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের
মাঠে এমন একজন বন্ধু খুঁজে বেড়াই যাকে আমি
মৃত্যুর প্রাক্কালে উইল করে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি, কুৎসা
আমার লাম্পট্য, পরিবর্তে সে আমার চিরদিন যোগাবে ঘুমের ওষুধ
আমার অপরাধের ছুরি রেখে দেবে তার বুকের তলায়, আমার
পিতার কাছে চিঠি দেবে এই বলে – ওর কথা ভাববেন না, ও বড়ো ভালো ছেলে
নিয়মিত অফিস করে দশটা পাঁচটা; অথচ সে জানবে আমার
সব বদঅভ্যাস, স্বভাবের যাবতীয় দোষ
তবু সে যাবে আমার সাথে ক্যামেরায় ফিল্ম ভর্তি করে
নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক যুবকের ছবি তুলে নিতে, অবশেষে
মফস্বল শহরগামী কোনো এক ট্রেনে চড়ে নেমে যাবে
আমার সাথে ভুল ইস্টিশনে

বর্ষার কবিতা, প্রেমের কবিতা
— মহাদেব সাহা

বৃষ্টির কথা থাক, বিরহের কথা বলি।
শুনাই দুজনে বিদ্যাপতির বিষণ্ন পদাবলী,
বর্ষার কথা থাক, বকুলের কথা বলি।
ঝরা বকুলেই ভরে রাখি এই প্রশস্ত অঞ্জলি।
আকাশের কথা থাক, হৃদয়ের কথা শুনি।
যদিও বিরহ তবু মিলনের স্বপ্নজালই বুনি,
অশ্রুর কথা থাক, আবেগের কথা শুনি-
সহস্র রাত কেটে যাক
দূর আকাশের তারা গুনিব।
গরিমার কথা থাক, বিনয়ের পাঠ ধরি।
কলহের কোনো কাজ নেই, কিছু করুণার গান করি।
বিদ্যার কথা থাক, প্রেমের কবিতা পড়ি।
চারদিকে এই জলধারা তবু সৃষ্টির দ্বীপ গড়ি

আরন্যক বসুর রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

মনে থাকবে?
-আরণ্যক বসু

পরের জন্মে বয়স যখন ষোলই সঠিক
আমরা তখন প্রেমে পড়বো
মনে থাকবে?
বুকের মধ্যে মস্ত বড় ছাদ থাকবে
শীতলপাটি বিছিয়ে দেব,
সন্ধ্যাে হলে বসবো দুজন
একটা দুটো খসবে তারা
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,
ক্লান্ত কবির গান গাইবে
তখন আমি চুপটি করে দুচোখ ভরে থাকবো চেয়ে
মনে থাকবে?
এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব
এই জন্মের চুলের গন্ধ পরের জন্মে থাকে যেন
মনে থাকবে?
আমি হবো উড়নচণ্ডী
এবং খানিক উস্কোখুস্কো
এই জন্মের পারিপাট্য পরের জন্মে ঘুচিয়ে দেবো
তুমি কাঁদলে গভীর সুখে
এক নিমিষে সবটুকু জল শুষে নেবো
মনে থাকবে?
পরের জন্মে কবি হব
তোমায় নিয়ে হাজারখানেক গান বাঁধবো।
তোমার অমন ওষ্ঠ নিয়ে,
নাকছবি আর নূপুর নিয়ে
গান বানিয়ে-
মেলায় মেলায় বউল হয়ে ঘুরে বেড়াবো
মনে থাকবে?
আর যা কিছু হই বা না হই
পরের জন্মে তিতাস হবো
দোল মঞ্চের আবির হবো
শরৎকালের আকাশ দেখার
অনন্তনীল সকাল হবো;
এসব কিছু হই বা না হই
তোমার প্রথম পুরুষ হবো
মনে থাকবে?
পরের জন্মে তুমিও হবে
নীল পাহাড়ের পাগলা-ঝোরা
গায়ের পোশাক ছুড়ে ফেলে
তৃপ্ত আমার অবগাহন।
সারা শরীর ভরে তোমার হীরকচূর্ণ ভালোবাসা।
তোমার জলধারা আমার অহংকারকে ছিনিয়ে নিল।
আমার অনেক কথা ছিল
এ জন্মে তা যায় না বলা
বুকে অনেক শব্দ ছিল-
সাজিয়ে গুছিয়ে তবুও ঠিক
কাব্য করে বলা গেল না।
এ জন্ম তো কেটেই গেলো অসম্ভবের অসঙ্গতে
পরের জন্মে মানুষ হবো।
তোমার ভালবাসা পেলে
মানুষ হবোই মিলিয়ে নিও।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

ভালোবাসি, ভালোবাসি
__সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ধরো কাল তোমার পরীক্ষা
রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার।
হঠাত করে ভয়ার্ত
কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালোবাস?
তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো ক্লান্ত তুমি,
অফিস থেকে সবে ফিরেছ।
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত..
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘর্মাক্ত
আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালোবাস?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু
চাপ দিয়ে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম।
শশব্যস্ত হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-
ভালোবাস?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে।
মাথার উপর তপ্ত রোদ,বাহন
পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত
দাঁড়িয়ে পথ রোধ করে যদি বলি-ভালোবাস?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার
দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত
দিয়ে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো শেভ করছ তুমি,
গাল কেটে রক্ত
পড়ছে,এমন সময়
তোমার এক ফোঁটা রক্ত
হাতে নিয়ে যদি বলি-ভালোবাস?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত
আমার গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল
গলায় বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো খুব অসুস্থ তুমি,জ্বরে কপাল
পুড়েযায়।
মুখে নেই রুচি, নেই কথা বলার
অনুভুতি,এমন সময় মাথায়
পানি দিতে দিতে তোমার মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালোবাস?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?
নাকি তোমার গরম
শ্বাস আমার
শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে ভালোবাসি,ভালোবাসি..
ধরো যুদ্ধের
দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,
প্রচন্ড
যুদ্ধে তুমিও অঃশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর।
এমন সময়
পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালোবাস?
ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও?
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস
দেবে,বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি, দেরি হয়ে যাচ্ছে, বেরুতে যাবে, হঠাত
বাধা দিয়ে বললাম-ভালোবাস?
কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত
বুলাতে বুলাতে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি
ধরো প্রচন্ড
ঝড়, উড়ে গেছে ঘরবাড়ি, আশ্রয় নেই
বিধাতার দান এই
পৃথিবীতে, বাস করছি ।
দুজনে চিন্তিত
তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালোবাস?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার
করে বলি-ভালোবাস?
চুপ করে থাকবে?
নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে ভালোবাসি, ভালোবাসি..
যেখানেই যাও, যেভাবেই
থাক, না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো
ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি..
দূর থেকে শুনব তোমার
কন্ঠস্বর, বুঝব
তুমি আছ, তুমি আছ
ভালোবাসি, ভালোবাসি…..

রুদ্র গোস্বামীর রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

ভালোবাসা
– রুদ্র গোস্বামী।

তুই কেমন মেয়ে চাস?
আয়না ছাড়াই সোজা টিপ পরতে পারবে,
একাই শাড়ির কুচি ঠিক করতে পারবে,
আমি বললে কাজল পরবে।
.
এইটুকু?
-হ্যাঁ
.
তোর কেমন ছেলে চাই?
-হাত ধরে দুম করে বলবে ভালোবাসি, ব্যাস।
.
আর?
.
-আর কী? তারপর দুজনেই ঠিক করে নেব
আমাদের ভালোবাসা বেশি জরুরি না সাজ-পোশাক?

তসলিমা নাসরিনের রোমান্টিক প্রেমের কবিতা

তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশের একজন আলোচিত লেখিকা। বিভিন্ন বিতর্কিত লেখা বা মন্তব্যের জন্য তিনি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন। কারো কাছে তার লেখা খুব প্রিয় আবার কারো কাছে একদমই অপছন্দের। তবে তার অন্যান্য লেখা আপনার প্রিয় বা অপ্রিয় যাই হোকনা কেন এখানে আমরা তসলিমা নাসরিনের লেখা যে রোমান্টিক প্রেমের কবিতা তুলে ধরেছি তা আপনাদের ভালো লাগবে বলে আশা করি।

এখনো তুমি
-তাসলিমা নাসরিন

ভালোবাসা বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি
ঘৃণা বলতে এখনো তোমাকে
সংসার বলতে এখনো তোমাকে বুঝি
সুখ বলতেও আমি এখনো তোমাকে
কতটুকু পশু আছে, কতটা হিংস্রতা
কতটা দানব থাকে একজন মানুষের দেহে
তোমাকে আমল ছুঁয়ে জেনে, আমি সমস্ত জেনেছি
তোমার ত্বকের নিচে কতটুকু ক্লেদ
কতটা দ্রুদতা
চোখের তারায় তুমি কতটা রুখ পাপ
শরীরের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে আমি সকল বুঝেছি
স্বপ্ন বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি
কষ্ট বলতে এখনো তোমাকে
চুম্বনে তোমার লালা থেকে চুষে নেই
সংক্রামক ব্যাধি।
তোমাকে আরোগ্য করি
তোমাকে শুশ্রূষা করি
তোমাকে নির্মাণ করি আমার বিনাশে
জীবন বলতে এখনো তোমাকে বুঝি
মৃত্যু বলতেও আমি এখনো তোমাকে।

সুন্দর সুন্দর ভালোবাসার/ প্রেমের গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আশা করি এখানে উল্লেখিত রোমান্টিক প্রেমের কবিতা সমূহ আপনাদের ভালো লেগেছে। যদি আমাদের প্রচেষ্টা আপনাদের ভালো লেগে থাকে তাহলে শেয়ার করে উৎসাহ দেয়ার অনুরোধ রইলো। এমন আরো বিভিন্ন গল্প, কবিতা বা সাহিত্য বিষয়ক অন্যান্য লেখা পড়তে নিয়মিত Fancim.com -এ ভ্রমন করার আমন্ত্রন রইলো। ধন্যবাদ।

ট্যাগ গুলো
error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।