নিবন্ধ

শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প

শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প

এখানে বেশ কিছু ছোট ছোট শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প আপনাদের জন্য তুলে ধরা হয়েছে । আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে ।

একটি সুন্দর শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প আমাদের মানসিকতাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে । জাগ্রত করে আমাদের বিবেবকে, জীবনকে বুঝতে শিখায় । এখানে এমনই কিছু ছোট ছোট শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প তুলে ধরা হয়েছে । তবে এখানে উল্লেখিত গল্প সমূহ বাস্তব ঘটনা ও কল্পনার মিশ্রন ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে ।

১ নং ইসলামিক গল্প

পাপী ব্যক্তি তার পাপের শাস্তি পাবে

ইরাকের মুছেলের এক সৎ ব্যক্তি, যার নাম ছিল আলী ইবনু হারব। তিনি বলেন, আমি নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ক্রয় করার জন্য মুছেল থেকে সুররামান রায়া নামক স্থানে যাচ্ছিলাম। সে সময় দাজলা নদীতে কিছু নৌকা ছিল। যেগুলো ভাড়ায় লোকজন ও মালামাল পারাপার করত। আমি একটি নৌকায় আরোহণ করলাম। নৌকা আমাদেরকে নিয়ে সুররামান রায়ার দিকে চলতে শুরু করল। নৌকায় মালামাল ব্যতীত আমরা পাঁচ জন যাত্রী ছিলাম। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। আকাশ খুব পরিচ্ছন্ন ছিল। দাজলা নদীও ছিল শান্ত। নৌকা তরতর করে বয়ে চলছিল। যাত্রীদের অধিকাংশই তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। আমি দাজলা নদীর উভয় তীরের সৌন্দর্য অবলোকন করছিলাম। হঠাৎ পানি থেকে একটি বড় মাছ লাফিয়ে নৌকায় এসে পড়ল। আমি ছুটে গিয়ে মাছটি ধরে ফেললাম। বিশালকায় মাছের লেজের ঝাপটানিতে লোকদের তন্দ্রা দূর হয়ে গেল। মাছ দেখতে পেয়ে তাদের একজন বলল, এই মাছ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। আমরা সামনে কোন তীরে নেমে মাছটি ভুনা করে খাব। সকলে একমত হওয়ায় তীরের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দেওয়া হ’ল। আমরা তীরে অবতরণ করে ঘন গাছ বিশিষ্ট এক স্থানে অবস্থান করলাম, যাতে জ্বালানী জমা করে মাছটি রান্না করা যায়।
আমরা সেখানে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম। একটি মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে, পাশেই পড়ে আছে একটি ধারালো চাকু। অদূরে অন্য এক যুবক হাত-পা এবং মুখে কাপড় বাঁধা। সে বাঁধন মুক্ত হওয়ার প্রানান্ত চেষ্টা করছে। আমরা দ্রুত সামনে গিয়ে ঐ ব্যক্তির সকল বাঁধন খুলে দিলাম। তার চেহারায় অত্যন্ত ভীতি ও নিরাশার ছাপ ছিল। বাঁধন মুক্ত হয়ে সে বলল, দয়া করে আমাকে একটু পানি দাও। আমরা তাকে পানি দিলাম। এরপর আমাদেরকে সে পূর্ণ ঘটনা শুনাল। সে বলল, আমি ও এ মৃত ব্যক্তি একই কাফেলায় ছিলাম। আমরা মুছেল থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাগদাদ যাচ্ছিলাম। এ নিহত ব্যক্তি ভাবল যে, আমার নিকট অনেক অর্থ আছে। তাই সে আমার সাথে আন্তরিকতা গড়ে তোলে এবং আমার ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হয়। আমারও তার উপর যথেষ্ট ভরসা ছিল। কাফেলা বাগদাদ যাওয়ার পথে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এ তীরে তাঁবু ফেলল। রাতের শেষ ভাগে কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু আমি ঘুমিয়ে থাকায় কাফেলা রওয়ানা হওয়ার কথা জানতে পারিনি। আমার ঘুমের মধ্যে নিহত ব্যক্তি আমাকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। মুখও কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়, যাতে আমি চিৎকার করতে না পারি। এরপর সে আমাকে হত্যা করার জন্য মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার বুকের উপর বসে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তখন আমি বললাম, ওহে! তুমি আমার সকল সম্পদ নিয়ে নাও, তবুও আমাকে প্রাণে মের না। সে এতে রাযি হ’ল না; বরং তার বেল্টের সাথে বেঁধে রাখা ধারালো চাকু বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু সে সহজে চাকুটি বের করতে পারল না। ফলে সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চাকু বের করতে গেল। এতে চাকু তার নিজ গলায় বিদ্ধ হয়ে শাহরগ কেটে গেল। তার প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হ’লে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
এ পাপিষ্ঠ আমার চোখের সামনে তার পাপের শাস্তি পেয়ে গেল। আমি মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা আমরা যেখানে আছি, কম লোকই এই পথ দিয়ে যায়। ফলে বাঁধনমুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। অবশেষে আমি আল্লাহর নিকট দো‘আ করলাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট কাউকে পাঠিয়ে আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। আমি সর্বদা এ দো‘আই করছিলাম। এ কারণেই হয়ত আল্লাহ তোমাদেরকে পাঠিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন। বলতো, তোমরা কি কারণে এ জনমানবহীন স্থানে আসতে বাধ্য হয়েছ?কাফেলার লোকেরা বলল, একটা মাছ আমাদেরকে তোমার নিকট আসতে বাধ্য করেছে। যেটা পানি থেকে আমাদের নৌকায় লাফিয়ে উঠেছিল। আমরা এই মাছ ভুনা করে খাবার জন্য এখানে এসেছি। কাফেলার লোকদের কথা শুনে ঐ ব্যক্তি আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলা ঐ মাছটিকে তোমাদের নৌকায় পাঠিয়েছিলেন আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য। এরই মধ্যে মাছটি নৌকা হ’তে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবার ধারণা হ’ল যে, আল্লাহ মাছকে ঐ ব্যক্তির জীবন রক্ষার জন্যই পাঠিয়েছিলেন। এভাবে যখন আল্লাহ তা‘আলা কিছু করতে চান, তখন তার জন্য কারণ সৃষ্টি করে দেন (বুখারী হা/৩৭৭৩)। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘মযলূমের বদ দো‘আ থেকে দূরে থাক। কেননা মযলূমের দো‘আ এবং আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল থাকে না’। (বুখারী হা/২৪৪৮; মুসলিম হা/১৯; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক ২৬/৩৮৫; ইবনু মুল্লাকান, ত্বাবাকাতুল আওলিয়া ১/১৮০)।

২ নং ইসলামিক গল্প

আল্লাহ চাইলে খারাপ কিছু দিয়েও ভালো করতে পারেন

বনের ভেতর এক হরিনীর সন্তান জন্ম দেয়ার সময় হল৷
তাই সে বনের ধারে যেয়ে নদীর পাশে ঘাসজমিতে সুন্দর একটি জায়গা খুজে বের করে নিলো সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য। সময় কিছু পার হলো, তার প্রসব বেদনাও উঠলো।
কিন্তু বিধি বাম। এসময় হরিনীটির চারপাশে শুরু হলো বিপদ।
হরিনীটি যখন উপরে তাকালো, দেখলো ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে। সে যখন জংগলের দিকে তাকালো, দেখলো ঘন জংগলে হঠাৎ দাবানল শুরু হয়েছে। এর মাঝে সে টের পেলো তার সামনে এক ক্ষুধার্ত সিংহ তার দিকে এগিয়ে আসছে। আর পেছনে ফিরে দেখলো এক শিকারী তার দিকে তীর নিশানা করে আছে।
এখন সে কি করবে?
দিশেহারা সময়টিতে দাবানল, নদীর স্রোত, ক্ষুধার্থ সিংহ আর নির্দয় শিকারী দিয়ে চারদিক দিয়ে ঘিরে থাকা হরিনীটি তাই চুপচাপ কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে ভাবলো। তারপর সে তার সব বিপদ আপদ অগ্রাহ্য করে সিদ্ধান্ত নিলো সে তার সন্তান জন্ম দিবে। বিপদ আপদ যদি ঘটে ঘটুক। সেটির দায়িত্ব সে বিশ্বাসী মনে চোখ বুজে সৃষ্ঠিকর্তা মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলো।
সাথে সাথে কিছু মিরাকল ঘটলোঃ
– কালো মেঘে ঢাকা আকাশে তুমুল ঝড় বৃস্টি শুরু হলো। সেই সাথে প্রচন্ড বজ্রপাতে শিকারীর চোখ অন্ধ হয়ে গেলো।
– অন্ধ শিকারী তীর ছুড়ে দিলো। সেই তীর হরিনীর পাশ কেটে সিংহের মাথায় আঘাত করলো।
– তুমুল বৃস্টির জলে জংগলের আগুন নিভে শান্ত হয়ে গেলো।
– হরিনীটি একটি সুস্থ ও সুন্দর শাবকের জন্ম দিলো।

আমাদের জীবনেও এরকম কিছু সময় আসে। চারদিক থেকে বিপদ, নিন্দা, হতাশা আর অসহযোগিতা চেপে ধরে আমাদের। কখনো কখনো এই খারাপ সময় এত শক্তিশালী মনে হয় যে আমরা পরিস্থিতির কাছে হার মেনে যাই। আত্নহত্যার কথাও চিন্তা করি। অথচ এটি ভুল। আর সেটা আমরা এই হরিনের গল্প থেকেই শিখে নিতে পারি। যখন হরিনীটির চারপাশে এত বিপদ ছিলো, তবুও জীবন মৃত্যু যাই আসুক! সে বিপদের আশংকায় নিজের লক্ষ্য থেকে একবিন্দু সরে যায়নি। সে তার কাজ, অর্থাৎ সন্তান জন্ম দেয়াতেই নিজের সব মনযোগ দিয়েছে। আর তখন বাকী সব বিপদ আপদ সৃস্টিকর্তা নিজেই সমাধান করে দিয়েছেন। যখন হতাশা গ্রাস করে, নিজের উপর বিশ্বাস উঠে যায়, তখনো সৃস্টিকর্তা মহান আল্লাহর প্রতি অঘাথ বিশ্বাস রাখবেন। জীবনের লক্ষ্যে স্থির থাকবেন। আর কখনো লক্ষ্য থেকে একবিন্দু পিছপা হবেন না। মনে রাখবেন!! আপনি যত বড় ঝড়ের মাঝেই থাকুন, যত নিঃসঙ্গই আপনি নিজেকে ভাবুন না কেন?মহান আল্লাহ্ কখনো আপনাকে ছেড়ে যাননি, সর্বদা আপনার কাছেই আছেন। মনে রাখবেন, সৃস্টিকর্তা কখনো ঘুমান না এবং কোন তন্দ্রাও তাকে স্পর্শ করেনা৷ সব সময় তিনি আপনাকে দেখছেন এবং আপনার কোন প্রার্থনা তিনি অপূর্ণ রাখবেন না….৷

 

আল্লাহ চাইলে খারাপ কিছু দিয়েও ভালো করতে পারেন -২

এক রাজার এক চাকর ছিল। চাকরটা সবসময় যেকোন অবস্থাতেই রাজাকে বলত, “রাজা মশাই, কখনো মন খারাপ করবেন না। কেননা আল্লাহ যা করেন তার সবকিছুই নিখুঁত ও সঠিক।” রাজার শিকার করার শখ ছিলো । প্রায়ই তিনি শিকারের উদ্দ্যেশ্যে বনে যেতেন । একবার তারা শিকারে যেয়ে নিজেরাই এক হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার হলো। রাজার দেহরক্ষীরা সেই প্রাণীকে মারতে পারলেও, ততক্ষণে রাজা তার একটা আঙুল খুইয়ে বসেছেন । রাগে-যন্ত্রণায়-ক্ষোভে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ওঠে, “আল্লাহ যদি ভালোই হবে তাহলে আজকে শিকারে এসে আমার আঙুল হারাতে হতো না।” চাকর বলল, “এতকিছুর পরও আমি শুধু আপনাকে এটাই বলব, আল্লাহ সবসময়ই ভালো ও সঠিক কাজই করেন; কোনো ভুল করেন না।” চাকরের এই কথায় আরও ত্যক্ত হয়ে রাজা তাকে জেলে পাঠানোর হুকুম দিলেন । এরপর কয়েক মাস পরে একদিন রাজা আবার শিকারে বের হলেন। শিকার করতে করতে একসময় তিনি বনের অনেক ভিতরে চলে গেলেন । এবার তিনি একদল বন্য মানুষের হাতে বন্দি হলেন। এরা তাদের দেব দেবির উদ্দেশ্যে মানুষকে বলি দিত । তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে রাজাকে দেবতার উদ্দ্যেশে বলি দিবে। বলি দিতে যেয়ে তারা দেখল যে, রাজার একটা আঙুল নেই। তারা এমন বিকলাঙ্গ কাউকে তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে রাজি হলো না। তারা ভাবলো এমন খুতযুক্ত কাউকে বলি দিলে দেবতা হয়তো খুশি হবেন না । তাই তারা রাজাকে ছেড়ে দিল! প্রাসাদে ফিরে এসে তিনি তার সেই পুরোনো চাকরকে মুক্ত করে দেওয়ার হুকুম দিলেন। চাকরকে এনে বললেন, “ভাই, আল্লাহ আসলেই ভালো। আমি আজ প্রায় মরতেই বসেছিলাম। কিন্তু আঙুল না-থাকার কারণে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছি। “তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আল্লাহ ভালো, এটা তো বুঝলাম । আর তুমিও সবসময় আল্লাহর প্রশংসা করো। কিন্তু তাহলে তিনি আমাকে দিয়ে তোমাকে জেলে পুরলেন কেন?” চাকর বললঃ “রাজামশাই, আমি যদি আজ আপনার সাথে থাকতাম, তাহলে আপনার বদলে আজ আমি বলি হয়ে যেতাম। আপনার আঙুল ছিল না, কিন্তু আমার তো ছিল। আমি থাকলে জংলি মানুষগুলো আপনার বদলে আমাকেই বলি দিয়ে ফেলতো । কাজেই আল্লাহ যা করেন সেটাই সঠিক, তিনি কখনো কোনো ভুল করেন না।” জীবনের নানা দুঃখকষ্ট নিয়ে আমাদের শত অভিযোগ…… আমরা ভুলে যাই কোন কিছুই আপনা-আপনি হয় না, বরং সবকিছুর পেছনেই একটি নির্দিষ্ট কারণ আছে। আলহামদুলিল্লাহ্… ।

৩ নং ইসলামিক গল্প

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব আছে

প্রফেসর ক্লাসে ঢুকেই তার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব কি সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন ?” একজন ছাত্র বেশ আত্নবিশ্বাসের সাথেই উত্তর দিলো, জ্বী স্যার। সবকিছুই সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন। “তাই নাকি! ছাত্রটির উত্তর শুনে মুচকি হাসেন প্রফেসর। সৃষ্টিকর্তা সত্যিই সবকিছু তৈরি করেছেন ? তুমি ভেবে বলছো ?” ছাত্রটি আগের মত আত্নবিশ্বাসের সাথে হ্যা বোধক উত্তর দিতেই প্রফেসর আবারও প্রশ্ন করেন, “সৃষ্টিকর্তাই যদি সবকিছু তৈরি করে থাকেন তাহলে উনি তো খারাপ কেও সৃষ্টি করেছেন। তোমার উত্তর অনুযায়ী যেহেতু খারাপের অস্তিত্ব আছে এবং আমরা কি সেটা আমাদের কাজের উপর নির্ভর করেই নির্ধারণ হয়, সেই যুক্তি অনুযায়ী তাহলে সৃষ্টিকর্তা নিজেই খারাপ। কারন আমাদের ভাল-মন্দ সব গুণ উনি তৈরি করেছেন।” প্রফেসরের এমন কথা শুনে সব ছাত্র চুপ হয়ে গেলো। কেউ কিছু বলছেনা। ছাত্রদের চুপ হয়ে যাওয়া দেখে প্রফেসর নিজের উপর বেশ সন্তুষ্ট হলেন। কিছুক্ষণ পর আরেকজন ছাত্র উঠে দাড়ালো। প্রফেসর আমুদে ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করেন, কিছু বলতে চাও ? ছাত্রটি হাসি মুখে প্রফেসরের কাছে জানতে চায়, “আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি স্যার ?” অবশ্যই করতে পারো। প্রফেসর অনুমতি দিতেই ছাত্র টি জিজ্ঞাসা করে- “স্যার, ঠান্ডা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে কি ?”

প্রশ্ন শুনে প্রফেসরের চেহারায় বিরক্তি ফুটে ওঠে। “কি গাধার মত প্রশ্ন করো! ঠান্ডার অস্তিত্ব থাকবেনা কেন ? অবশ্যই ঠান্ডার অস্তিত্ব আছে। তোমার কি কখনো ঠান্ডা লাগেনি ?” এবার ছাত্রটি মুচকি হেসে উত্তর দেয়, সত্যি বলতে কি স্যার, ঠান্ডার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমরা যেটাকে ঠান্ডা বলি, পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় সেটা আসলে তাপের অনুপস্থিতি। আমরা এই “ঠান্ডা’ শব্দ টিকে জাস্ট কম তাপ কিংবা তাপের অনুপস্থিতি কে ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহার করি। কিছুক্ষণ পর ছাত্র টি আবারো প্রশ্ন করে, “স্যার অন্ধকার বলে কিছু কি পৃথিবীতে আছে ?” প্রফেসর উত্তর দেন, কেন থাকবেনা! অবশ্যই অন্ধকারের অস্তিত্ব আছে। ছাত্রটি সহাস্যে উত্তর দেয়, আপনার ধারণা ভুল স্যার। অন্ধকার বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আমরা আলো কে নিয়ে রিসার্চ করতে পারি, আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ মাপতে পারি, আলোর গতি বের করতে পারি। কিন্তু অন্ধকারের অস্তিত্ব নেই বলেই আমরা অন্ধকার নিয়ে কোনো কিছুই করতে পারিনা। সামান্য একটা আলোক রশ্নি অন্ধকার দূর করতে যথেষ্ঠ, কিন্তু অন্ধকার কখনো আলো কে গ্রাস করতে পারেনা। কারন অন্ধকার বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, অন্ধকার হচ্ছে আলোর অনুপস্থিতি। ছাত্র টি আবারও প্রশ্ন করে বসে। “স্যার, এবার বলেন খারাপের কি অস্তিত্ব আছে ?” প্রফেসর বেশ ক্রুদ্ধস্বরে উত্তর দেন, অবশ্যই আছে। প্রতিদিন কত মানুষ খুন হচ্ছে, অন্যায় হচ্ছে, এগুলো খারাপ না ?” ছাত্রটি বেশ জোরের সাথে উত্তর দেয়, “না স্যার। খারাপের কোনো অস্তিত্ব নেই, এটা হচ্ছে ভালোর অনুপস্থিতি।
এটা সেই ঠান্ডা এবং অন্ধকারের মতই, মানুষের অন্তরে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালবাসার অনুপস্থিতিই এই খারাপ বা মন্দের অবস্থা তৈরি করে।

৪ নং ইসলামিক গল্প

 আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন

টাইটানিক অনেকের কাছেই ছিলো স্বপ্নের জাহাজ। জনাব ক্লার্ক ১৯০৪ সালে টাইটানিক সম্পর্কে জানতে পারেন। সেদিন থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার স্ত্রী ও ৫ ছেলেমেয়ে সহ পুরো পরিবার নিয়ে টাইটানিকে চড়ে আমেরিকা যাবেন। তিনি টাকা জমানো শুরু করলেন। যখন টাইটানিকের টিকিট বিক্রি শুরু হলো, তখন জনাব ক্লার্ক টিকিট কাটতে গেলেন। তার সারাজীবনের সব সঞ্চয় তুলে নিয়ে টিকিট করতে গেলেন। তাতেও টিকিটের টাকা হলো না। তিনি ফিরে এসে তার গাড়ি, ঘরের অনেক মূল্যবান জিনিস বেচে দিলেন। আবার টিকিট কিনতে গেলেন। ৭টি নন রিফান্ডেবেল টিকিট তিনি কিনলেন। তার সারাজীবনের সঞ্চয় শেষ। বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন তার বড় মেয়েকে কুকুরে কামড়েছে। এই নিয়ে হইচই পড়ে গেল। মেয়েকে তিনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার তাকে দাওয়া দিলো। মেয়ের প্রচণ্ড জ্বর এলো। ৩ দিন পর টাইটানিক ছাড়বে। ডাক্তার জানালো এরকম অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে যাতায়াত মোটেই ঠিক হবে না। ক্লার্কের স্ত্রী এতো বছরের শখ বিসর্জন দিলেন। তিনিও আমেরিকা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। টাইটানিক যেদিন ছাড়বে বাবা বাকি ছেলে মেয়েদের নিয়ে রওয়ানা হলেন। টাইটানিকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। হঠাৎ তার মেয়ের কথা মনে হলো। এভাবে স্ত্রী মেয়েকে ফেলে তিনি তো যেতে চাননি। তিনি টাইটানিকে উঠে তার কেবিনে গেলেন। মনের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। তিনি শেষ পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের নিয়ে নেমে আসলেন জাহাজ থেকে। জাহাজ ছেড়ে দিলো। সারা জীবনের শখ আমেরিকা যাওয়া আর হলো না। জীবনের সব সম্পদ, সব অর্জন তিনি হারালেন। বাড়ি ফিরে আসলেন ক্লার্ক। তার স্ত্রীও তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জীবনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন। সব কিছু ভুলে গিয়ে তারা আবার জীবনের প্রয়োজনে নতুন করে সব শুরু করেন। মাঝখানের এই ঘটনাটা যেন এক দুঃস্বপ্ন। ৫ দিন পর পেপারে ক্লার্ক দেখলেন টাইটানিক বরফপিণ্ডের সাথে আঘাত লেগে ডুবে গেছে। তখন ক্লার্ক সেই কুকুরটার কথা ভাবলেন। কুকুরটা যদি তার মেয়েকে না কামড়াতো, তাহলে তারা আজ মারা যেতেন। Moral of the Story তাহলে কী দাঁড়ালো বলুন তো পাঠক? আসলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, আমাদের কাছে সেটা পৌঁছাবেই। দেখার বিষয় হলো, আপনি কীভাবে সেই পরিস্থিতিতে রিএ্যাক্ট করেন। “আমার সাথেই কেন সবসময় এমন হয়?”, “আল্লাহ্ কি আর কাউকে চোখে দেখলো না?”, “কেন আল্লাহ্ আমাকেই এত দুঃখ-কষ্ট দেন?”

– এ টাইপের অভিযোগগুলো প্লিজ আর কখনোই করবেন না। কখনোই না। কেননা আল্লাহর ফায়সালা সর্বাবস্থায়ই কল্যাণকর, এটা মাথায় ঢুকিয়ে ফেলুন। আলহামদুলিল্লাহ্‌ বলতে শিখুন। সবর ও শোকরের মাধ্যমে দুনিয়ার এ ছোট্ট জীবনটা পার করে দিন। ইনশাআল্লাহ, এর প্রতিফল হবে বড়ই মধুর।

আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন

এক রাজার এক চাকর ছিল। চাকরটা সবসময় যেকোন অবস্থাতেই রাজাকে বলত, “রাজা
মশাই, কখনো মন খারাপ করবেন না। কেননা আল্লাহ যা করেন তার সবকিছুই নিখুঁত ও
সঠিক।” রাজার শিকার করার শখ ছিলো । প্রায়ই তিনি শিকারের উদ্দ্যেশ্যে বনে
যেতেন । একবার তারা শিকারে যেয়ে নিজেরাই এক হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার
হলো। রাজার দেহরক্ষীরা সেই প্রাণীকে মারতে পারলেও, ততক্ষণে রাজা তার একটা
আঙুল খুইয়ে বসেছেন । রাগে-যন্ত্রণায়-ক্ষোভে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ওঠে,
“আল্লাহ যদি ভালোই হবে তাহলে আজকে শিকারে এসে আমার আঙুল হারাতে হতো না।”
চাকর বলল, “এতকিছুর পরও আমি শুধু আপনাকে এটাই বলব, আল্লাহ সবসময়ই ভালো ও
সঠিক কাজই করেন; কোনো ভুল করেন না।” চাকরের এই কথায় আরও ত্যক্ত হয়ে রাজা
তাকে জেলে পাঠানোর হুকুম দিলেন । এরপর কয়েক মাস পরে একদিন রাজা আবার
শিকারে বের হলেন। শিকার করতে করতে একসময় তিনি বনের অনেক ভিতরে চলে গেলেন ।
এবার তিনি একদল বন্য মানুষের হাতে বন্দি হলেন। এরা তাদের দেব দেবির
উদ্দেশ্যে মানুষকে বলি দিত । তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে রাজাকে দেবতার
উদ্দ্যেশে বলি দিবে। বলি দিতে যেয়ে তারা দেখল যে, রাজার একটা আঙুল নেই।
তারা এমন বিকলাঙ্গ কাউকে তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে রাজি হলো না।
তারা ভাবলো এমন খুতযুক্ত কাউকে বলি দিলে দেবতা হয়তো খুশি হবেন না । তাই
তারা রাজাকে ছেড়ে দিল! প্রাসাদে ফিরে এসে তিনি তার সেই পুরোনো চাকরকে
মুক্ত করে দেওয়ার হুকুম দিলেন। চাকরকে এনে বললেন, “ভাই, আল্লাহ আসলেই
ভালো। আমি আজ প্রায় মরতেই বসেছিলাম। কিন্তু আঙুল না-থাকার কারণে প্রাণ
নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছি। “তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আল্লাহ ভালো, এটা তো
বুঝলাম । আর তুমিও সবসময় আল্লাহর প্রশংসা করো। কিন্তু তাহলে তিনি আমাকে
দিয়ে তোমাকে জেলে পুরলেন কেন?” চাকর বললঃ “রাজামশাই, আমি যদি আজ আপনার
সাথে থাকতাম, তাহলে আপনার বদলে আজ আমি বলি হয়ে যেতাম। আপনার আঙুল ছিল না,
কিন্তু আমার তো ছিল। আমি থাকলে জংলি মানুষগুলো আপনার বদলে আমাকেই বলি দিয়ে
ফেলতো । কাজেই আল্লাহ যা করেন সেটাই সঠিক, তিনি কখনো কোনো ভুল করেন না।”
জীবনের নানা দুঃখকষ্ট নিয়ে আমাদের শত অভিযোগ…… আমরা ভুলে যাই কোন কিছুই
আপনা-আপনি হয় না, বরং সবকিছুর পেছনেই একটি নির্দিষ্ট কারণ আছে।
আলহামদুলিল্লাহ্… ।

৫ নং ইসলামিক গল্প

অন্যের অবদানকে স্বীকার করো

বিয়ের একমাস পর বৌ-শাশুড়ির কথোপকথন: →বউমা, আমি ২৮টি বছরে যা পারি নি তুমি এক মাসেই তা করে ফেলেছ। →আম্মু,আপনি এ কী বলছেন! →হ্যাঁ মা,, আমি এই ২৮টি বছরে ছেলেকে ফজর নামাজে অভ্যস্ত করতে পারি নি। তুমি এক মাসেই পেরেছ! →আম্মু, আপনি কি পাথর আর স্বর্ণের গল্পটা জানেন? →না তো! →কোন এক গ্রামে চলাচলের পথে একটি বড় পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল।এক ব্যক্তি রাস্তা পরিস্কার করতে মনস্থ করল।সে একটি কুড়াল নিয়ে পাথরটি ভাঙার চেষ্টা করল। ৯৯টি আঘাত করে সে ক্লান্ত হয়ে গেল। তখনই সেখান দিয়ে এক পথিক যাচ্ছিল। লোকটি পথিকের সাহায্য চাইলো। পথিক কুড়াল নিয়ে আঘাত করতেই পাথরটি ভেঙে গেল এবং ভেতর থেকে স্বর্ণভর্তি একটি থলে বেরিয়ে এল। -পথিক: যেহেতু পাথরটি আমার আঘাতে ভেঙেছে তাই থলেটি আমার। -আমাকেও কিছু দাও।আমিও যে ৯৯টি আঘাত করলাম। পথিক রাজি হল না। দুজনে কাজীর কাছে গেল। সব শোনে কাজী মীমাংসা করলেন। স্বর্ণগুলোকে ১০০ভাগ করে ১ভাগ দিলেন পথিককে বাকি ৯৯ভাগ লোকটিকে দিয়ে দিলেন। বললেন,’ “যদি তোমার ৯৯টি আঘাত না হত তাহলে এই পাথরটি ভাঙতোই না”। -আম্মু,আপনি ২৮টি বছর পরিশ্রম করে সবকিছু প্রস্তুত করেছেন। আমি শুধু শেষ আঘাতটাই করেছি। – এ টাইপের অভিযোগগুলো প্লিজ আর

৬ নং ইসলামিক গল্প

সৎ কর্মের সুফল

এক দয়ালু রাজা । ছদ্মবেশে রোজ ভ্রমণে বের হয়ে প্রজাদের খবরাখবর নেন‌ । একদিন শহরের শেষ মাথায় পৌঁছে দেখলেন একজন লোক পথের পাশে পড়ে রয়েছে । রাজা তাকে নাড়াচাড়া করে দেখলেন , সে মারা গেছে । লোকজন সব পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে । কেউ ফিরে ও তাকাচ্ছে না । রাজা লোকদের ডাকলেন । ছদ্মবেশী রাজাকে কেউ চিনতে পারে নি । জিজ্ঞেস করলো, ” কি হয়েছে ? ” রাজা বললেন , ” এই মানুষটি কে কেন কেউ সাহায্য করছো না ?” লোকেরা জবাব দিল , ” সে খুব খারাপ লোক । অনেক পাপী ।” রাজা বললেন , ” তবুও মানুষ তো ?” রাজা তখন নিজেই তাকে তুলে তার ঘরে পৌঁছে দিলেন । তার স্ত্রী স্বামীর মৃতদেহ দেখে কাঁদতে লাগলো । আর বলতে লাগলো , ” আমি জানি , আমি সাক্ষী , আমার স্বামী খুব ই সৎ মানুষ ।” শুনে রাজা অত‍্যন্ত আশ্চর্য হলেন । এ কি করে সম্ভব ? লোকজন বলছে , লোকটি মহাপাপী । কেউ তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করছে না । অথচ , তার স্ত্রী বলছে , সে অত্যন্ত ভালো । রাজার প্রশ্নের উত্তরে তখন , স্ত্রী যা জানালো , তাতে বিষয় টি পরিস্কার হলো । লোকটি প্রতিদিন মদের দোকান থেকে মদ কিনে এনে বাড়ির নালায় ফেলে দিয়ে বলতো , ” মানুষের পাপের বোঝা কিছু টা হলেও তো হালকা করলাম । ” এরকমই , রোজ রাতে এলাকার বেশ‍্যা মহিলাটির ঘরে গিয়ে , তাকে তার এক রাতের পুরো টাকা দিয়ে বলতো , ” দরজা বন্ধ করে রাখ , যেন কেউ না ঢুকতে পারে ।” বাড়ি ফিরে বলতো , শুকরিয়া উপর ওয়ালার । আজকের জন্য ঐ মহিলা আর কিছু নব যুবকের পাপ বন্ধ করতে পারলাম ।” লোকজন তাকে সে সব জায়গায় যেতে দেখে ভাবতো সে খুব পাপী । তার স্ত্রী তাকে বলতো , ” তুমি মারা গেলে , কেউ তোমাকে ছোঁবেও না , কান্ধাও দেবে না। তখন কি হবে ? ” সে হাসতো আর বলতো , ” আমি সৎকর্ম করছি । তাই তুমি দেখো , আমার শেষ কাজ স্বয়ং রাজা , সৃষ্টিকর্তার লোকেরাই করবে ।” শুনে রাজার হৃদয় আপ্লুত হয়ে গেল । তিনি কান্না আটকাতে পারলেন না । বললেন , এর চেয়ে পূণ‍্যবান আর কেউ হতে পারে না । আমি রাজা । তার সমস্ত ক্রিয়াকর্ম আমি নিজের হাতে করব ।” এইজন্যই জ্ঞানী গুণী রা বলেনঃ- কৃতকর্ম কখনওই বৃথা যায় না । প্রতিনিয়ত ই তাই আমাদেরকে সৎকাজে নিযুক্ত থাকা উচিত ।

৭ নং ইসলামিক গল্প

একজন মহিলা ও তার জুতার গল্প

মহিলাটি নিঃশব্দে ট্রেনে উঠে পড়ল; যদি তার চোখে চোখ না পড়ে যেত, আমি বুঝতেও পারতাম না যে তার চোখ ছলছল করছিল। যেকোনো মুহূর্তে সেই অশ্রু যেন ঝরে পড়বে। আমি তার পায়ের দিকে তাকালাম, দেখলাম খালি পা, এক জোড়া জুতা তার হাতে। কোলে কম্বলে মোড়ানো একটি ছোট শিশু; শিশুটি কোন শব্দ করছেনা। মহিলাটি যাত্রীদের কাছে এসে নিচুস্বরে কি যেন বলছিল, কিন্তু তার কথা ফেরিওয়ালার কণ্ঠ ঢেকে দিচ্ছিল। মহিলাটি ট্রেনের এক পাশে আমার কাছাকাছি আসলো। তার পুরনো ব্যবহৃত ক্ষয়ে যাওয়া জুতা জোড়ার দিকে লজ্জিতভাবে তাকিয়ে আস্তে বলল, ‘কারও কি এটা লাগবে? কেউ কি আমার কাছ থেকে জুতা তা কিনবেন?’ সবাই বিব্রতভাবে না করে দিল, কেউ বুঝে পেল না কেনই বা কেউ ব্যাবহার করা, পুরনো, ক্ষয় হয়ে যাওয়া জুতা কিনবে। অন্য একজন মহিলা ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে তাকে দান করতে চাইল। কিন্তু মহিলাটি এমন কিছু গ্রহন করতে অস্বীকার করল; তার ঘুমন্ত শিশুর হাতের মধ্যে দেওয়ার পরও সে তা ফিরিয়ে দিল। সে তখন জুবুথুবু হয়ে পরাজিতের মত ট্রেনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মহিলাটি তার মুখ এমনভাবে নীচু করে রাখল যেন অন্য যাত্রীরা তার চোখ থেকে গড়িয়ে পরা অশ্রু দেখতে না পায়। তখন একজন মহিলা তার কাছে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে বলল, ‘আমি তোমার কাছ থেকে জুতা জোড়াটা কিনব।’ তখন জুতা হাতে সেই মহিলাটি আশান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিনবেন, তাইতো? আপনি কিনে নেবেন? দান না তো, আমি কিন্তু ভিক্ষা চাচ্ছি না।’ অন্য মহিলাটি তখন হেসে মাথা ঝাকাল, তারপর বড় একটি নোট তার হাতে গুজে দিয়ে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে চলে গেল। এইমাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় কুরআনের একটি আয়াত ঘুরতে লাগলোঃ “যারা আল্লাহর পথে অবরুদ্ধ রয়েছে বলে ভূপৃষ্ঠে গমনাগমনে অপারগ সেই সব দরিদ্রদের জন্য ব্যায় কর; (ভিক্ষা হতে) নিবৃত থাকার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অবস্থাপন্ন মনে করে, তুমি তাদেরকে তাদের লক্ষণের দ্বারা চিনতে পার, তারা লোকের নিকট ব্যাকুলভাবে যাচ্ঞা (ভিক্ষা করে না) করে না এবং তোমরা শুদ্ধ সম্পদ হতে যা ব্যায় কর বস্তুতঃ সে সমস্ত বিষয় আল্লাহ সম্যকরূপে অবগত।” [সূরা বাকারাঃ ২৭৩]

আমি জানিনা এই মহিলার ঘটনা কি, টাকাটা তার কেন দরকার, অথবা টাকাটা দিয়ে সে কি করবে; আমি যা জানি তা হল তার চোখে যন্ত্রণার চিহ্ন, তার কাধে যেন অনেক ভারী বোঝার ভার। এই আয়াতটি আমি আগে বহুবার পড়েছি, এই আয়াত নিয়ে বহু আলোচনা শুনেছি, কিন্তু কখনও এই আয়াতের ওজন বুঝিনি; আজ বুঝলাম যখন আমার চোখের সামনে আয়াতটিকে এভাবে জলজ্যান্ত ঘটে যেতে দেখলাম। আবারও আমার মাথায় নানান কথা ঘুরতে থাকল, এবার হাদিসের কথা। আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, একজন লোক এসে রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, আমি কি আমার উট বেঁধে রাখব আর তারপর আল্লাহর উপর তাওাক্কুল রাখব, নাকি উটকে খোলা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর তাওাক্কুল রাখব? উত্তরে রাসুল (সাঃ) বললেন, ‘তাকে বেঁধে রাখ, এবং সেই সাথে আল্লাহর উপর তাওাক্কুল রাখো।’ [তিরমিযী] মহিলাটির জন্য হাল ছেড়ে দেওয়াই সহজ ছিল, যদি সে এইটা ভাবত যে তার কাছে বিক্রি করার মতও কিছু নেই, কাজেই এমন কোন উপায় নেই যাতে সে কিছু টাকা পেতে পারে। তা সত্ত্বেও সে এই হাদিসটি বাস্তবায়িত করে দেখাল। তার কাছে যাই অকিঞ্চিৎকর ছিল তাই সম্বল করল, যেটা আসলে ট্রেনের যাত্রীদের কাছে মুল্যহীন ছিল। সে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখল, এবং এমন মুল্য পেল যা সে দর কষাকষি করে কখনই পেতে পারত না। যেমন, আল্লাহ সুবহানা ওয়াতা’আলা বলেনঃ “…যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ সহজ করে দিবেন। আর তাকে তার ধারনাতীত উৎস হতে দান করবেন রিজিক; যে ব্যাক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আল্লাহ তার ইচ্ছা পুরন করবেনই, আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা।” [সূরা তালাকঃ ২-৩] ট্রেনের মধ্যে নিজস্ব ব্যাক্তিগত সমস্যা সমাধানে ব্যাস্ত এক অচেনা মহিলা আমাকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কত গভীর শিক্ষা দিয়ে গেল। সেই মহিলার হাতে খুব সামান্য কিছুই ছিল, কিন্তু আমি এটা বলতে পারি, তার অন্তর পরিপূর্ণ ছিল। তার কাছ থেকেই আমারা বুঝতে পারি, সব কিছু দেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহর- তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী দেন, আমাদের আশা অনুযায়ী নয়। আমরা যদিও ভাবি, কোন পরিস্থিতিতে আমাদের হয়তো তেমন কিছুই করার নেই, আমাদের আবার ভেবে দেখা উচিত। কারণ আল্লাহ আমাদের সেই সামান্য পুঁজিই আমাদের আশাতীত হারে বহুগুনে বাড়িয়ে দিতে পারেন। এবং সবশেষে আমরা সেই সব অভাবী মানুষ সম্পর্কে চিন্তা করব যাদের কথা আল্লাহ বলেছেন, তাদের অন্তরের সেই ব্যাখ্যাতীত সৌন্দর্যের কথা ভাবব যেমন এই মহিলাটি দেখিয়েছেন।

৮ নং ইসলামিক গল্প

আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হবেননা

মুসা (আঃ) এর সময়কার একটি সুন্দর ঘটনাঃ – হযরত মুসা (আ.) একবার আল্লাহ তা’আলার কাছে আরজ করলেন,হে-দয়াময় প্রভু! আমার উম্মতের মধ্যে কে সবচেয়ে’ খারাপ ব্যক্তি আমাকে দেখিয়ে দিন। অদৃশ্য থেকে আওয়াজ এলো, আগামীকাল সকালে তুমি পথের ধারে বসে থেকো। যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম এই পথ অতিক্রম করবে, সে ব্যক্তিই হলো তোমার উম্মতের সবচেয়ে’ খারাপ। . হযরত মুসা (আ.) ঠিক সময়মত নির্দিষ্টস্থানে বসলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন এক ব্যাক্তি একটি ছোট ছেলে কোলে করে তাঁকে অতিক্রম করলো। হযরত মুসা (আ.) তাকে দেখে মনে মনে বললেন, ওহ্ এই ব্যাক্তিই আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে ‘খারাপ! . কিছুক্ষণ পর হযরত মুসা (আ.) এর ইচ্ছা হলো তাঁর উম্মতের সবচেয়ে’ ভালো ব্যাক্তিকে দেখতে।
আল্লাহ’র নিকট এবার আরজ করলেন, হে-দয়াময় প্রভু ! এবার আমার উম্মতের মধ্যে কে সবচেয়ে’ ভালোব্যাক্তি আমাকে দেখান। আওয়াজ এলো, হে- মুসা! পথের ধারে বসো, সন্ধ্যা বেলায় যে ব্যাক্তি সর্বপ্রথম আসবে, সে-ই হলো তোমার উম্মতের মধ্যে সবচে’ভালো। সন্ধ্যা বেলায় হযরত মুসা (আ.) নির্দিষ্ট স্থানে বসলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন সকালের সে ব্যাক্তি-ই ছোট ছেলেকে কোলে করে ফিরতি পথে আসছে। তাকে দেখে হযরত মুসা (আ.) অত্যন্ত অবাক হলেন এবং গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। হযরত মুসা (আ.) আল্লাহ’র নিকট আরজ করলেন, হে-দয়াময় প্রভু! আমি এ কী দেখতেছি! সকালে যে সবচেয়ে ‘খারাপ ছিলো, সন্ধ্যায় সে কিভাবে সবচেয়ে ‘ভালো হয়ে গেলো? . অদৃশ্য থেকে মহান আল্লাহ উত্তর দিলেন, হে- মুসা! সকালেযখন এই ব্যাক্তি ছেলেকে সাথে নিয়ে তোমাকে অতিক্রম করে জঙ্গলে প্রবেশ করলো, তখন ছেলে তাকে প্রশ্ন করে ছিলো, বাবা! এই জঙ্গল কতবড়? সে ব্যক্তি উত্তরে বলেছিলো, অনেক বড়। ছেলে আবার প্রশ্ন করলো, বাবা! জঙ্গল থেকে কি বড় কোনো কিছু আছে? তখন বাবা বলেছিলো, হ্যাঁ ! ঐ পাহাড়গুলো জঙ্গল থেকে বড়। ছেলে পুনরায় প্রশ্ন করলো, পাহাড় থেকে কি বড় কিছু আছে? বাবা বললো, আছে, এই আকাশ। ছেলে আবার প্রশ্ন করলো, আকাশ থেকে কি বড় কিছু আছে? সেই ব্যক্তি বললো, হ্যাঁ, আমার পাপ এই আকাশ থেকেও বড়। . ছেলে বাবার এ উত্তর শোনে বললো, বাবা! তোমার পাপ থেকে বড় কি কোনো কিছু নেই? তখন সেই ব্যক্তি চিৎকার দিয়ে কান্না করে লজ্জিত হয়ে গম্ভীর সুরে বললো, আছে বাবা! আমার পাপ থেকেও আল্লাহ’র রহমত অনেক বড়। . হে-মুসা! এই ব্যক্তির পাপের অনুভূতি ও অনুশোচনা আমার এতো পছন্দ হয়েছে যে,আমি তাঁকে তোমার উম্মতের সবচেয়ে ‘খারাপ ব্যক্তিকে সবচেয়ে’ ভালো ব্যক্তি বানিয়ে দিয়েছি। আল্লাহু আকবার। শিক্ষাঃ আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না, আপনার পাপ যত বড়ই হোকনা কেন আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড় , তাই যখনি নিজের ভুল বুঝতে পারবেন তখনই সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে তওবা করবেনে এবং পূর্বের গোনাহ আর না করার দৃঢ় সংকল্প করবেন ইনশা আল্লাহ দয়াময় আল্লাহ আপনাকে মাফ করে দিবেন।

নং ইসলামিক গল্প

এক বাদশার একটি বাগান ছিল। বাগানটি ছিল অনেক বড় এবং বিভিন্ন স্তর বিশিষ্ট। বাদশাহ একজন লোককে ডাকলেন। তার হাতে একটি ঝুড়ি দিয়ে বললেন, আমার এই বাগানে যাও এবং ঝুড়ি বোঝাই করে নানা রকম ফলমুল নিয়ে আস। তুমি যদি ঝুঁড়ি ভরে ফল আনতে পার আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব। কিন্তু শর্ত হল, বাগানের যে অংশ তুমি পার হবে সেখানে তুমি আর যেতে পারবে না। লোকটি মনে করলো এটা তো কোন কঠিন কাজ নয়। সে এক দরজা দিয়ে বাগানে প্রবেশ করল। দেখল, গাছে গাছে ফল পেকে আছে। নানা জাতের সুন্দর সুন্দর ফল। কিন্তু এগুলো তার পছন্দ হল না। সে বাগানের সামনের অংশে গেল। এখানকার ফলগুলো তার কিছুটা পছন্দ হল। কিন্তু সে ভাবল আচ্ছা থাক সামনের অংশে গিয়ে দেখি সেখানে হয়ত আরো উন্নত ফল পাব, সেখান থেকেই ফল নিয়ে ঝুঁড়ি ভরব। সে সামনে এসে পরের অংশে এসে অনেক উন্নত মানের ফল পেল। এখানে এ সে তার মনে হল এখান থেকে কিছু ফল ছিড়ে নেই। কিন্তু পরক্ষণে ভাবতে লাগলো যে সবচেয়ে ভাল ফলই ঝুড়িতে নিবে। তাই সে সামনে এগিয়ে বাগানের সর্বশেষ অংশে প্রবেশ করল। সে এখানে এসে দেখল ফলের কোন চিহ্ন ই নেই। অতএব সে আফসোস করতে লাগল আর বলতে লাগল, হায় আমি যদি বাগানে ঢুকেই ফল সংগ্রহ করতাম তাহলে আমার ঝুড়ি এখন খালি থাকত না। আমি এখন বাদশাকে কি করে মুখ দেখাব। ঝুড়ি সহ বাগানে প্রবেশকারি লোকটির সাথে আমলনামা সহ দুনিয়ার বাগানে প্রবেশকারী তোমাকে তুলনা করা যায়। তোমাকে নেক কাজের ফল ছিঁড়তে বলা হয়েছে, কিন্তু তুমি প্রতিদিনই ভাব, আগামী কাল থেকে ফল ছেঁড়া আরম্ভ করব। আগামী দিন, আগামী দিন করতে করতে তোমার জীবনে আর আগামী দিন আসবে না। এভাবেই তুমি শূণ্য হাতে আল্লাহর সামনে হাজির হবে। এজন্য মুফতি তাকি উসমানী (রহঃ) বলেন, জীবনের সময়গুলো অতিবাহিত হচ্ছে। জীবন কেটে যাচ্ছে জানা নেই বয়স বাকি কত। সুতরাং নেক কাজের বাসনা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে তা করে ফেল। কে জানে কিছুক্ষণ পরে মনের এই আগ্রহ থাকবে কি না? এটাও জানা নাই একটু পর বেঁচে থাকবো কিনা, যদিও বেঁচে থাকি হয়তো দুনিয়ার কোন ব্যস্ততা সামনে এসে পড়বে। অতএব নেক কাজ যখনি করতে মন চায় তখনি করে নাও। জীবন থেকে ফায়দা লুটে নাও। তাই জীবন নামক আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে দেয়া বাগানে বিচরণ কালে আমল নামার বিশেষ ঝুড়িতে যখনই সুযোগ পাওয়া যায় তখনি নেকী নামক ফল দিয়ে প্রথম থেকেই ভরা শুরু করে দাও। পরে সময় পাওয়া যাবে কিনা জানা নাই । আল্লাহ সুবহা’নাহু ওয়া তা’য়ালা সবাইকে তওফিক দিন।

—–

আগেই বলেছি, একটি সুন্দর শিক্ষনীয় ইসলামিক গল্প আমাদের মানসিকতাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে । আশা করি এখানে উল্লেখিত গল্পগুলো আপনাদের ইসলামিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে সহায়তা করবে । গল্পগুলো ভালো লাগলে শেয়ার করে আমাদের উৎসাহিত করার অনুরোধ রইলো |