নিবন্ধ

এ কেমন মেধাবি ?

আমাদের দেশে আমরা মেধাবি বলতে বুঝি যারা স্কুল-কলেজের পরিক্ষায় ভালো ফলাফল পায় তাদেরকে । তবে আমার কাছে মনে হয় পরিক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে আমরা যাদের মেধাবি বলে আখ্যা দেই তারা আসলে এক ধরনের অপদার্থের চাইতে বেশি কিছু নয় । আমর মনে হয়না এসব তথাকথিত মেধাবিরা পৃথীবি বা সমাজের জন্য কোন অবদান রাখতে সক্ষম । পৃথিবি বা সমাজের জন্য কোন অবদান রাখতে হলে যে খুব গুরুত্বপূর্ন কিছু আবিষ্কার করতে হবে বা কোন বিশেষ কাজ করে দেখাতে হবে এমন নয় । আমি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের জন্য যেসব স্বাভাবিক কাজ করতে হয় তার ভিত্তিতেই তাদের মেধাবি বলার বিপক্ষে । ভাবছেন কেন ?

এ+ পাওয়া একজন মেধাবিকে বাজারে মাছ কিনতে পাঠালে সে কোনটা বাসি-পচাঁ মাছ আর কোনটা ভালো মাছ তা বাছাই করে আনতে পারবেনা । হয়তো কোনটা কোন মাছ সেটাই চিনে না । মাছের কথা বাদই দিলাম, আলু-পেয়াজ বা শাক সবজি ঠিক মতো দরদাম করে কিনে আনতে পারবেনা ।

আবার ধরুন কোন একটা কাজে পরিবারের কাউকে ঢাকা থেকে কুমিল্লা বা কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যাওয়া দরকার । এখানেও যাদের আমরা মেধাবি বলি তারা কোন কাজে লাগছেনা । আপনার এ+ পাওয়া সন্তানকে ঢাকা থেকে একা একা একটা কাজের জন্য কুমিল্লা বা রাজশাহি পাঠালে সেই কাজটা সে ঠিকমতো করে রাস্তাঘাটের বিভিন্ন ঝামেলা সামাল দিয়ে ঘরে পৌছাতে পারবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই । আর অভিভাবক হিসেবে আপনিও দুশ্চিন্তা করতে করতেই কাহিল হয়ে যাবেন । আপনি দুশ্চিন্তা করবেন এই কারনে যে, তার উপর আপনার পরিপূর্ন আস্থা নেই । যদি পড়ালেখায় মেধাবি হওয়ার পাশাপাশি অন্য সব বিষয়েও সে যথেস্ট চালাক চতুর হতো এবং যে কোন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো যোগ্যতা তার থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কিছু থাকতোনা । শুধু ফোনে একটু খোজখবর রাখলেই হতো ।

আবার ধরুন, হঠাৎ আপনার বাসায় সুইচ বোর্ডের কাট-আউট জ্বলে গেলো । কাট আউটের তামার তারটি পাল্টিয়ে দেয়ার মতো সামান্য কাজটিও সে পারেনা । অনেকেতো লাইট ফিউজ হয়ে গেলে সেটাও পাল্টাতে পারেনা !!!

এসব মেধাবিরা পারেনা গাছে উঠতে, পারেনা একটা ছোট বাগান পরিচর্যা করতে, পারেনা সাতরাতে, পারেনা দৌড়াতে, পারেনা কোন ছোট খাটো বিষয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে, পারেনা এক পাতিল ভাত বা ডাল রান্না করতে, এমনকি অনেকেতো মানুষের সাথে বা আত্বীয়-স্বজনদের সাথেও ঠিকমতো কথাও বলতে পারেনা !

পারে শুধু সারা বছর ধরে বহু মাথা খাটিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে পড়ে আটটা বা দশটা বই শুধু মুখস্ত করতে ! এসব মেধাবিদের সারা বছরের অর্জন মাত্র ৮ – ১০ টা বই মুখস্ত করা ! সেটাও তারা পরের বছর ছয় মাস না যেতেই ভুলে যায় !
এমন মেধাবি দিয়ে জাতি কি করবে ? জাতির কথা বাদই দিলাম, আপনিই বা এমন মেধাবি সন্তান বা মেধাবি ছোট ভাই বোন দিয়ে কি করবেন ? কেন তাকে নিজ হাতে অপদার্থ, অচল মাল হিসেবে গড়ে তুলছেন ?

আপনি যতদিন আছেন ততদিন নাহয় আপনি তাকে আগলে রাখবেন । কিন্তু যখন আপনি থাকবেননা তখন সে কিভাবে দুনিয়াতে চলবে ? শুধু কিছু জিনিস মুখস্ত করে পরিক্ষার খাতায় সুন্দর করে লিখে দিয়ে আসতে পারলেই কি সারাটা জীবন ভালো কাটবে ? ভাবছেন আস্তে আস্তে সব শিখে নিবে ?

হা, একসময় জীবন চলার পথে বাধ্য হয়ে হয়তো শিখবে কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে । লোকসানের পাল্লাও ততদিনে অনেক ভারি হয়ে যাবে । তাকে যোগ্য করে গড়ে তুলুন । নিজের পায়ে দাড়াতে দিন । পরজীবি হয়ে বেচে থাকায় সুখ নেই ।

সবাইকে যে আবিষ্কারক বা দার্শনিক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই । শুধু একটা সাধারন মানুষের যা যা জানা দরকার তা শিখিয়ে যান ।

বহু তথাকথিত মেধাবি যখন বই মুখস্ত করায় ব্যস্ত তখনই দেখবেন গ্রাম থেকে শহরে এসে কোন ছেলে রিক্সা চালাচ্ছে, কেউ কুলির কাজ করছে, কেউ পথের ধারে কিছু বিক্রি করছে । পরিবারের সবাইকে ফেলে সংগ্রাম করে সে নিজেই একা একা নিজের জীবন চালিয়ে নিচ্ছে আবার সংসারেও টাকা পাঠিয়ে সাধ্যমতো সাহায্য করে যাচ্ছে বাবা মাকে । ১৫ বা ২০ বছর পরে দেখবেন ঐ রাস্তার ছেলেটাই হয়তো সুন্দর বাড়ি বানিয়েছে, কোন ভালো একটা ব্যবসা করছে । তাহলে কে বেশি মেধাবি ?

আপনার সন্তানকে এমন কঠিন কিছু করে দেখাতে হবে তা আমি বলছিনা । শুধু এটুকু বলতে চাই যে, তাকে এমন ভাবে গড়ে তুলুন যেন সে বাজার করতে পারে, দুরে কোন কাজ থাকলে যেতে পারে, প্রয়োজনে দুই-চার দিন নিজেই রান্না করে খেতে পারে, গাছে উঠতে পারে, সাতার কাটতে পারে, নৌকা চড়তে পারে, লাইট ফিউজ হলে বদলাতে পারে, তার সামনে কেউ অসুস্থ হলে যেন প্রাথমিক চিকিৎসা করতে পারে, মানুষের সাথে যেন সুন্দর ব্যবহার করতে পারে, দুরের মানুষকে যেন কিছুটা আপন করে নিতে পারে । শুধু বই মুখস্ত করা মেধাবি নামক আমড়া কাঠের ঢেঁকি বানাবেন না ।

ট্যাগ গুলো

মতামত

মতামত দিতে ক্লিক করুন

error: দুঃখিত, অনুলিপি করা যাবে না ! পরে এই কন্টেন্ট প্রয়োজন হলে আপনার সামাজিক অ্যাকাউন্টের সাথে ভাগ করুন।