বাংলা সংবাদ

২৫ হাজার টাকায় খুনী ভাড়া করে খুন, ৩০ বছর পর ধরা পড়লো প্রকৃত আসামিরা

একজন রিক্সাচালকের দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে ৩০ বছর আগের একটি হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন করে প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। আসামিদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়েছে।

এতদিন যাবত ধারনা করা হচ্ছিলো ছিনতাইকারিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন সগিরা মোর্শেদ। তবে আসলে তার আত্বিয়রাই টাকা দিয়ে খুনী ভাড়া করে তাকে খুন করিয়েছিলো। আসামিদের জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে এসেছে এমনই চান্চল্যকর তথ্য।

ঘটনার একমাত্র প্রতক্ষ্যদর্শী ছিলেন নিহত সগিরা মোর্শেদকে বহনকারী রিক্সাচালক ছালাম মোল্লা। হত্যাকান্ডের সময় তার বয়স ছিলো ২৬ বছর, বর্তমানে তার বয়স ৫৬ বছর। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান রিক্সাচালক ছালাম মোল্লার দেয়া তথ্যের কারনেই তিনি প্রকৃতি খুনিদের ধরতে পেরেছেন । তার দেয়া তথ্যই তাকে আসল ঘটনা খুজে বের করতে সহয়তা করেছে।

ঘটনার দিন ১৯৮৯ সালে নিজের মেয়েকে স্কুল থেকে আনার জন্য বাসা থেকে বের হন সগিরা মোর্শেদ। রাজারবাগ মোর থেকে ভিকারুনন্নেসায় যাবার জন্য ৪ টাকায় ভাড়া করেন রিক্সাচালক ছালাম মোল্লাকে। ছালাম মোল্লা শান্তিনগর মোড় দিয়ে ভিকারুন্নেসায় যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু সগিরা মোর্শেদ তাকে সময় বাচানোর জন্য মৌচাকের গলি দিয়ে যেতে বলেন। যাত্রীর কথায় তিনি ঐ পথ দিয়েই যাত্রা করেন। কিছুদুর যাওয়ার পর রিক্সাচলক দেখেন যে একটি মোটর সাইকেল তাদের পিছু পিছু আসছে কিন্তু মোটরসাইকেলটি যে তাদেরকেই অনুসরন করছিলো তা তিনি বুঝতে পারেননি। একসময় রাস্তার একটি নির্জন অংশে মোটর সাইকেলটি রিক্সার পথ আটকে দাড়ায়। মোটরসাইকেলে দুইজন লোক ছিলো। তার মধ্যে একজন নেমে এসে সগিরা মোর্শেদের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় এবং হাতের চুরি ধরে টানাটানি করতে থাকে। এসময় তাদের একজনকে চিনতে পেরে নিহত সগিরা মোর্শেদ বলেন, “এই তুমি কি করছো ? তোমাকে কিন্তু আমি চিনি”। একথা বলার সাথে সাথে ঐ ব্যাক্তি পিস্তল বের করে প্রথমে সগিরা মোর্শেদের হাতে একটি গুলি করে এবং তারপর বুকে আরেকটি গুলি করে। বুকে গুলি লাগার পর সগিরা মোর্শেদ রিক্সা থেকে লুটিয়ে মাটিতে পরে যান। মাত্র অল্প কয়েক সেকেন্ডের ভিতর এই ঘটনা ঘটে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় রিক্সাচালক ছালাম মোল্লা হতভম্ব হয়ে পড়েন। গুলির শব্দে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসে। খুনীরা মোটরসাইকেল নিয়ে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। ছালাম মোল্লা চিৎকার করে ‘ছিনতাইকারি, ছিনতাইকারি’ বলতে বলতে মোটর সাইকেলের পিছনে দৌড়াতে থাকেন কিন্তু মোটর সাইকেলের গতি বেশি থাকায় তিনি আর তাদের ধরতে পারেননি। পথচারীরা গুরুতর জখম সগিরা মোর্শেদকে হাসপাতালে নিয়ে যায় কিন্তু তাকে বাচানো আর সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে তিনি মারা যান।
ঘটনার পর নিহত সগিরা মোর্শেদের স্বামি অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় ডিবি পুলিশের উপর। তারা তদন্ত করে ১৯৯০ সালে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেফতার করে এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। আদালতও তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহন করে মামলাটির বিচারকাজ শুরু করে। ডিবি পুলিশ খুজে খুজে ৬জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। কিন্তু এরা কেউ সম্পূর্ন ঘটনা দেখেনি। গুলি করে খুনিরা পালিয়ে যাবার সময় তারা এসেছিল। কিন্তু তবু তারা যেটুকু দেখেছে সেটুকু ঘটনার উপর ভিত্তি করে মারুফ রেজা নামে একজনের কথা জানায়। নতুন তথ্য পাওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ পুনরায় মামলাটির তদন্তের আবেদন জানায়। আদালতও পুনরায় তদন্তের অনুমতি দেয়। পুলিশ মারুফফ রেজাকে নিয়ে পুনরায় তদন্ত শুরু করে কিন্তু বিচারিক আদালতের পুনরায় তদন্তের সিদ্ধান্তকে চ্যালেন্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন মারুফ রেজা। এরপর তদন্ত পক্রিয়া তদন্ত পক্রিয়া কিছুদিন বিঘ্নিত হয় কিন্তু হাইকোর্টও পুনরায় তদন্ত চালিয়ে যেতে অনুমতি দেয়। কিন্তু ততদিনে বেশকিছু সময়ক্ষেপন হওয়ায় এবং প্রতিনিয়ত আরো নতুন নতুন মামলার তদন্তের দায়িত্ব এসে পড়ায় পুলিশের পক্ষে এই ঘটনাটি আর ভালোমতো তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর মামলাটি বেশ অনেকটাই চাপা পরে যায়। তবে পুলিশ মামলাটির কথা একেবারে ভুলে যায়নি, অনেকটা ধীর গতিতে হলেও মামলাটির তদন্ত কাজ চলতে থাকে।

এবছর জুলাই মাস পর্যন্ত ২৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা মাললাটি তদন্ত করেছেন তবে তাদের উপর আরো বহু মামলার তদন্তভার থাকায় এই মামলাটির উপর তারা খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারেননি। অবশেষে সর্বশেষে মামলাটির তদন্ত ভার পরে পিবিআই কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের উপর। তিনি পুরানো কাগজপত্র ঘেটে রিক্সাচালক ছালাম মোল্লার সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। কারন ছালাম মোল্লা ঘটনাটি শুরু থেকে দেখেছেন। কিন্তু ৩০বছর পর এই ঢাকা শহরে একজন রিক্সাচালকে খুজে বের করা কোন সহজ কথা নয়। তবুও বহু চেষ্টা করে অবশেষে সেদিনের রিক্সাচালক ছালাম মোল্লাকে খুজে বের করতে সক্ষম হন তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। তার কাছ থেকে সম্পূর্ন ঘটনা জানেন এবং খুনিদের বর্ননা শোনেন রফিকুল ইসলাম। তিনি সগিরার পরিবার এবং স্বজনদের সাথে দেখা করে সবার সাথে কথা বলেন। কারো সাথে সগিরার ঝগড়া ছিলো কিনা সেসবও খোজ নেন। এরপর সগিরার ভাইয়ের পরিবারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রিকশাচালক ছালাম। তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। এরপর তাঁকে খুঁজে বের করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য এবং সগিরার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, সগিরার খুনের ঘটনার প্রকৃত কারণ।

ঢাকার আদালতকে প্রতিবেদন দিয়ে পিবিআই বলেছে, সগিরা মোর্শেদের স্বামীর নাম আবদুস ছালাম চৌধুরী। তাঁর বড় ভাইয়ের নাম সামছুল আলম চৌধুরী। মেজো ভাই চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরী। তিনজনই তাঁদের পরিবার নিয়ে আউটার সার্কুলার রোডে তখন বসবাস করতেন। সগিরা মোর্শেদরা থাকতেন দ্বিতীয় তলায়। চিকিৎসক হাসান তাঁর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীনকে নিয়ে থাকতেন ওই বাসার তৃতীয় তলায়। শাহীন তিন তলা থেকে প্রায় সময় ময়লা-আবর্জনা ফেলতেন, যা সগিরা মোর্শেদের পেছনের রান্না ঘর ও সামনের বারান্দায় পড়ত। এ নিয়ে সগিরার সঙ্গে মাহমুদার প্রায় ঝগড়াঝাঁটি হতো। আর শাশুড়ি থাকতেন সগিরার সঙ্গে। তাঁর শাশুড়ি তাঁকে ভালোবাসতেন। এ নিয়ে চিকিৎসক হাসানের স্ত্রী মাহমুদা খুব হিংসা করতেন। ঝগড়ার সময় সগিরাকে মাহমুদা বলতেন, ‘দাঁড়া, আমার ভাই রেজওয়ান (আনাস মাহমুদ) আসুক। আমার ভাইকে দিয়ে তোকে মজা দেখাব। তোকে ঘর থেকে বের করব।’

পিবিআই বলছে, পারিবারিক তুচ্ছ কারণ হাসান আলী ও তাঁর স্ত্রী মাহমুদার মনে ইগোর জন্ম হয়। এক সময় মাহমুদা সগিরাকে শায়েস্তা করার জন্য তাঁর স্বামী হাসানকে বলেন। হাসান তাতে রাজি হন। চিকিৎসক হাসানের রোগী ছিলেন মারুফ রেজা। যিনি তৎকালীন সিদ্ধেশ্বরী এলাকার সন্ত্রাসী ছিলেন। আর এই মারুফ ছিলেন সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের আত্মীয়। সগিরাকে শায়েস্তা করার জন্য মারুফের সঙ্গে কথা বলেন চিকিৎসক হাসান। ওই কাজের জন্য মারুফকে তখন ২৫ হাজার টাকা দিতে রাজি হন হাসান। আর হাসান তখন মারুফ রেজার সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করেন তাঁর শ্যালক আনাস মাহমুদ ওরফে রেজওয়ানকে। যাতে সগিরাকে সহজে দেখিয়ে দিতে পারেন। আনাস তাঁর দুলাভাই হাসানের বাসায় যাতায়াত করতেন। যে কারণে তিনি সগিরাকে চিনতেন।

হাসান সেদিন তাঁর শ্যালক আনাস মাহমুদকে বেলা দুইটায় ফোন করে মৌচাক মার্কেটের সামনে আসতে বলেন। মারুফ রেজা মোটরসাইকেলে করে মৌচাক মার্কেটের সামনে আসবেন বলে জানান। হাসান তাঁর শ্যালককে মারুফ রেজার সঙ্গে গিয়ে সগিরাকে দেখিয়ে দিতে বলেন। মারুফ রেজার মোটরসাইকেলে করে সিদ্ধেশ্বরী কালি মন্দিরের গলি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রোডে ঢোকেন আনাস মাহমুদ। সগিরা মোর্শেদের রিকশা অনুসরণ করে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের দিকে যেতে থাকেন। মারুফ মোটরসাইকেল দিয়ে সগিরার রিকশা গতিরোধ করেন। সগিরার হাত ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে নেন মারুফ এবং হাতের চুড়ি ধরে টানা হিঁচড়া করেন। তখন আনাস মাহমুদকে চিনে ফেলেন সগিরা। সগিরা সেদিন বলেছিলেন ‘এই আমি তো তোমাকে চিনি, তুমি এখানে কেন?’

এই কথা বলার পর মারুফ রেজা ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে কোমর থেকে পিস্তল বের করে সগিরাকে গুলি করেন। গুলি সগিরার হাতে লাগে। এরপর সগিরাকে আরও একটি গুলি করেন। যা সগিরার বুকের বাঁ পাশে লাগে। এ সময় সগিরা রিকশা থেকে মাটিতে পড়ে যান। তখন মারুফ রেজা আরও দুটি ফাঁকা গুলি করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান।

তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, আসামি মারুফ রেজা তাঁদের জানিয়েছেন সায়েদাবাদের তৎকালীন সন্ত্রাসী মুন্নার কাছ থেকে ভাড়ায় পিস্তল আনেন। সেই পিস্তল দিয়ে সগিরাকে খুন করেন। পরে সেই পিস্তল আবার তিনি মুন্নার কাছে দিয়ে দেন। মুন্না মারা গেছেন।

চিকিৎসক হাসান রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। আর আসামি মারুফ রেজা ফ্ল্যাট বেচাকেনার ব্যবসা করতেন। আর আনাস মাহমুদ একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, সগিরা মোর্শেদের তিন মেয়েই এখন উচ্চশিক্ষিত। তাঁদের দুজন বিদেশে থাকেন।

ট্যাগ গুলো

মতামত যোগ করুন

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।