নিবন্ধ

সংকট মেটাবে বৃষ্টির পানি

বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহারের জনপ্রিয় করতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারের নীতিমালা করতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা ও সরকারে অন্য সব সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় এটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আজ আষাঢ় মাসের ১১ তারিখ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির দেখা মিলছে নিয়মিতই। এই বৃষ্টির পানি আমাদের জন্য উপাদেয় ও পানযোগ্য (প্রথম ৫/৭ মিনিট বাদে)। দেশের শহরাঞ্চলগুলোতে পানির চাহিদা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে সরকারি ব্যবস্থা। ফলে পানি সঙ্কট মোকাবেলার জন্য বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ও এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরিসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে সম্প্রতি ঢাকায় দু’দিনের রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং কনভেশনের শেষ দিনে ঢাকা ঘোষণা উপস্থাপন করা হয়।

রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে ঢাকা ঘোষণা তুলে ধরেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রীলঙ্কার পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজমন্ত্রী দিনেশ গুনাবর্ধনে। অনুষ্ঠানে ওয়াটার এইডের দেশীয় প্রতিনিধি ডা. এম. খায়রুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশে কনভেশনের আয়োজন করেছিল ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার ম্যানেজম্যান্ক্ষ (আইডব্লিউএম), রেইন ফোরাম, বুয়েট ও ভারতের সেন্ক্ষার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ক্ষের (সিএসই) সহযোগিতায়। আয়োজক ও সহযোগী আয়োজক সংস্থাগুলো ঢাকা ঘোষণাতে একমত হয়েছে।

ঢাকা ঘোষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার, সুশীলসমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও অংশীদাররা যাতে বৃষ্টির পানি ব্যবহারে সবাই সচেতন হন। কনভেশনে ৫টি বিজনেস সেশনে ১৯টি পেপার উপস্থাপন করা হয়।

বৃষ্টির পানি বাসা-বাড়ি পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষায় ব্যবহূত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। বৃষ্টির পানি ব্যবহারে কনভেশনে অংশ নেয়ার বিশিষ্টজনেরা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, বৃষ্টির পানির ব্যবহারের মাধ্যমে পানি সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব।

ঢাকা ঘোষণায় বলা হয়েছে, বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহারের জনপ্রিয় করতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারের নীতিমালা করতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা ও সরকারে অন্য সব সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় এটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), অন্য সব নগর ও পৌর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার নিশ্চিত ও তাদারকির ব্যবস্থা করে প্রদর্শনী প্লান্ট তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে আকৃষ্ট করতে হবে।

সরকারের সব ধরনের ভবনে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাইক্লোন শেল্টার, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আগামীতে পানীয় জলের সম্ভাব্য সঙ্কটকে সামনে রেখে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এই আয়োজন বিষয়ে যুগান্তর ডটকমকে বিস্তারিত জানিয়েছেন অনুষ্ঠানের আয়োজক ওয়াটার এইডের দেশীয় প্রতিনিধি ডা. এম. খায়রুল ইসলাম।

বর্ষার দ্বিতীয় দিনেই আপনারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য দেশের সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে ২ দিনের একটি সেমিনার আয়োজন করছেন। সামগ্রিক বিষয় এটি কতটা প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য?

ঢাকা শহরে প্রতি বছর ৩ মিটার করে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এটা ওয়াসা বা প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন। এর শেষ পরিণতি আমরা এখনও জানি না। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা ওয়াসা প্রয়োজনমতো পানি তুলতে ব্যর্থ হয়। সবাই একমত যে ভূগর্ভে পানির রিচার্জ হচ্ছে না।

বৃষ্টির পানি প্রথম ৫-১০ মিনিট যদি নাও ধরা হয়। তার পরের পানিটুকু কিন্তু সুপেয়। এই পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ওয়াসার পানি প্রথমে ওপরে তুলবে বিদ্যুৎ খরচ আছে তারপর বিশুদ্ধ করতে সরকারের কেমিকেলের অনেক খরচ হয়ে যায়। আর একটা বিষয় হচ্ছে এটা এক প্রকার অপচয়। এই অর্থে যে, বৃষ্টিও পানি গিয়ে নদীতে, নদী থেকে সমুদ্রে। তার মানে আবার পানের অযোগ্য লবণাক্ত পানি হয়ে যাবে। সারা পৃথিবীতে মিঠা পানির সঙ্কট, সেখানে এটা ব্যবহার না করে সমুদ্রে পাঠাচ্ছি আমরা। আবার বৃষ্টিও পানিতে যে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, সেটা যদি এই রিচার্জ সিস্টেমে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেয়া যায়, তাহলে জলাবদ্ধতা কমে যাবে। ঢাকা ওয়াসা দুই জায়গায় এরকম ২টি পাইলট করে দেখেছে, এটা খুবই সফলভাবে করা সম্ভব।

সামনে আমাদের যে পানির সঙ্কট আসছে তা শুধু ভূগর্ভস্থ পানি তুলে মেটানো সম্ভব হবে না। ফলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা দিয়ে আমরা একটি বড় সঙ্কট মোকাবেলা করতে পারব।

বিল্ডিংগুলো থেকে ভূগর্ভের পানি রিচার্জ করার পদ্ধতি কেমন হবে?

যেভাবে আমরা ডিপ টিউবওয়েলের জন্য পাইপ দিয়ে পানি তুলি, সেই একই পদ্ধতিতে একটা ফিল্টার দিয়ে পানি মাটির গভীরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ডিপ টিউবওয়েলের ফিল্টার রাখি সবার শেষে, আর এখানে ফিল্টার রাখতে হবে সবার ওপরে, যাতে ময়লা পানি মাটির নিচে না যায়। আমরা ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও তার নানাবিধ ব্যবহার করেন। এমন কিছু বিষয় কি আপনাদের এই ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত?

হ্যাঁ, খুলনা-যশোরের দিকে, কয়রা দাকোপ, আশাশুনিতে মাটির মটকায় বা প্লাস্টিক ট্যাংকে সংরক্ষণ করছে। কিন্তু ট্রাডিশনালি মটকা ব্যবহার অন্য কারণে। এটা দিয়ে শীতের দিনে গরম পানি আর গরমের দিনে ঠাণ্ডা পানি পাওয়া যায়। দীর্ঘ দিনে পুকুরের পানির মতো মাটির মটকার মধ্যে ২/১টা জিয়ল মাছ ছেড়ে দেয়। যে মাছে পানির পোকাগুলো খেয়ে পানিটাকে পরিষ্কার রাখে। এই ট্রাডিশনাল জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই অংশ নিয়েছে এই সম্মেলনে। এদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা বিষয়ে কিছু বলেন।

আমরা ভারতে একজনের প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে জানলাম সেই মহেঞ্জোদারো হরপ্পার যুগ থেকেই আসলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সংস্কৃতি চলে আসছে। শ্রীলঙ্কার প্রেজেন্টেশনে দেখাল, ১৩শত খ্রি:পূর্বতে তাদের রাজা বলেছিলেন যে আকাশ থেকে পড়া একফোঁটা পানিও আমাদের উচিত হবে না সমুদ্রে মিশতে দেয়া।

আবার রাজস্থানে বছরে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয়। সেই প্রায় মরু অঞ্চলের মানুষের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর ব্যবহার করে। বিষয়টা হচ্ছে কমিউনিটি প্র্যাকটিসের বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থা।

এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কি অর্জন হল?

কৃষিমন্ত্রী নিজেও এটা বোঝেন। এখন প্রথম দিকে সরকারি ভবনগুলোয় এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে কার্যকর করা সম্ভব। এই আয়োজনে সরকারের সব মহল আন্তরিক। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট বা টেকনিক্যাল কাজগুলো যারা করেন আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়গুলোতে জোর দেই। সেই কাজগুলো করার চেষ্টা করছি। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক হল এই অভিজ্ঞতা শেয়ারিং সেশনগুলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্টসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্বতস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হয়েছেন। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সচেতনতার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একজন ভালো ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্টকে ১ সপ্তাহের ট্রেনিং দিলেই ডিজাইনগুলো করতে পারবে।

গত ১ বছরে প্রায় একশতজনকে প্রশিক্ষণের আওতায় এনেছি। তবে বিকল্প বিদ্যুতের জন্য যেমন সোলার প্যানেলের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তেমনি বিকল্প ওয়াসার পানি হিসেবে বৃষ্টিও পানি হার্ভেস্টিংয়ের বিষয়ে সরকারিভাবে উৎসাহিত করানোর জন্য সবাই একমত হয়েছেন। বাকিটা কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা।

ট্যাগ গুলো
error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।